ওয়াজের ময়দান সমস্যা ও সমাধান

জানুয়ারি ১৮, ২০২০



মাওলানা মাহমুদ হাসান সিরাজী | প্রিন্সিপাল: জামিয়া ওসমান ইবনে আফফান রা:


ওয়াজের সংস্কৃতি এ দেশে আবহমানকাল থেকে চলে আসছে। এ দেশের মানুষের দীন শিক্ষার বড় একটা মাধ্যমও এ ওয়াজ মাহফিল। সাধারণ মানুষ,যারা পড়া লেখা জানে না তাদের জন্য আল্লাহ এবং তার রাসূলের পথ চিনার বড় মাধ্যমও এ ওয়াজ মাহফিল।

ইদানিং এ ময়দানে সৈনিকের যেমন অভাব নেই তেমনি সমস্যারও অভাব নেই।

এ ময়দানের বর্তমানে সবচেয়ে বড় কয়েকটা সমস্যা হল

হক্বের কথা বলতে গেলে আর এটা কোনো পাতিনেতার গায়ে লাগলে প্রকাশ্যে মাহফিল বন্ধ করে দেওয়া বা বক্তাকে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া।

রাজনৈতিক কোনো ইস্যু আসলে আর পিছনে কোনো টিকটিকি থাকলে প্রশাসনের মাধ্যমে মাহফিল বন্ধ করে দেওয়া বা বক্তাকে জনসম্মুখে গ্রেফতার করে নেওয়া।

বক্তা নিজেদের ঘরানার না হলে আর কোথাও কোনো শব্দ প্রয়োগে এদিক সেদিক হলে এলাকা কেন্দ্রিক বক্তাকে বয়কট করা।

বক্তার জ্ঞানের পরিধি না থাকায় ওয়াজের ময়দানে বানোয়াট কিচ্ছা কাহিনী শুনিয়ে শ্রোতাদের বিভ্রান্ত করা অথবা বক্তার অপরিপক্বতার কারণে স্থানকাল পাত্র না বুঝে ভুল মাসআলা প্রদান করা।

উল্লেখিত সমস্যাগুলোই আমার নিকট বড় বড় সমস্যা মনে হচ্ছে। এ ছাড়া ছোটো-ছোটো হাজারো সমস্যা থাকতে পারে।

অথচ ওয়াজের এ ময়দানটা আমাদের জন্য বড় একটা নেওয়ামত ছিল। আমি অনেক বড় বড় ডক্টর সম্পর্কে জানি, যাদের বক্তব্যে শ্রোতাদের টাকা দিয়েও আনা যায় না। জেনারেল লেবেলে ৫ হাজার লোকের উপস্থিতির একটা প্রোগ্রাম করতে ১০ লক্ষ টাকা দিয়েও কাভার করা যাবে না। সে তুলনায় আমাদের বক্তাদের ওয়াজ শ্রবণের জন্য শ্রুতারা হাজার হাজার নিজের পকেটের পয়সা খরচ করে মাহফিলে চলে আসে।

আমাদের দায়িত্ব ছিল এ ময়দানটাকে ধরে রাখা। এ ময়দানের মাধ্যমে এ দেশের সাধারন মুসলমানদেরকে সঠিক পথ দেখানো।

আগামীতে এদেশের মুসলমানদের জন্য আহুত সমস্যা নির্ণয় করে সকলে এক যুগে কাজ করা। সকলের সম্মেলিত প্রচেষ্টায় একটা শক্তিশালী ঐক্যের প্লাটফর্ম তৈয়ার করা।

নিজেদের মাঝে ফুরুয়ী মাসআলা নিয়ে হাজারো মতবিরোধ থাকতে পারে। কিন্তু ঐক্য গড়ার সূত্রগুলো সামনে নিয়ে সকলে এক যুগে কাজ করা।

একজন বক্তা যখন ওয়াজ করতে যান তখন তাকে হাজারো দিকে খিয়াল করা দরকার। বক্তাজগতের উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন মাওলানা দেলোয়ার হোসেন সাঈদী। ওনার রাজনৈতিক চিন্তা চেতনার সাথে এদেশের অনেকের মত আমারও দ্বিমত আছে, কিন্তু ওনি বিতর্কের উর্ধের একজন বক্তা ছিলেন এটা স্বিকার করতে একটুও কার্পন্যতা করতে পারব না।

ওয়াজের ময়দানে তিনি কখনো কোনো বিতর্কিত ফতোয়া দিতেন না। তাঁর জানার পরিধিটা কিন্তু কম ছিল না। তাঁর পাণ্ডিত্যের ব্যাপারে শক্র মিত্র সকলে একবাক্যে মেনে নিতে প্রস্তুত। তাই তিনি এ ময়দানে বহুদিন রাজ করতে পেরে ছিলেন।

এখনকার অনেক বক্তাই নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারেন না। সামনে জনসমুদ্রের মত শ্রুতা দেখে নিজেদেরকে হারিয়ে ফেলেন। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলে আসা অমিমাংশিত মাসআলাগুলোও জনসাধারণের সামনে ফতোয়া আকারে প্রকাশ করে যাচ্ছে।

আমি মনে করি, এটা তাদের অপরিপক্বতা। তারুণ্যের গরমীর বহিঃপ্রকাশ। নতুবা ময়দানটাকে এভাবে ভাগাভাগি করে নেওয়ার কি দরকার?

সবশেষে একটা কথা বলি, অনেকে না বুঝে কওমীয়ানদের বিরোধিতা করে থাকেন। এ দেশে যতবার ইসলামে আঘাগ এসেছে ততবার কওমীয়ানরা নিজ স্বার্থের উর্ধে উঠে এর প্রতিবাদ করে গেছেন। নিকট অতীতকে নিয়ে একটু ভাবুন।

শাহবাগে ইসলাম আক্রান্ত হলে কওমীয়ানরা হেফাজতের ব্যানারে বুকের তাজা রক্ত দিয়ে এটা প্রতিহত করেছে।

আদালতে ধর্ম অবমাননা করে মূর্তী বসালে কওমীয়ানদের প্রতিবাদের মুখে সরকার তা সরাতে বাধ্য হয়।

পাঠ্যসূচীতে নাস্তিক্যবাদ প্রবেশ করলে সে হেফাজত রাজপথে নেমে তা প্রতিহত করে।

কাদীয়ানী ফিতনাসহ ছোটো বড় এমন হাজার সমস্যা কওমীয়ানরা বুক পেতে মোকাবিলা করে যাচ্ছেন।

সুতরাং যাদের কিবলা এক, যাদের নবী এক, যাদের সাথে ফুরুয়ী মতবিরোধ থাকলেও উসূলী মতবিরোধ শূন্যের কোঠায় তারা চাইলে কওমীয়ানদের সাথে একাকার হয়ে সমাজ ও ইসলামের কাজ করতে পারেন। এতে দেশ ও জনগণ সকলের জন্য কল্যাণকর হবে।