লন্ডনভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা কেজ ইন্টারন্যাশনাল “আউট অব দ্য শ্যাডো অব হাসিনা” শিরোনামে বাংলাদেশ নিয়ে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। সংস্থাটি বলেছে, শেখ হাসিনার শাসনামলে সন্ত্রাস দমন ও স্থিতিশীলতার স্লোগানকে ঢাল বানিয়ে দেশে নীরবতা, দমন ও ভয়ভিত্তিক এক শাসনব্যবস্থা কায়েম করা হয়। কেজ ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছে, এই শাসনব্যবস্থার ভেতরে ইসলামি পরিচয়, ধর্মীয় অনুশীলন, দাওয়াতি তৎপরতা, সরকারবিরোধী মত, সাংবাদিকতা এবং মানবাধিকারকর্মকে এক সুতোয় বেঁধে ‘নিরাপত্তা ঝুঁকি’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। সংস্থাটির অভিযোগ, আইন, ট্রাইব্যুনাল এবং নিরাপত্তা বাহিনীর বিশেষ ইউনিটকে মিলিয়ে এমন এক দমনযন্ত্র দাঁড় করানো হয়, যার ভেতর দিয়ে নির্বিচার গ্রেপ্তার, জোরপূর্বক গুম, নির্যাতন এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড দীর্ঘদিন চলতে থাকে।
কেজ ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, ৫ আগস্ট ২০২৪ বাংলাদেশের মানুষ এক নতুন বাস্তবতায় জাগে, শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান। সংস্থাটি জানিয়েছে, সরকারি চাকরিতে একটি প্রস্তাবিত আইন নিয়ে শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলন শুরু হয়, কিন্তু ক্ষমতাসীনদের সহিংস দমননীতি আন্দোলনকে দ্রুত সারাদেশে ছড়িয়ে দেয়। সাধারণ মানুষ ক্ষুব্ধ হয় শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা, রাষ্ট্রযন্ত্রের দুর্নীতি, প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয় এবং ক্রমবর্ধমান নিপীড়নে। কেজ ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, গণঅভ্যুত্থানের সময় সরকার সেনা মোতায়েন করে, কারফিউ জারি করে এবং ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয়। সংস্থাটি দাবি করেছে, ওই সময় নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৪ শত পর্যন্ত মানুষ নিহত হন, হাজার হাজার মানুষ আহত হন এবং আনুমানিক ১০ হাজার মানুষ আটক অথবা জোরপূর্বক গুমের শিকার হন। কেজ ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, এই বিস্ফোরণ হঠাৎ তৈরি হয়নি; ২০০৯ থেকে ২০২৪ সময়জুড়ে জমে ওঠা ক্ষোভ, প্রতিরোধ এবং রাষ্ট্রীয় দমনের দীর্ঘ ধারাবাহিকতারই পরিণতি ছিল ০৫ আগস্টের পতন।
কেজ ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছে, হাসিনার শাসনের দমননীতিকে বৈধতার মোড়কে ঢাকতে তিনটি কাঠামোকে সামনে আনা হয়। ২০০৯ সালের অ্যান্টি টেররিজম অ্যাক্ট, ২০১৮ সালের ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট এবং ২০১০ সালের অ্যান্টি টেররিজম ট্রাইব্যুনাল। সংস্থাটি বলেছে, অ্যান্টি টেররিজম অ্যাক্টে সন্ত্রাসী তৎপরতার সংজ্ঞা ছিল অস্পষ্ট ও অতিবিস্তৃত, ফলে বিরোধী রাজনীতি, ইসলামি বক্তৃতা, সমালোচনামূলক বক্তব্য এবং ন্যায্য দাবি সহজেই ‘সন্ত্রাস’ হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ তৈরি হয়। কেজ ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, ২০১৩ সালের সংশোধনীতে সন্ত্রাসের সংজ্ঞা আরও প্রসারিত হয় এবং কঠোর শাস্তির পরিসর বাড়ে, যা অপব্যবহার ও ভুল বিচারের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। সংস্থাটি জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক ফেডারেশন ফর হিউম্যান রাইটস এবং অধিকার এই আইনের সংজ্ঞাকে অতিবিস্তৃত বলে সমালোচনা করে।
ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টকে কেজ ইন্টারন্যাশনাল তথ্যপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণের ভয়ংকর হাতিয়ার হিসেবে দেখিয়েছে। সংস্থাটি বলেছে, অনলাইনে “মানহানি”, “রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতা”, “ভুল তথ্য ছড়ানো” ধরনের অভিযোগে মতপ্রকাশকে অপরাধ বানানো হয়। বিনা পরোয়ানায় গ্রেপ্তার ও দীর্ঘ কারাদণ্ডের বিধান থাকায় সমাজে ভয়, আত্মসংযম ও নীরবতা ছড়িয়ে পড়ে। কেজ ইন্টারন্যাশনাল দাবি করেছে, ২০২৪ সাল পর্যন্ত কমপক্ষে ১ হাজার মানুষ এই আইনে আটক হন। সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, ২০১৮ থেকে ২০২১ সময়কালে এই আইনে ১ হাজার ৫ শতাধিক মামলা হয়। ০১ জানুয়ারি ২০২০ থেকে ৩১ অক্টোবর ২০২১ সময়ের নথিতে ৭ শত ৫৪টি মামলায় ১ হাজার ৮ শত ৪১ জন আসামি এবং ৬ শত ৫৫ জন গ্রেপ্তারের তথ্যও দিয়েছে সংস্থাটি। কেজ ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, পেশাগত পরিচয় নিশ্চিত যাদের, তাদের মধ্যে রাজনীতিক ও সাংবাদিকের অংশ উল্লেখযোগ্য, আর বয়সের হিসাবে ১৮ থেকে ৪০ বছর বয়সীদের অংশ ৮৩ শতাংশের বেশি। সংস্থাটি জানিয়েছে, মামলায় অন্তত ১৭ জন অপ্রাপ্তবয়স্কও জড়ায় এবং ১২ জনকে আটক করা হয়।
কেজ ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টে অভিযোগকারীর ধরন আরও স্পষ্ট করে দেয় কীভাবে ক্ষমতার বলয় আইনকে ভয় দেখানোর অস্ত্র বানায়। তথ্য পাওয়া ৪ শত ১৮ জন অভিযোগকারীর একটি বড় অংশ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা ও সরকারি কর্মকর্তা, এবং রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত অভিযোগকারীরও বড় অংশ ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিল বলে সংস্থাটি দাবি করেছে। কেজ ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, এই বাস্তবতা দেখায় আইনটি রাষ্ট্রযন্ত্রের পাশাপাশি দলীয় প্রভাবশালীদের হাতেও নিপীড়নের কাঁচি হয়ে ওঠে।
অ্যান্টি টেররিজম ট্রাইব্যুনালকে কেজ ইন্টারন্যাশনাল বিচারিক দমনযন্ত্র হিসেবে বর্ণনা করেছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সময়কালে অ্যান্টি টেররিজম অ্যাক্টে ২ হাজার ৫ শতাধিক মামলা হয় এবং ট্রাইব্যুনালে ১ হাজার ৩ শতাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিচারপ্রক্রিয়া চলে। কেজ ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, মামলার বড় অংশ বিরোধী দল বিশেষ করে বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে। সাংবাদিক, ব্লগার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধেও “রাষ্ট্রবিরোধী প্রচারণা” ধরনের অভিযোগে মামলা চলার চিত্র তুলে ধরেছে সংস্থাটি। কেজ ইন্টারন্যাশনাল দাবি করেছে, দণ্ডের হার ৭০ শতাংশের বেশি, এবং বহু রায়ে নির্যাতনে আদায় করা স্বীকারোক্তি, সাজানো প্রমাণ ও স্বচ্ছতার ঘাটতির অভিযোগ রয়েছে। সংস্থাটি বলেছে, অনেক আসামির আইনজীবী পাওয়ার সুযোগ সীমিত ছিল, ফলে বিচারপ্রক্রিয়া মানুষকে ন্যায় দিতে নয়, মানুষকে ভাঙতে কাজ করেছে। হোলি আর্টিজান বেকারি হামলার মতো কিছু প্রকৃত সহিংস ঘটনার মামলাও থাকলেও, ব্যাপক অংশ ছিল রাজনৈতিক ও মতপ্রকাশ নিয়ন্ত্রণের মামলা, এমন অবস্থানও দিয়েছে কেজ ইন্টারন্যাশনাল।
কেজ ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, মাঠপর্যায়ে দমননীতির সবচেয়ে ভয়ংকর মুখ ছিল র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন। সংস্থাটি জানিয়েছে, হাসিনার শাসনামলে র্যাবের বিরুদ্ধে ১ হাজার ২ শতাধিক বিচারবহির্ভূত হত্যা, ৬ শতাধিক গুম এবং ব্যাপক নির্যাতনের অভিযোগ নথিভুক্ত হয়েছে। বহু মৃত্যুকে “ক্রসফায়ার” বলে ব্যাখ্যা করা হলেও মানবাধিকার পর্যবেক্ষকদের অনুসন্ধানে এগুলোর বড় অংশ পরিকল্পিত বলে উঠে আসে, এমন দাবি করেছে কেজ ইন্টারন্যাশনাল। সংস্থাটি জানিয়েছে, নির্বাচন ঘনিয়ে এলে গুম ও হত্যার ঘটনা বেড়ে যায়। ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে এবং ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগের সময়েও এই প্রবণতা তীব্র ছিল বলে কেজ ইন্টারন্যাশনাল বলেছে। পরিবারগুলো থানায় গেলে মামলা নিতে গড়িমসি, খোঁজ থামাতে চাপ ও হুমকির অভিযোগও সংস্থাটি উল্লেখ করেছে।
কেজ ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছে, অ্যান্টি টেররিজম অ্যাক্ট ও ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের মামলায় বহু মানুষ বিচার ছাড়াই দীর্ঘদিন আটক থাকেন। সংস্থাটি বলেছে, ২০২৩ সালে কারাগারে ৮১ হাজারের বেশি বন্দি ছিল, অথচ ধারণক্ষমতা ছিল ৪১ হাজারের মতো। অতিরিক্ত ভিড়, অপুষ্টি, চিকিৎসা সংকটের পাশাপাশি মারধর, বিদ্যুৎ শক, মানসিক নির্যাতন এবং জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি আদায়ের অভিযোগও নথিভুক্ত করেছে সংস্থাটি। কেজ ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, উদ্দেশ্য ছিল ভিন্নমত ভাঙা, নাম বের করা এবং মিথ্যা মামলা দাঁড় করিয়ে দমননীতিকে ‘সাফল্য’ হিসেবে দেখানো।
কেজ ইন্টারন্যাশনাল তিনটি কেস স্টাডিতে দমননীতির মানবিক চেহারা তুলে ধরেছে। প্রথম কেসে গাজীপুরের একটি এতিমখানায় রাত ১০টা ১৫ মিনিটে সাদা পোশাকে কয়েকজন এসে “কিছু প্রশ্ন” করার কথা বলে একজন মাদরাসা-দায়িত্বশীল ব্যক্তিকে নিয়ে যান, এরপর থেকে তার কোনো হদিস নেই বলে সংস্থাটি জানিয়েছে। পরিবার সাধারণ ডায়েরি করলেও মামলা নিতে বাধা এবং অনুসন্ধান থামাতে চাপের কথাও এসেছে।
দ্বিতীয় কেসে ২০১৮ সালে ১৬ বছর বয়সী এক কিশোরকে বাড়ি থেকে তুলে নেওয়ার বর্ণনা দিয়েছে সংস্থাটি। কেজ ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছে, তাকে ধর্মীয় বিশ্বাস নিয়ে জেরা করা হয়, বিভিন্ন গোষ্ঠীর নাম চাপিয়ে স্বীকারোক্তি আদায়ের চেষ্টা হয়, খাবার না দেওয়া এবং অপমানজনক অবস্থায় রাখার অভিযোগ রয়েছে। সাত মাস আটক থাকার পর মুক্তি পেলেও নজরদারি, কর্মসংস্থানে বাধা এবং সামাজিক অপবাদ তাকে তাড়া করে, এমন চিত্রও তুলে ধরেছে সংস্থাটি।
তৃতীয় কেসে ঢাকার গুলশানে কর্মস্থল থেকে ফেরার পথে এক ব্যক্তিকে তুলে নেওয়ার বর্ণনা এসেছে। কেজ ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাষ্ট্রীয় দমননীতি, ইসলামবিদ্বেষ এবং ভারতের প্রভাব নিয়ে সমালোচনাই ছিল মূল লক্ষ্য। জিজ্ঞাসাবাদে ভারতের বিরুদ্ধে লেখা নিয়ে প্রশ্ন করা হয় বলেও সংস্থাটি জানিয়েছে। “তিনশ ফুট” নামে পরিচিত এক ভয়াবহ স্থানে নেওয়ার মাধ্যমে ভীতি তৈরির অভিযোগও আছে। পরে তাকে সাজানো সন্ত্রাস মামলায় দীর্ঘদিন কারাবন্দি রাখা হয়, এবং হাসিনার পতনের পরও মামলা, হাজিরা ও ভ্রমণ সীমাবদ্ধতার চাপ থেকে মুক্তি মেলেনি বলে কেজ ইন্টারন্যাশনাল দাবি করেছে।
কেজ ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, এই কেসগুলো দেখায় গ্রেপ্তার হয়েছে কখনও কর্মস্থল লক্ষ্য করে, কখনও বাসায় বড় অভিযানে, কখনও রাস্তায় অপহরণ করে। জেরা হয়েছে কখনও ধর্মীয় পরিচয়কে সন্ত্রাসের সঙ্গে গুলিয়ে, কখনও বিদেশনীতি বিশেষ করে ভারতের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা থামাতে, কখনও প্রতিষ্ঠানভিত্তিক প্রভাব ও সম্পর্কের নেটওয়ার্ক খুঁজতে। নির্যাতনে ছিল শারীরিক আঘাত, মানসিক ভীতি, অপমান এবং ভুয়া মৃত্যুভীতি তৈরির কৌশল। আইনি প্রক্রিয়ায় কারও ক্ষেত্রে কোনো কাগজ ছাড়াই গুম, কারও ক্ষেত্রে দীর্ঘ বিচারপূর্ব আটক, আবার কারও ক্ষেত্রে বানানো মামলায় আনুষ্ঠানিক বিচার। মুক্তির পরও নজরদারি, সামাজিক কলঙ্ক, অর্থনৈতিক ধস ও পেশাগত ধ্বংস চলতে থাকে, এমন বিশ্লেষণও দিয়েছে সংস্থাটি।
কেজ ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, এই দমননীতি সমাজে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। সাংবাদিকতা ও নাগরিক পরিসরে ভয় ঢুকে পড়ে, আর মানুষ ন্যায্য কথা বলতেও আতঙ্কিত হয়। ২০২৩ সালের বিশ্ব গণমাধ্যম স্বাধীনতা সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১৮০ দেশের মধ্যে ১৬২ তম বলে সংস্থাটি উল্লেখ করেছে। গুম হওয়া পরিবারের ওপর হুমকি, হয়রানি ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের কথাও তুলে ধরেছে কেজ ইন্টারন্যাশনাল, এবং এতে রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানের ওপর মানুষের আস্থা ভেঙে পড়ে বলে সংস্থাটি বলেছে।
আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততার অধ্যায়ে কেজ ইন্টারন্যাশনাল যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ভারতের ভূমিকা তুলে ধরেছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ২০১০ থেকে ২০২০ সময়কালে সন্ত্রাসবিরোধী প্রশিক্ষণে ৫ কোটি ডলারের বেশি বরাদ্দ দেয়, যেখানে র্যাবসহ আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সহায়তাও ছিল। যুক্তরাজ্য সন্ত্রাসবিরোধী আইন কাঠামো তৈরিতে পরামর্শ দেয় বলেও সংস্থাটি বলেছে। ভারতের সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য আদানপ্রদান ও প্রশিক্ষণ সহযোগিতার মাধ্যমে রাজনৈতিক ভিন্নমত দমনের পরিসর আরও জোরদার হয়, এমন অভিযোগও দিয়েছে কেজ ইন্টারন্যাশনাল। সংস্থাটি জানিয়েছে, ২০০৯ সালের কিছু কূটনৈতিক বার্তা উইকিলিকসে প্রকাশিত হওয়ার প্রসঙ্গে ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন রাষ্ট্রদূত জেমস মরিয়ার্টি র্যাবকে শক্তিশালী করার পক্ষে মত দেন এবং মানবাধিকার প্রশিক্ষণ শুরুর কথাও বলেন। পরে ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্র গ্লোবাল ম্যাগনিটস্কি আইনের আওতায় র্যাব ও কয়েকজন কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়, এর পর কিছু ঘটনায় কমতির ইঙ্গিত মিললেও দমন কাঠামোর মূল চরিত্র বদলায়নি, এমন মূল্যায়নও দিয়েছে কেজ ইন্টারন্যাশনাল।
কেজ ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, জবাবদিহি ছাড়া বাংলাদেশে আবারও কর্তৃত্ববাদ ফিরে আসার ঝুঁকি আছে। তাই সংস্থাটি জাতীয় সত্য ও পুনর্মিলন কমিশন গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে, যেখানে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সময়কালের রাজনৈতিক বন্দিত্ব, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও নির্যাতনের সব ঘটনা নথিভুক্ত হবে। কমিশনের স্বাধীনতা, সাক্ষী তলব, নথি উদ্ধার, আর্কাইভে প্রবেশ এবং প্রকাশ্য শুনানির ক্ষমতা নিশ্চিত করার কথাও রয়েছে। গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য বিশেষায়িত বিচার, সাক্ষী সুরক্ষা এবং তদন্ত ও বিচারে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পথ খোলা রাখার প্রস্তাবও দিয়েছে সংস্থাটি। ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ, চিকিৎসা ও মানসিক সহায়তা, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ, স্মৃতিচিহ্ন এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমা প্রার্থনার সুপারিশও রেখেছে কেজ ইন্টারন্যাশনাল। আইন সংস্কারে ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট সম্পূর্ণ বাতিল, অ্যান্টি টেররিজম অ্যাক্ট বাতিল বা আমূল সংস্কার, অ্যান্টি টেররিজম ট্রাইব্যুনাল বাতিল এবং যথাযথ প্রক্রিয়াভিত্তিক নতুন কাঠামো গড়ার কথা বলেছে সংস্থাটি। নিরাপত্তা খাতে র্যাব ভেঙে দেওয়া, মানবাধিকারভিত্তিক প্রশিক্ষণ, দায়ীদের অপসারণ, শক্ত তদারকি ও বেসামরিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সুপারিশও দিয়েছে কেজ ইন্টারন্যাশনাল।
কেজ ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, মুসলিম সমাজে স্থিতিশীলতার নামে জুলুমকে বৈধতা দিলে তা রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত ধ্বংস করে। ইসলামি পরিচয়, ধর্মীয় অনুশীলন এবং জুলুমের বিরুদ্ধে উচ্চারণকে সন্ত্রাসের তকমায় চাপা দেওয়ার পথ বন্ধ না হলে সত্য, ন্যায় ও মানবিকতার বাংলাদেশ গড়া সম্ভব নয়, এমন অবস্থানই নিয়েছে সংস্থাটি।
সূত্র : কেজ ইন্টারন্যাশনাল











