সাইয়েদ মহফুজ খন্দকার


ইনসাফে’র সম্মানিত পাঠকবর্গ ও দর্শকবৃন্দের জন্য রইল মাসনূন সালাম এবং আন্তরিক মুবারকবাদ। স্মর্তব্য, আপনাদের ভালোবাসায় আমরা চতুর্থ বর্ষ শেষ করে পঞ্চম বর্ষে পদার্পণ করেছি, আলহামদু লিল্লাহ।

মিডিয়ার গুরুত্ব
ইসলামের ১৪০০ বছরের ইতিহাসে গত ১০০ বছর ছিল সবচেয়ে কঠিন। গত ১০০ বছর মুসলমানদের সবচেয়ে দুঃসময়ের দিন বলে আমরা মনে করি। ইসলামের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, গত ১৩০০ বছর যাবত সম্মিলিতভাবে ঠিক এত জুলুমের শিকার মুসলমানরা কখনই হয়নি। হয়তো একদিকে আক্রান্ত হয়েছে, কিন্তু অন্যদিকে বিজয় অর্জনও করেছে। ভারতবর্ষে মুসলমানরা ব্রিটিশদের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে, কিন্তু উসমানী খেলাফত দিন দিন বিস্তৃতি লাভ করেছে। এভাবে সারা বিশ্বে একদিকে মুসলমানরা আক্রান্ত হলেও অন্যদিকে নিজেদের অস্তিত্বকে শক্তিশালী করেছে; নিজেদের শক্তির জানান দিয়েছে।
কিন্তু বিগত ১০০ বছর যাবত মুসলমানরা বেশীরভাগ সময় নির্যাতিত হয়ে এসেছে। বিশেষ করে, সর্বশেষ তুরস্কের উসমানী খেলাফতের পতনের পর মুসলিম বিশ্ব যেন মগের মুল্লুকে পরিণত হয়। ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে চতুর্মুখি আক্রমণ ক্রমাগত বাড়তেই থাকে।

১৯ শতাব্দীর শুরু থেকে রাজতন্ত্র ও উপনিবেশিক শাসনের অবসান ঘটতে থাকে। ফলে তৈরি হতে থাকে অসংখ্য রাষ্ট্র। বাড়তে থাকে নানা মত ও মতবাদ। পশ্চিমাদের আবিষ্কৃত সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, সেকুলারিজম নামে নতুন-নতুন এসব মতবাদকে অনেকটা এক চেটিয়া-ভাবে ব্যবহার করা হয় ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে। আর দ্বীন-বিমুখ মুসলমান; বিশেষ করে নেতৃত্ব পাগল গোষ্ঠীটি তাদের এই ফাঁদে পা দিয়ে বৃহত্তর মুসলিম সমাজকে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।

এ ক্ষেত্রে ইসলাম বিরোধীরা যে কার্যকর অস্ত্রটি সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করেছে ও করছে, তার নাম হচ্ছে ‘মিডিয়া’। মিডিয়া বলতে আমি সব রকমের মাধ্যমকে বুঝাচ্ছি। সেটা সাহিত্য থেকে শুরু করে সিনেমা, গান ও সংবাদ পত্রসহ সব। তারা সাহিত্যের নামে মুসলমানদের মধ্যে ইসলাম বিরোধী সংস্কৃতি প্রবেশ করাচ্ছে। সিনেমা, নাটক, গান সব কিছুকেই তারা ব্যবহার করেছে ইসলামের বিরুদ্ধে এবং তারা এসব ব্যবহার করে সফলও হয়েছে। যাইহোক, আমি আলোচনা সংক্ষিপ্ত করার বাধ্যবাধকতার কারনে বিস্তারিত আলাপে না গিয়ে মিডিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরটি নিয়ে আলোচনা করবো। এবং সেটা প্রাসঙ্গিকও।

মিডিয়ার মধ্যে সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরটি হলো সংবাদ মাধ্যম। এটাকে এখন গণমাধ্যমও বলা হয়। অর্থাৎ গণমানুষের কথা যে মাধ্যমটির সাহায্যে প্রচার করা হয়, সেটাকে বলা হয় গণমাধ্যম। আর সংবাদ মাধ্যমের সংজ্ঞা আমরা সকলেই কম-বেশ জানি। যে ‘মাধ্যমের’ সাহায্যে সংবাদ পাওয়া যায়, জানা যায়, শোনা যায় তাকেই সংবাদ মাধ্যম বলে।

কিন্তু আমরা দেখতে পাই, প্রায় সারা বিশ্বেই এই গণমাধ্যম এবং সংবাদ মাধ্যমগুলো এক চেটিয়াভাবে ইসলামের বিরুদ্ধে কাজ করে যাচ্ছে। এর প্রমাণ আফগান , ইরাক আক্রমণ, সিরিয়ার ধ্বংসযজ্ঞ ও এই অঞ্চলের আরাকান এবং কাশ্মীর-সমস্যা নিয়ে মিডিয়ার ইসলাম ও মুসলিম বিরোধী অবস্থানে। সারা বিশ্বেই মার খাচ্ছে মুসলমানরা, আবার তারাই হলো মিডিয়ার চোখে সন্ত্রাসী!

ইসলাম বিরোধীদের মিডিয়া নামক এই অস্ত্রটি মুসলমানদের বিরুদ্ধে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশেও প্রয়োগ করা হয়েছে ও হচ্ছে। এবং গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, অনান্য দেশের চেয়ে বাংলাদেশেই তুলনামূলকভাবে বেশি ব্যবহার করা হচ্ছে এই অস্ত্রটি। বাংলাদেশের মিডিয়াকে ব্যবহার করা হয়েছে মূলত জাতীয়তাবাদ ও সেকুলারিজমকে প্রতিষ্ঠিত করে ইসলামকে তাড়ানোর জন্য।

প্রথমে ইসলামের নামে ও দ্বিতীয়বার ইনসাফের জন্য যে রাষ্ট্রটি জন্ম গ্রহণ করে, ইসলাম-বিরোধী শক্তিগুলো মিডিয়া নামক অস্ত্রটি ব্যবহার করে ৯০ ভাগ মুসলমানের রাষ্ট্রকে সফলভাবেই সেকুলার রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অপচেষ্টা চালায় এবং তাতে তারা অনেকটা সফলও হয়। ইনশা আল্লাহ বলে শুরু হওয়া ও আল্লাহর সাহায্য চেয়ে শেষ করা মহান মুক্তিযুদ্ধকে তারা ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বলে অপ্রচার চালাচ্ছে এবং অনেকটা সফলও হয়েছে। তাদের কাছে আফগান, ইরাক, সিরিয়া, কাশ্মীর ও আরাকানে হানাদারবিরোধী লড়াইরত মুক্তিকামীরা জঙ্গি-সন্ত্রাসী হলেও সাধু হয়ে আছে বিশ্ব সন্ত্রাসের প্রধান মদতদাতা আমেরিকা ইসরাইল ও তার দোষররা।
তারা ইসলামের বিরুদ্ধে চলতে থাকা অযৌক্তিক অশ্লীল বক্তব্যকে মুক্তমনা বললেও ইসলামের সাম্য ও ইনসাফের বাণীকে বলে মধ্যযুগিও বর্বর আরব্য কিচ্ছা কাহিনী। তারা শাহবাগে অবস্থানরত রাজনৈতিক মদতপুষ্টদের গণজাগরণ বললেও ন্যায্য দাবি নিয়ে শাপলা চত্বরে হাজির হওয়া লাখ-লাখ সাধারণ মুসলমানদের বলে সন্ত্রাসী।

২০১৩ সালে মিডিয়া নামক এই অস্ত্রের অসৎ ব্যবহারের চূড়ান্ত রূপ দেখতে পায় বাংলাদেশের জনগণ। কিভাবে ইসলাম বিরোধী মিডিয়াগুলো মজলুমদের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিল, তা আজো ভুলতে পারেনি জনগণ।

যেভাবে শুরু হয় ইনসাফের পথ চলা
২০১৪ এপ্রিল মাসের শুরুর দিকে ইসলাম-ফোবিয়ায় আক্রান্ত একপেশে সেকুলার মিডিয়ার বিপরিতে দেশের গণমানুষের পক্ষে সত্যিকারের গণমাধ্যম হিসেবে কাজ করার জন্য কিছু করার আগ্রহ প্রকাশ করেন কয়েকজন তরুণ। তাতে সহযোগিতা করেন দেশের সর্বজন শ্রদ্ধেয় আলেম-উলামাগণ।

নামকরণ
মিডিয়া করতে হলে শুরুতেই প্রয়োজন একটা অর্থবহ সুন্দর নামের। আলোচনা চলতে থাকে কি নাম দেয়া যায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সাধারণের কাছেও জানতে চাওয়া হয় কি নামে নামকরণ হতে পারে এই মাধ্যমটির; অর্থাৎ গণমানুষের মাধ্যম গণমাধ্যমটির। অনেক নাম আসে, এর মধ্যে ইনসাফ নামটি পছন্দ করা হয়। মূলত ‘ইনসাফ’ পছন্দ করার উদ্দেশ্য ছিল, মুক্তিযুদ্ধের যে ৪টি মূল ভিত্তি; অর্থাৎ যে ৪টি বিষয়ের অধিকার আদায়ের জন্য মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত হয়, এর একটি হচ্ছে সামাজিক ন্যায় বিচার বা ‘ইনসাফ।’ মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা থেকে নেয়া ‘ইনসাফ’ই রাখা হয় গণমানুষের গণমাধ্যমটির নাম। পরে ওয়েব এড্রেসের সুবিধার্থে টোয়েন্টিফোর ডটকম যুক্ত করা হয় ইনসাফের সাথে।

আনুষ্ঠানিক যাত্রা
আলহামদু লিল্লাহ ২০১৪ সালের ৫ ও ৬ মে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে ইনসাফ। উপমহাদেশের অন্যতম প্রধান ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় দারুল উলুম হাটহাজারী মাদরাসায় এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। এতে উপস্থিত ছিলেন দেশের অনেক সিনিয়র আলেম-উলামাগণ।

নীতিমালা
পূর্বে পশ্চিমা গণমাধ্যমের সয়লাবের কারণে ও স্বতন্ত্র ইসলামী ঘরানার মিডিয়া না থাকায় নতুন এই গণমাধ্যমটির সংবাদ নীতিমালা কি ধরনের হবে, তা নির্ধারণ করা ছিল দুঃসাধ্য ব্যাপার। পরবর্তীতে দেশের সিনিয়র ইসলামী চিন্তাবিদ, আলেম সাংবাদিক ও শিক্ষাবিদদের সমন্বয়ে গঠিত একটি টীম ইনসাফের জন্য স্বতন্ত্র নীতিমালা তৈরি করেন। পশ্চিমাদের তৈরি প্রচলিত সাংবাদিকতার নীতি নয়, ইসলামের সুমহান আদর্শকে সামনে রেখে বর্তমান যুগের চাহিদা অনুযায়ী নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়।

ইনসাফের নীতিমালাতে যে বিষয়গুলো বিশেষভাবে প্রাধান্য দেয়া হয় এবং যে বিষয়গুলোর কারণে ইনসাফ আস্থার প্রতীক হিসেবে মানুষের সামনে হাজির হতে পেরেছে–এর উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হচ্ছে:
ইনসাফ তার সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে ইসলামী অঙ্গনের বৃহত্তর স্বার্থের দিকে নজর রাখে। সাময়িকভাবে প্রয়োজনীয় মনে হলেও বৃহৎভাবে ক্ষতিকর হতে পারে এমন বিষয়গুলোকে সর্বসাধারণের সামনে নিয়ে আসার বিরোধী ‘ইনসাফ’। অর্থাৎ; নতুন করে ফিতনা সৃষ্টি হতে পারে এমন কিছুকে এড়িয়ে চলে ইনসাফ।

আমরা মনে করি নানা সমস্যায় জর্জরিত ইসলামী অঙ্গণে নতুন সমস্যা তৈরি হয়, এমন কাজ থেকে বিরত থেকে যেটুকু সম্ভব এই অঙ্গনের ভাল কাজগুলো মানুষের সামনে তুলে ধরা উচিৎ। ইনসাফের লড়াইটা ইসলামবিরোধী সেকুলার, সাম্রাজ্যবাদী ও দেশদ্রোহীদের বিরুদ্ধে। ইনসাফ আরো মনে করে এই অপশক্তির বিরুদ্ধে লড়াইটা আমাদের সকলের। ইনসাফের দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে নিজেদের সবটুকু সামর্থ্য দিয়ে অপশক্তির বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাওয়া। তাই ইনসাফ ইসলামী অঙ্গনের ইখতেলাফ বা ঝগড়া ফ্যাসাদগুলোকে সামনে আনতে কোনভাবেই আগ্রহী নয়। এর ধারাবাহিকতায় ২০১৪ সাল থেকে ঘটে যাওয়া অনেকগুলো বড় বড় ইখতিলাফ সুকৌশলে এড়িয়ে যেতে চেষ্টা করেছে ইনসাফ। সুসংগঠিত সেকুলার অপশক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করতে হলে ঐক্যবদ্ধ ইসলামী শক্তির দরকার। তাই নিজেদের মধ্যে বহুকাল ধরে চলতে থাকা ছোট-বড় সবরকমের বিরোধকে পাস কাটিয়ে সবার সমন্বয়ে একটা বৃহৎ শক্তি প্রদর্শন করা।

বিগত বছরের ইসলামী অঙ্গনের সব চেয়ে আলচিত ইস্যু ছিল দাওয়াতে তাবলীগের বিরোধ। স্বাভাবিক ভাবেই পাঠকদেরও আগ্রহের প্রধান বিষয় ছিল এটি। কিন্তু ইনসাফ মনে করেছে সাময়িক পাঠক প্রিয় হওয়ার চেয়ে বৃহৎ স্বার্থের দিকে নজর দেয়া উচিৎ। তাই বিগত দিনগুলোতে তাবলীগে মধ্যে চলতে থাকা ইখতিলাফকে সামনে আনে নি ইনসাফ। একটা নিউজ পর্যন্ত করা হয়নি ইনসাফে। তবে এখন যেহেতু ইখতিলাফটা আর নিছক মতভিন্নতা পর্যায়ে নেই, সেটা হকের সাথে বাতিলের লড়াইয়ের পর্যায়ে চলে গেছে, তাই আগামীতে হয়তো আমরা পরামর্শ সাপেক্ষে অন্য সিদ্ধান্ত নিতে পারি। অর্থাৎ; আমরা ইখতিলাফ প্রকাশ করে নিজেদের মধ্যে ঝগড়া দেখাতে ইচ্ছুক না হলেও সম্মিলতভাবে যদি আমরা মনে করি কেউ বাতিল বা বাতিলের দোসর, তার বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান থাকবে ইনশা আল্লাহ।

দাওয়াতে তাবলীগের পাশাপাশি বেশ কয়কটি ইসলামী রাজনৈতিক দলের বিরোধেও আমরা চুপ থাকতে চেষ্টা করেছি ইতোপূর্বে। দলগুলো যখন ভাঙনের মুখে পড়ে, আমরা ভাঙ্গনকে উৎসাহিত না করে সমাধানের জন্য আমাদের ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছি। আমাদের চেষ্টা সফল হয়নি, ভেঙ্গে গেছে দলগুলো। তারপরেও আমরা আশাবাদী যে, আবারো তাঁরা এক হবেন, তাঁরা নিজেদের মধ্যে লড়াই না করে শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করে অপশক্তির বিরুদ্ধে লড়বেন।
আমরা মনে করি, লড়াইটা নিজেদের মধ্যে না করে অপশক্তির বিরুদ্ধে করলে দেশ ও দেশের জনগণের এই দুরাবস্থা আর থাকবে না ইনশা আল্লাহ।

টীম ইনসাফ
কাজের জন্য একটা টীম আবশ্যকীয়। আলহামদু লিল্লাহ একটি ‘মুকাম্মেল টীম’ ইনসাফের জন্য সার্বক্ষণিক কাজ করে যাচ্ছে। প্রাথমিকভাবে ইনসাফের টীম দুই ভাগে বিভক্ত। একটি টীম সার্বক্ষণিক মাঠের কাজ আনজাম দিচ্ছে। আর আরেকটি টীম তাদের পরামর্শ ও অনান্য সহযোগিতা করে যাচ্ছে।

ইনসাফ শুরু থেকেই লাগামহীনভাবে না চলে দেশের বিজ্ঞ আলেম-বুদ্ধিজীবী-লেখকদের পরামর্শে চলার সিদ্ধান্ত নেয়। এই লক্ষ্যে শুরু থেকেই একটি শক্তিশালী উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করা হয়। উপদেষ্টা পরিষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করে ইনসাফকে ধন্য করেন সর্বজন শ্রদ্ধেয় আলেম আল্লামা হাফেজ জুনাইদ বাবুনগরী (দা. বা.)। হজরতের নেতৃত্বে এই পরিষদে আরো রয়েছেন দেশের সর্বজন শ্রদ্ধেয় আলেম-উলামা ও ইসলামী চিন্তাবিদগণ।

সম্পাদকীয় উপদেষ্টা পর্ষদ নামে ইনসাফের দায়িত্ব প্রাপ্ত সম্পাদককে সার্বক্ষণিক পরামর্শের দেয়ার জন্য একটি খাস পর্ষদ রয়েছে। এই পর্ষদ ইনসাফের নীতিমালা অনুযায়ী সম্পাদককে পরামর্শ দিয়ে থাকেন। এবং তাদের পরামর্শেই সম্পাদক পত্রিকা পরিচালনা করেন। শুরু থেকেই এই পর্ষদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ইসলামী মিডিয়া অঙ্গনের রাহবার মাওলানা উবায়দুর রহমান খান নদভী। এছাড়াও রয়েছেন মুফতী হারুন ইজহার চৌধুরী ও  মুহাম্মাদ গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী প্রমূখ।

এছাড়াও ইনসাফকে সুন্দরভাবে পরিচালনা করার জন্য রয়েছে একটি পরিচালনা পর্ষদ। বর্তমানে এ পরিষদে রয়েছেন মাওলানা মুসা বিন ইজহার, মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী, সাইয়েদ মাহফুজ খন্দকার, মারজান হুসাইন চৌধুরী ও মাওলানা সানাউল্লাহ প্রমূখ।

কাজের সুবিধার্থে পরিচালনা পর্ষদ থেকে একজন ইনসাফের উপদেষ্টা সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে থাকেন। শুরুতে এই দায়িত্বে ছিলেন মাওলানা মীর ইদরিস নদভী, এরপর দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী। গত এক বছর যাবত দায়িত্ব পালন করছেন মাওলানা মুসা বিন ইজহার চৌধুরী। আলহামদু লিল্লাহ, অত্যন্ত দক্ষতার সাথেই তিনি দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।
দ্বিতীয় টীমটি সম্পাদকের নেতৃত্বে মাঠে কাজ করে থাকে। এ টিমে সম্পাদক ছাড়াও রয়েছে সিনিয়র সহ সম্পাদক, সহ সম্পাদক, যুগ্ম-বার্তা সম্পাদক, নিউজ-রুম এডিটর, সহকারি নিউজ-রুম এডিটর, বিশেষ প্রতিনিধিসহ জেলা ও থানা পর্যায়ের নিজস্ব প্রতিনিধি।

ইসলামে রাজনীতি আলাদা কোন বিষয় নয়। এটা পূর্ণাঙ্গ ইসলামেরই একটা অংশ। আমরা মনে করি, রাজনীতির সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে যুক্ত থাকলেও ইসলামী মিডিয়ার ক্ষেত্রে সমানভাবে অবদান রাখতে পারেন আমাদের আলেম-উলামারা। এটা বলার উদ্দেশ্য হল, ইনসাফের সাথে যুক্ত এবং গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বশীলদের অনেকেই বিভিন্নভাবে রাজনীতির সাথে যুক্ত। এতে অনেকের মনে বিরূপ প্রশ্ন থাকতে পারে।

অনেকে হয়তো ভাবতে পারেন, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা দায়িত্বে থাকায় ইনসাফ কোনভাবে প্রভাবিত হয় কিনা। আলহামদুলিল্লাহ, ইনসাফের সকল পাঠককে আমরা জানাতে চাই, আল্লাহর মেহেরবানীতে এমনটি এখন পর্যন্ত হয়নি এবং সামনেও হওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই। কারণ ইনসাফের সাথে যুক্ত রাজনীতিবিদরা কোন একক দলের সদস্য নন, বরং তারা একেকজন একেক দলের সদস্য। এছাড়াও শুধুমাত্র দ্বীনকে সামনে রেখে তারা দায়িত্ব পালন করছেন। গত ৪ বছরে কোন দায়িত্বশীল সামান্যতমও প্রভাব বিস্তার বা নিজের মতকে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা চালান নি। ইনসাফ চলছে তার নীতিমালা অনুযায়ী।

তবে ইনসাফের নীতিমালা অনুযায়ী কেবল মাত্র উপদেষ্টা পরিষদ ও পরিচালনা পর্ষদে রাজনীতিবিদরা যুক্ত থাকতে পারবেন। সম্পাদকীয় উপদেষ্টা ও সম্পাদকের নেতৃত্বে কাজ করা সংবাদকর্মীদের ক্ষেত্রে রাজনীতির সাথে সরাসরি যুক্ত থাকার নিয়ম নেই।

ইনসাফ শো
নিজেদের সবটুকু সামর্থ্য দিয়ে ২০১৪ সালে ইনসাফের যাত্রা শুরু হয়। আলহামদুলিল্লাহ এখনো অব্যাহত রয়েছে এ যাত্রা। অনলাইন পত্রিকা-জগতে খবর পরিবেশনের ক্ষেত্রে সেকুলার গোষ্ঠীর এক চোখা নীতির বিপরীতে গণমানুষের পক্ষে কিছুটা হলেও অবদান রাখতে পেরেছে ইনসাফ। তবে বাম-সেকুলার টেলিভিশনে চলতে থাকা লাগাতার অপপ্রচারের বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থান জানান দেয়ার মত কোন মাধ্যম ছিল না গণমানুষের । ২০১৬ সালের শুরুর দিকে আমরা চেষ্টা করলাম ফেসবুক বা ইউটিউবের মাধ্যমে সরাসরি শো বা আলোচনা অনুষ্ঠান সম্প্রচার করতে। সে লক্ষ্যে বেশ কয়েকটি শোও রেকর্ড করা হয়েছিল। কিন্তু কারিগরি ক্রুটির কারণে তা আর প্রচার করা হয়ে উঠে নি। অবশেষে, ২০১৭ সালের মে মাসের ৬ তারিখ আমাদের প্রথম শো প্রচার হয় আলহামদু লিল্লাহ। ইলেকট্রিক মিডিয়ার মাধ্যমে চলতে থাকা অপপ্রচারের বিরুদ্ধে কিছুটা হলেও ভূমিকা রাখতে পারছে ইনসাফ শো। প্রথম শো-টি সঞ্চালনা করেছিলেন আমার পূর্বপরিচিত ফেসবুকের প্রিয় মুখ মাওলানা ওয়ালী উল্লাহ আরমান। অনেকটা বাধ্য হয়েই দ্বিতীয় শো’তেই আমাকে সঞ্চালনার দায়িত্বে থাকতে হয়। আমার সঞ্চালিত প্রথম শো’র পরেই সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয় ইনসাফ শো। এর একাধিক কারণের মধ্যে একটা কারণ এটাও ছিল যে, আমার সঞ্চালনা আমারই পছন্দ হচ্ছিল না আর কাউকে সেভাবে পাচ্ছিলামও না। অতিথি হয়ে কথা বলাটা সহজ, কিন্তু সঞ্চালনা করাটা যে আসলেই একটু কঠিন সেটা আমার বুঝে আসে। আর আমাদের শো’গুলোতে সমসাময়িক রাজনীতি ও সামাজিক বিষয় নিয়ে আলাপ-আলোচনা করা হয়। সঞ্চালক না পাওয়ার এটাও একটা কারণ। আমাদের যে ভায়েরা সঞ্চালনায় অভ্যস্ত বা যারা সঞ্চালনা করে থাকেন, তাদের প্রায় সকলেই ধর্মীয় অনুষ্ঠানের গণ্ডিতে আবদ্ধ। পরবর্তীতে আবারো আমাকেই করতে হয় সঞ্চালনার কাজটি। এখনো যে আমি খুব সন্তুষ্ট তা নয়, তবে বাধ্য। আলহামদুলিল্লাহ, ইতোমধ্যে ইনসাফ শো-এর ৩৬ তম পর্ব প্রচারিত হয়েছে। দেশের প্রায় সকল সিনিয়র আলেম-উলামাকে নিয়ে আমরা শো করতে পেরেছি। সাধারণত রাজনৈতিক ও সমসাময়িক বিষয় নিয়ে আলাপ করা হলেও ইসলামী সংস্কৃতি অঙ্গন নিয়েও কিছু শো আমরা করেছি। এছাড়াও বিশেষ দিনগুলোতে বিশেষ শো-এর আয়োজন করা হয়েছিল। যেমন মুফতী আমিনী রহঃ স্মরণে ‘স্মরণে মুফতী আমিনী’ নামে করা হয় একটি শো। এভাবে সীরাত বিষয় ‘হে প্রিয় রাসুল’ শিরোনামে শো-সহ বেশ কয়কটি শো করা হয়েছিল। আগামীতে আরো কিছু ভাল কাজ দেয়ার ইচ্ছে আছে। আপনাদের দোয়া ও সহযোগিতা চাই।

এছাড়াও আমরা ইনসাফ সংবাদ নামে ভিডিও সংবাদ চালু করেছি। পরীক্ষামূলকভাবে চলছে গত কিছুদিন ধরে। আশা করছি, এবার নিয়মিত করতে পারব ইনশা আল্লাহ। এটা একটা বড় প্রজেক্ট, আপনারা আমাদের সাথে থাকলে ও দোয়ায় আমাদেরকে শরীক করলে ইনশা আল্লাহ এই সেক্টরেও নিয়মিত হতে পারব।

শেষ কথা; আমরা আমাদের স্বল্প সামর্থ্য ও যোগ্যতা নিয়ে কাজ করার চেষ্টা করে যাচ্ছি। আলহামদুলিল্লাহ, ২০১৪ সালে শুরু হওয়া আমাদের পথ চলা আজ অব্দি গতিশীল আছে। আল্লাহ চাইলে সামনের দিনগুলোতেও থাকবে। ২০১৪ সাল আর আজকের দিন কোন ভাবেই সমান নয় ইসলামী অনলাইন মিডিয়ার ক্ষেত্রে। অনেকদূর এগিয়েছে ইসলামী ঘরানার মিডিয়া জগত। আল্লাহর ইচ্ছায় এই যাত্রাটা ইনসাফের মাধ্যমেই শুরু হয়েছিল। আমরা এ জন্য মহান আল্লাহর দরবারে কৃতজ্ঞটা জানাচ্ছি। আপনাদের দোয়া ও সহযোগিতা চাই, আপনারা আমাদের জন্য দোয়া করবেন। আমরা আরো অনেক-অনেক কাজ করে যেতে চাই।