spot_img
spot_img

পাকিস্তানের হামলার জবাব সামরিকভাবেই দেওয়া হবে : মাওলানা মুজাহিদ

ইমারাতে ইসলামিয়ার নেতৃত্বাধীন আফগান সরকার জানিয়েছে, আফগান ভূখণ্ডে পাকিস্তানের সাম্প্রতিক বিমান হামলার জবাব তারা সামরিকভাবেই দেবে। একই সঙ্গে ইসলামাবাদের বিরুদ্ধে বেসামরিক লোকজনকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো এবং দায়েশের সন্ত্রাসীদের “নিরাপদ আশ্রয়” দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন আফগান সরকারের মুখপাত্র মাওলানা জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ।

বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) আল আরাবিয়া ইংলিশকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মাওলানা মুজাহিদ বলেন, পাকিস্তানের এই হামলার জবাব অবশ্যই সামরিক হবে। তবে এর বিস্তারিত গোপনীয় হওয়ায় তিনি তা প্রকাশ করেননি। তিনি বলেন, “স্বাভাবিকভাবেই এর জবাব হবে সামরিক প্রতিক্রিয়া, তবে এর বিস্তারিত গোপনীয় এবং আমি এ বিষয়ে আরও ব্যাখ্যা করতে পারি না। পাকিস্তানকে তাদের ন্যক্কারজনক কর্মকাণ্ডের জবাব পেতেই হবে।”

এর আগে পাকিস্তান রোববার রাতে আফগানিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় নানগারহার এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় পাক্তিকা প্রদেশে বিমান হামলা চালায়। ইসলামাবাদ দাবি করে, পাকিস্তানের ভেতরে হামলার জন্য দায়ী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে লক্ষ্য করেই এ হামলা চালানো হয়েছে। তবে জাতিসংঘ জানিয়েছে, এসব হামলায় বেসামরিক হতাহতের ঘটনা ঘটেছে।

মাওলানা জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ বলেন, পাকিস্তান সন্ত্রাসীদের নয়, বেসামরিক লোকজনকেই লক্ষ্যবস্তু করেছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, নানগারহারে ২২ সদস্যের একটি পরিবার হামলার শিকার হয়েছে। এতে ১৭ জন নিহত এবং ৫ জন আহত হয়েছেন। আর পাক্তিকায় শিশুদের একটি বিদ্যালয়ে হামলা চালানো হয়েছে। এতে এক শিশু আহত হয়েছে এবং কয়েকটি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

মাওলানা মুজাহিদ বলেন, “সেখানে কোনো সশস্ত্র ব্যক্তি ছিল না। শুধু বেসামরিক লোকজনই আহত ও নিহত হয়েছেন, এবং বেসামরিক এলাকাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।”

পাকিস্তান বলেছে, তারা তেহরিকে তালেবান পাকিস্তান ও দায়েশ-সংশ্লিষ্ট সন্ত্রাসীদের লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে, যারা নাকি আফগান ভূখণ্ড ব্যবহার করে তৎপরতা চালাচ্ছিল। কিন্তু কাবুল এ দাবি সরাসরি অস্বীকার করেছে।

মাওলানা মুজাহিদ বলেন, আফগানিস্তান কখনোই নিজের ভূখণ্ড প্রতিবেশী দেশের বিরুদ্ধে ব্যবহারের সুযোগ দেয় না। তিনি বলেন, “দুঃখজনকভাবে, পাকিস্তানের ভেতরে যখনই কোনো হামলা ঘটে, তারা সঙ্গে সঙ্গে কোনো প্রমাণ ছাড়াই সেটিকে আফগানিস্তানের ওপর চাপিয়ে দেয় এবং আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলে। আমরা এটি প্রত্যাখ্যান করছি। আফগান ভূখণ্ড কাউকে ব্যবহার করতে দেওয়া হয় না।”

তিনি আরও বলেন, পাকিস্তানি তালেবান নামে পরিচিত তেহরিকে তালেবান পাকিস্তানের আফগানিস্তানে কোনো উপস্থিতি নেই। মাওলানা মুজাহিদ বলেন, “এগুলো পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ সমস্যা। তেহরিকে তালেবান পাকিস্তান পাকিস্তানের ভেতরেই বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে। তারা সেখানেই থাকতে পারে; তাদের আফগান ভূখণ্ডের প্রয়োজন নেই। আর প্রথমত আমরা তাদের আফগান ভূখণ্ড ব্যবহার করতেই দিতাম না।”

তার দাবি, পাকিস্তান নিজেদের অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ দেখাতে পারেনি। মাওলানা মুজাহিদ বলেন, “প্রমাণ বা দলিল উপস্থাপন না করে তারা শুধু দাবি তোলে, প্রচার চালায়, এরপর এমন পদক্ষেপ নেয়, যেগুলোকে আমরা অমার্জনীয় বলে মনে করি।”

মাওলানা জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ আরও অভিযোগ করেন, পাকিস্তান দায়েশ দমন করার পরিবর্তে তাদেরই আশ্রয় দিচ্ছে। তিনি বলেন, “দায়েশকে দমন করার বদলে পাকিস্তান তাদের নিরাপদ আশ্রয় দিয়েছে।” তার অভিযোগ, বেলুচিস্তান ও খাইবার পাখতুনখোয়ার বিভিন্ন এলাকায় এসব সন্ত্রাসীদের উপস্থিতি রয়েছে।

তিনি বলেন, “কিছু ক্ষেত্রে তারা তাদের আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছে এবং অভিযান ও সন্ত্রাসী হামলা চালানোর জন্য পাঠিয়েছে।”

অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তাহীনতা ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ তুলে মাওলানা মুজাহিদ বলেন, “আমরা বিশ্বাস করি, পাকিস্তানের ভেতরে একটি নির্দিষ্ট সামরিক চক্রকে এই অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, ইমারাতে ইসলামিয়া আফগানিস্তানের ভেতরে দায়েশের বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযান চালিয়েছে। জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ বলেন, “আমরা কাবুল ও অন্যান্য প্রদেশে দায়েশের বিরুদ্ধে খুবই কঠোর অভিযান চালিয়েছি। আমরা তাদের নির্মূল করেছি। আফগানিস্তানে তাদের কোনো বাস্তব উপস্থিতি নেই।”

২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন বাহিনী আফগানিস্তান ছেড়ে যাওয়ার পর এবং তালিবান পুনরায় ক্ষমতায় ফেরার পর থেকেই আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের সম্পর্ক দ্রুত অবনতি হয়েছে।

পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে, সীমান্ত পেরিয়ে হামলা চালানো যোদ্ধাদের দমনে আফগানিস্তান ব্যর্থ। অন্যদিকে আফগান কর্তৃপক্ষ এ ধরনের গোষ্ঠীকে আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে এবং ইসলামাবাদের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংকটকেই দায়ী করছে।

বাণিজ্য ও যাতায়াতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত পারাপারের পথগুলোও উভয় পাশে প্রাণঘাতী সংঘর্ষে কয়েক ডজন মানুষ নিহত হওয়ার পর মাসের পর মাস বেশির ভাগ সময় বন্ধ রয়েছে।

মাওলানা জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার জন্যও পাকিস্তানকে দায়ী করেন। তার ভাষায়, ইসলামাবাদ “নিয়মিতভাবে এমন অজুহাত তৈরি করেছে, যা ব্যর্থতার দিকে নিয়ে গেছে।”

তিনি বলেন, “এটি দেখায় যে, তারা এই অঞ্চলে শান্ত পরিবেশ চায় না। বরং অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করার লক্ষ্যেই তাদের উদ্দেশ্য কাজ করছে। এটি বড় শক্তিগুলোর পক্ষ থেকে তাদের ওপর অর্পিত একটি বাহ্যিক মিশন, যার উদ্দেশ্য হলো নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টি করা এবং সংঘাত উসকে দেওয়া।”

মাওলানা মুজাহিদ বিশেষ করে আঞ্চলিক ও মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, তারা যেন পাকিস্তানের পদক্ষেপের নিন্দা জানায় এবং ইসলামাবাদকে পথ পরিবর্তনে চাপ দেয়।

তিনি বলেন, “আমরা চাই, সব দেশ আফগানিস্তানে প্রতিষ্ঠিত নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতাকে সমর্থন করুক এবং এটিকে আরও শক্তিশালী করতে সহায়তা করুক, যাতে আমরা অঞ্চলকে স্থায়ী স্থিতিশীলতার দিকে এগিয়ে নিতে পারি।”

তিনি আরও বলেন, “আমরা চাই, আঞ্চলিক ও ইসলামী দেশগুলো তাদের দায়িত্ব অনুধাবন করুক এবং পাকিস্তানকে তাদের অবস্থান পরিবর্তনে রাজি করাক। এমন ঘটনা যাতে আবার না ঘটে, সে জন্য দেশগুলোকে তাদের প্রভাব ব্যবহার করা উচিত।”

উত্তেজনা থাকা সত্ত্বেও মাওলানা মুজাহিদ আফগানিস্তান ও পাকিস্তানকে “অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ দুটি দেশ, যাদের বহু অভিন্ন স্বার্থ রয়েছে” বলে বর্ণনা করেন। তবে তিনি বলেন, কাবুলের ওপর দোষ চাপিয়ে নয়, ইসলামাবাদের উচিত নিজেদের নিরাপত্তা সমস্যা নিজেরাই সমাধান করা।

মাওলানা মুজাহিদ বলেন, “পাকিস্তানের ভেতরের নিরাপত্তা সমস্যার সঙ্গে আফগানিস্তানের কোনো সম্পর্ক নেই। তাদের নিজেদের সমস্যার সমাধান করা উচিত এবং সম্পর্ককে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করা উচিত নয়, কারণ এতে উভয় দেশ এবং পুরো অঞ্চল ক্ষতিগ্রস্ত হয়।”

সূত্র : আল আরাবিয়া ইংলিশ

spot_img
spot_img
spot_img

সর্বশেষ