শনিবার | ২৯ নভেম্বর | ২০২৫

ইসলামের মোড়কে বাউল দর্শন ও আচারভিত্তিক প্রতারণা বন্ধ করতে হবে: ৩৭১ শিক্ষকের বিবৃতি

ইসলামের মোড়কে বাউল দর্শন ও আচারভিত্তিক প্রতারণা বন্ধ করার আহ্বান জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন ৩৭১ জন বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজের শিক্ষক।

শনিবার (২৯ নভেম্বর) তারা এ বিবৃতি দেন।

বিবৃতিতে বলা হয়, “বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ জনগণ সব সময়ই ভিন্ন মত, পথ ও সংস্কৃতির প্রতি সহনশীল। বাউল দর্শন ও ধর্ম এই ভূমির একটি সাংস্কৃতিক বাস্তবতা। তবে বাউল দর্শন যেমন এদেশের মূল জাতিসত্তার বিশ্বাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, তেমনি তাদের দেহতত্ত্বনির্ভর রতিসাধনাও এদেশের প্রচলিত নৈতিক মূল্যবোধের পরিপন্থি।”

এতে আরো বলা হয়, “ড. আনোয়ারুল করিম তার ‘বাংলাদেশের বাউল’ গ্রন্থে বাউল সম্প্রদায়ের যে সব আচার, দেহতান্ত্রিক রীতি ও তন্ত্র-সাধনার উল্লেখ করেছেন যেমন: মাসিকের রক্ত, বীর্য, স্তনদুগ্ধ পান; গাঁজা সেবন ও দেহতত্ত্বনির্ভর রতি-সাধনা; ‘প্রেমভাজা’ নামে মল, মূত্র, রজ ও বীর্য মিশিয়ে তৈরিকৃত অস্বাস্থ্যকর পদার্থ ভক্ষণ; বিবাহবহির্ভূত যৌনাচার শুধু এদেশের আপামর জনসাধারণের মূল্যবোধের পরিপন্থিই নয়, বরং সামাজিকভাবে বিপজ্জনকও বটে।”

শিক্ষকগণ তারা বলেন, “বাউলদের নিজস্ব দর্শনচর্চা ও আচার-অনুশীলন ততক্ষণ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার কারণ হয় না, যতক্ষণ তা তাদের নিজস্ব পরিভাষা ও পরিমণ্ডলে সীমাবদ্ধ থাকে; এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ধর্মবিশ্বাস ও আচারকে সংক্রমিত না করে এবং তাদের নিজস্ব দর্শনকে প্রতারণামূলকভাবে প্রচলিত ধর্ম বিশেষত ইসলামের মোড়কে জনসমক্ষে উপস্থাপন না করা হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বাউল আবুল সরকারের আচরণ এই সীমা অতিক্রম করেছে। আবুল সরকার একটি অনুষ্ঠানে কুরআনের আয়াত বিকৃত ও অশুদ্ধ করে পাঠ করে যেমন কুরআনের অবমাননা করেছেন, তেমনি তর্কের বাহানায় আল্লাহর নামে মিথ্যা তথ্য পরিবেশন করে এবং আল্লাহর শানে শিষ্টাচারবহির্ভূত অশ্লীল বাক্য প্রয়োগ করে মুসলিমদের ধর্মীয় অনুভূতিকে আঘাত করেছেন। যেমন তিনি বলেছেন, ‘আল্লাহর কথার গোয়া-মাথা আমি কিছুই পাই না।’ একই সঙ্গে তিনি বাউল দর্শনের শিরকী বক্তব্য অসচেতন শ্রোতাদের সামনে ইসলামের ছদ্মাবরণে উপস্থাপন করেছেন। যেমন তিনি গানের সুরে বলেছেন, ‘তুমি আমি একই সাথে মিশে ছিলাম এক জাতে, ভিন্ন হইলে প্রমাণ দাও সাক্ষাতে.. প্রেমের ও তাকাজা তুমি সইতে না পারিয়া, নিজের ইচ্ছায় নুজুল হইলা মানব রূপ ধরিয়া’।”

৩৭১ জন শিক্ষকের বিবৃতিতে আরো বলা হয়, “তার এসব শিরকপূর্ণ ও শিষ্টাচারবহির্ভূত অশ্লীল বক্তব্য সমাজে উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে তার ওপর এবং তার মুক্তির দাবিতে মাঠে নামা সমর্থকদের ওপর সাধারণ মানুষের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ দেখা দিয়েছে। যদিও আইনশৃঙ্খলা নিজের হাতে তুলে নেওয়া কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়, তবে এর পেছনে আবুল সরকারের উসকানিই যে প্রধানত দায়ী; এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই।”

তারা বলেন, “যিনি উত্তেজনা ও অস্থিরতার সূচনা করেছেন, তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ, এটাই ন্যায়সংগত রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। যিনি স্বেচ্ছায় সমাজে উসকানি সৃষ্টি করেছেন, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করেছেন, যার ফলশ্রুতিতে সংঘাতের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। তার নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করা কোনো শিক্ষিত ও বিবেকবান মানুষের কাজ হতে পারে না। কিন্তু দেখা যাচ্ছে কিছু তথাকথিত বুদ্ধিজীবী বাক ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার নামে আবুল সরকারের অপকর্মকে আড়াল করে তার পক্ষে সাফাই গাইছেন, যা সাধারণ জনতার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে দিয়ে পরিস্থিতিকে আরো নাজুক করে তুলতে পারে।”

রাষ্ট্র ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে জোর দাবি জানিয়ে তারা বলেন, “আবুল সরকারের ধর্ম অবমাননাকর, বিভ্রান্তিমূলক এবং সামাজিক অস্থিরতা-উদ্রেককারী বক্তব্য ও আচরণের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক এবং ইসলামের মোড়কে বাউল দর্শন ও আচারের প্রতারণামূলক প্রচার বন্ধ করা হোক।”

৩৭১ জন বিবৃতদাতাদের মধ্যে রয়েছেন ১০০ জন অধ্যাপক, ৭৪ জন সহযোগী অধ্যাপক, ৯৯ জন সহকারী অধ্যাপক এবং ৯৮ জন লেকচারার। বিবৃতি প্রদানকারী শিক্ষকদের বিস্তারিত তালিকা www.mullobodh.com ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।

বিবৃতি দেওয়া শিক্ষকদের মধ্যে রয়েছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাবিনা ইয়াসমিন (জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি) ও অধ্যাপক মনজুরুল মুহম্মদ করিম (মাইক্রোবায়োলজি)। বুয়েটের অধ্যাপক মোহাম্মদ ফয়সল, বুটেক্সের অধ্যাপক মাহমুদা আক্তার, সিটি ইউনিভার্সিটির প্রো-ভিসি অধ্যাপক কাজী শাহাদাৎ কবীর, ডুয়েটের অধ্যাপক কাজী রফিকুল ইসলাম, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আয়েশা আখতার (মেরিন সায়েন্স) ও সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক (দর্শন বিভাগ)। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শামীমা তাসনীম (রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ) ও অধ্যাপক মোহাম্মাদ আবুল হাসনাত (রসায়ন বিভাগ)। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তারেক মুহাম্মদ তওফিকুর রহমান (রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ), জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তারেক মুহাম্মদ শামসুল আরেফিন (অর্থনীতি), ড্যাফোডিল ইনটারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক মোখতার আহমাদ, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. আরিফ মোর্শেদ খান, ইন্ডিপেন্ডেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের (আইইউবি) সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মাদ সরোয়ার হোসেন এবং মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির লেকচারার আসিফ মাহতাব উৎস প্রমুখ।

spot_img

সর্বশেষ

spot_img

এই বিভাগের

spot_img