আরাফার দিনে রোজার ফযিলত ও প্রাসঙ্গিক আলোচনা

মাওলানা তানভীর সিরাজ


সময়কে নিয়ে ভাবা সময়ের দাবি, তাই তাকে নিয়ে ভাবা আমাদের দরকার। আর না হয় আল্লাহর দেয়া এ সময় হাশরের মাঠে আমার আপনার বিরুদ্ধে নালিশ দিবে। যেসময় কথা বলবে আপনার হাত-পা,তালাবন্ধ থাকবে আমার আপনার মুখ।
قال النبي صلي الله عليه وسلم :
“ما من يوم ينشق فرجه إلا وينادي يا ابن آدم أنا خلق جديد وعلي عملك شهيد ,فتزهد مني فإني لا أعود إلي يوم القيامة ”

নবী কারীম সাল্লাহুআলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন , “যখনই কোনদিনের প্রভাত উদিত হয়, তখনই প্রভাতকাল মানুষকে সম্বোধন করে বলে, হে আদম সন্তান! আমি এক নতুন সৃষ্টি এবং কর্মের সাক্ষী। সুতরাং তুমি আমার থেকে পাথেয় সংগ্রহ কর। কেননা কিয়ামত দিবস পর্যন্ত আমি আর ফিরে আসব না।”
বুস্তানুল মুহাদ্দিসীন , পৃ: ১৭৪,প্রকাশনা;ইসলামিক ফাউন্ডেশন।

সময় আল্লাহর এক বড় নিয়ামত। চলমান সময়টি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। তা নিয়ে সোনালি যুগের মানুষ যেমন যত্নবান ছিলেন, তেমনি সচেতন আছেন নব্য জাহিলিযুগের বনি আদমও। আর না হয় আজোবধি তাদের বাতলানো আমল আমার আপনার কাছ পর্যন্ত পৌঁছতো না।
এই যে দেখুন, এখন যে সময়ের কথা আমরা চিন্তা করতে পারি, তা হল বর্তমান সময়ের সবচে’ গুরুত্ববহ আমলের একটি, ‘আরাফার দিন রোজা রাখা’।
সোনালি মানুষগুলো রোজাটি রেখেছেন বলে আমরাও রাখবো এবং অন্যকে তা রাখার দাওয়াত দিবো।
আসুন, এবার আমরা তা নিয়ে সবিস্তারে আলোচনা করি।
حديث أبى قتادة مرفوعا: ” صوم يوم عرفة
يكفر سنتين ماضية ومستقبلة , وصوم عاشوراء يكفر سنة ماضية “.

আনসারী সাহাবী হযরত আবু কাতাদা রা. থেকে (মারফুভাবে) বর্ণিত। তিনি বলেন, আরাফার দিনের একটি রোজা একবছর আগের ও পরের গুনাহকে মাফ করে দেয় আর আশুরার রোজা গত একবছরের গুনাহকে মাফ করে দেয়।
(মুসলিম, ১১৬২)

অর্থাৎ ; কাল (২০ আগস্ট ২০১৮) তারিখ। এই তারিখের আগের ও পরের একবছরের ছগিরাহ (ছোট গুনাহ) মাফ করে দেবেন আল্লাহ্‌ তা’আলা। তবে কবিরা গুনাহ (বড় গুনাহ) মাফ হয় তাওবা নাসুহার দ্বারা।

এখন একটি প্রশ্ন হল,
কার ওপর রোজাটি মুস্তাহাব ?
উত্তরে বলব সোনালি মানুষের কথা।

” أَنَّ يَوْمَ الْجُمُعَةِ يَوْمُ عِيدٍ، وَيَوْمَ عَرَفَةَ يَوْمُ عِيدٍ لِأَهْلِ عَرَفَةَ؛ وَلِذَلِكَ كُرِهَ لِمَنْ بِعَرَفَةَ صَوْمُهُ”

তারা বলেন, ” জুমার দিন ঈদের দিন, আর আরাফার দিন হাজীদের জন্য ঈদের দিন ; আর সে জন্য ( ঈদের দিন হওয়ার কারণে) আরাফার রোজা তাদের ক্ষেত্রে মাকরুহ।”

আরেকটি প্রশ্ন: কেন হাজী সাহেবরা মহাফযিলতের রোজাটি রাখবেন না?
উত্তর : প্রথমকথা হলো এ ব্যাপারে কিছু মতবিরোধ দেখা গেলেও বাস্তব সত্য হলো এক রোজাতেই দশহাজার রোজার সমপরিমাণ নেকি। এরপরেও যখন কিছুমতবিরোধ আছে নিচে তা পেশ করা হল।
মূলপাঠ:
وَقَدِ اخْتُلِفَ فِي حِكْمَةِ اسْتِحْبَابِ فِطْرِ يَوْمِ عَرَفَةَ بِعَرَفَةَ، فَقَالَتْ طَائِفَةٌ: لِيَتَقَوَّى عَلَى الدُّعَاءِ، وَهَذَا هُوَ قَوْلُ الخرقي وَغَيْرِهِ، وَقَالَ غَيْرُهُمْ – مِنْهُمْ شَيْخُ الْإِسْلَامِ ابن تيمية -: الْحِكْمَةُ فِيهِ أَنَّهُ عِيدٌ لِأَهْلِ عَرَفَةَ، فَلَا يُسْتَحَبُّ صَوْمُهُ لَهُمْ، قَالَ: وَالدَّلِيلُ عَلَيْهِ الْحَدِيثُ الَّذِي فِي ” السُّنَنِ ” عَنْهُ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنَّهُ قَالَ: ( «يَوْمُ عَرَفَةَ، وَيَوْمُ النَّحْرِ، وَأَيَّامُ مِنًى، عِيدُنَا أَهْلَ الْإِسْلَامِ» ) . زاد المعاد في هدي خير العباد 61 :
অর্থ :
আরাফার দিনে হাজীদের জন্য রোজাটি না রাখা মুস্তাহাবের ব্যাপারে মতানৈক্য দেখা দিয়েছে।
একপক্ষ বলছে, হাজীরা আরাফার দিনে রোজাটি ছেড়ে দিলে তারা ভালো মত দোআ, ইবাদত বন্দেগিতে শক্তি জোগাতে পারবে। এই মতটি ইমাম খুরকীসহ অন্যান্য ইমামদের মত, আবার তার মাঝে শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাও আছেন!
তিনি এ বিষয়ে একটি হেকমত বা কৌশল উল্লেখ করে বলেন, এই দিনটি হল আরাফাবাসির জন্য ঈদের দিন, তাই তাদের জন্য রোজাটি রাখা মুস্তাহাব না।
তার কথাটি প্রমাণ করতে গিয়ে তিনি সুনানে বর্ণিত একটি হাদিসের দিকে ইশারা করে বলেন, রাসূল সা. বলেছেন, “আরাফার দিন, কুরবানির দিন আর মিনার তিনদিন মুসলিমদের জন্য ঈদের দিন। ” যাদুল মা’আদ,পৃ: ৬১।
একি বিষয়ে নিচে আরও কিছু হিকমত বা কৌশলের কথা উল্লেখ করা হল।
শরহুল শামায়েল নামক কিতাবে আহলে আরাফারা বা আরাফায় অবস্থানকারী হাজী রোজাটি না রাখার ব্যাপারে আরেকটি কারণ হল,
অনুবাদ : সুতরাং সে রোজাটি না ধরলেও সমস্যা নেই, যদি নিজের উপর দুর্বলতার আশংকা করে আর শক্তি অর্জন যার একান্ত প্রয়োজন হয় তার। যেমনটা আরাফায় অবস্থানকারীদের বেলায় এসেছে।
* আরাফায় অবস্থানকারীগণ রোজাটি ছেড়ে দেয়া হল নবীর পক্ষ থেকে হাদিয়া ;

قَالَ ابْنُ القيِّمِ رَحِمَهُ اللَّهُ تَعَالَى: وَكَانَ مِنْ هَدْيِهِ -صلى اللَّه عليه وسلم- إِفْطَارُ يَوْمِ عَرَفَةَ بِعَرَفَةَ، وَقَدْ ذُكِرَ لِفْطِرْهِ -صلى اللَّه عليه وسلم- بِعَرَفَةَ عِدَّةُ حِكَمٍ:
1 – مِنْهَا أَنَّهُ أَقْوَى عَلَى الدُّعَاءِ.
2 – وَمِنْهَا أَنَّ الْفِطْرَ فِي السَّفَرِ أَفْضَلُ فِي فَرْضِ الصَّوْمِ، فَكَيْفَ بِنَفْلِهِ.
زاد المعاد (2/ 73 – 74).

আল্লামা ইবনুল কায়্যুম র. বলেন : আরাফার দিন হাজীরা ইফতার করবে, এই বিধান হল নবীর সা. পক্ষ থেকে হাদিয়া। সেই রোজাটি তারা ছেড়ে দেয়ার ব্যাপারে কিছু হিকমতের কথা আলোচনা করা হয়েছে আর তা নিচে আলোকপাত করা হল।
১, দোআ বা ইবাদত বন্দেগীতে শক্তি জোগাতে পারে।
২, সফর বা ভ্রমণে যেখানে ফরজ রোজাতে ছেড়ে দেয়ার অনুমতি আছে, সেখানে নফল রোজার বেলায় তা হবে না কেন ?!!!
যাদুল মা’আদ, খ.২,পৃ. ৭৩-৭৪।
* আশুরা ও আরাফার রোজাতে তুলনা :

“وظاهره أن صيام يوم عرفة أفضل من صيام عاشوراء، وقد قيل: الحكمة في ذلك أن يصوم عاشوراء منسوب إلى موسى” عليه الصلاة والسلام “ويوم عرفة منسوب إل النبي -صلى الله عليه وسلم، فلذلك كان أفضل”.
: شرح الزرقاني على المواهب اللدنية
بالمنح المحمدية279 p

ইহা প্রমাণিত আছে যে,
আশুরার রোজাসমূহের চেয়ে আরাফার রোজা উত্তম। সেক্ষেত্রে আরেকটি হিকমত হল যে, আশুরার রোজাগুলো দ্বারা ইশারা হয় হযরত মুসা আ. এর দিকে আর আরাফার রোজা দিয়ে ইংগিত করা হয় আমাদের নবী মুহাম্মদ সা. এর দিকে। সেজন্য আরাফার রোজা আশুরার রোজার চেয়ে শ্রেষ্ঠ বলা হয়েছে।
সূত্র : শরহুয যারকানী ‘আলাল মাওয়াহিবিল লুদনিয়্যাহ বিল মানহিল হামদিয়্যায়, পৃ:২৭৯।
* আল- আওসাতে আম্মাজান আয়েশা র. থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে আছে রাসূল স. এই রোজা রাখতে নিষেধ করেছেন।
হাদীস:
وأخرج الطبراني في الأوسط من حديث عائشة رضي الله عنها قال : ” نهى رسول الله صلى الله عليه وسلم عن صوم يوم عرفة بعرفات “.
অর্থ ;
আল-আওসাতে হযরত আয়েশা র. থেকে ইমাম ত্ববরানী একটি রেওয়ায়েত বর্ণনা করে বলেন,
” আল্লাহ্‌র রাসূল সা. আরাফা বাসীকে আরাফার দিনে রোজা রাখতে নিষেধ করেছেন। ”
এই হাদীসের জবাব আগে দেয়া হলেও আরেকটি চমকপ্রদ উত্তর আমরা পেশ করতে পারি।

دخل عبد الرحمن بن أبي بكر يوم عرفة على عائشة وهي صائمة يرش عليها، فقال لها: أفطري، فقالت: أفطر وقد سمعت رسول الله – صلى الله عليه وسلم – يقول: ((إن صوم يوم عرفة يكفر العام الذي قبله))

একবার আরাফার দিন আম্মাজান আয়েশা র. এর ভাই আব্দুর রহমান বোনকে রোজা অবস্থায় দেখে বলল, আপনি রোজা রাখলেন কেন? ছেড়ে দেন! তখন আম্মাজান আয়েশা র. উত্তরে ভাইকে বললেন, ” আমি এই রোজা ছেড়ে দিব! অথচ রাসূল সা. বলেছেন, এই রোজার দ্বারা একবছর আগের পরের গুনাহ মাফ হয়ে যায়!
উক্ত হাদীসটি যেখানে আছে ;
أخرجه الإمام أحمد في مسنده 128/ 6 برقم 25014، وأورده الهيثمي في مجمع الزوائد باب صيام يوم عرفة، 189/ 3، وأصل الحديث وهو فضيلة صوم يوم عرفة موجود في كتب الصحاح والسنن، من دون قصة عائشة (ض).
আর আমি যেখানে পেলাম ;
سيرة السيدة عائشة أم المؤمنين رضي الله عنها :৯৮: পৃ
আরাফার রোজার ফযিলত নিয়ে আরেকটি হাদীস পেশ করলাম।
খাদেমুর রাসূল আনাস র. থেকে বর্ণিত আছে যে, যিলহজ্জের প্রতিটি দিন একহাজার দিনের সমতুল্য আর আরাফার দিন একদিনই দশহাজার দিনের সমতুল্য।
বাইহাকী, লাওয়াকিহুল আনওয়ার,পৃ: ৯২, ফাহমুল মুরাম শারহে ফাইযুল কালাম,পৃ: ২৯৭।

জ্বি, আমরাও কেন ছেড়ে দেবো এই মহানদিনের এত বড় ফযিলতপূর্ণ রোজাটি! তবে দুঃখ্যের সাথে যে বিষয়টি আমাদের বারংবার নাড়া দেয় তা হল, তারাবি ৮ রাকাত, ২০ রাকাত নয়, আকীকা কুরবানির সাথে করা যাবে না আর নারী পুরুষের নামাযে নো ফারাকসহ ইত্যাদি বিষয়ে যারা আমাদেরকে ইবাদতে সংকুচিত করার পায়তারা করছে, তাদের থেকে একশত হাত দূরে থাকুন! হাজার বছর আগে জান্নাতে যেতে পারবেন। তারা হয়ত বলবে, আরাফার দিন কোনো রোজা নেই। নবী আ. নিষেধ করেছেন। আমি তাদের বলি, নিজেরা করেন না আমল, অন্যকে কেন পথভ্রষ্ট করেন!?
তাই আসুন, আমরা একরোজায় ১০ হাজার বছর রোজার নেকি নিয়ে লাভবান হই। আমরা আগামীকাল নিজেরাও রোজাটি রাখবো অন্যকেউ সাহায্য করবো। আল্লাহ আমাদের আমল করা সহজ করে দেন। আমীন।