দীর্ঘ এক মাসের কঠোর সিয়াম সাধনা, আত্মশুদ্ধি ও ত্যাগের পর রাজধানীসহ সারা দেশে বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা এবং ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে উদ্যাপিত হচ্ছে মুসলিম উম্মাহর সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদুল ফিতর। রহমত, বরকত ও নাজাতের মাস রমজানের বিদায়ের পর শাওয়াল মাসের এক ফালি নতুন চাঁদ মুসলমানদের জীবনে নিয়ে এসেছে অনাবিল প্রশান্তি, কৃতজ্ঞতা ও সাম্যের বার্তা। মহান রবের দরবারে অশেষ শুকরিয়া আদায় করে ধনী-গরিব নির্বিশেষে সব বয়সের মানুষ আজ দিনটিকে এক সার্বজনীন আনন্দোৎসব হিসেবে পালন করছেন।
ঈদুল ফিতর কেবল উৎসবের নাম নয়, এটি ইবাদত, সংযম, কৃতজ্ঞতা ও ক্ষমার এক মহিমান্বিত ঘোষণা। আরবি শব্দ ‘ঈদ’-এর অর্থ আনন্দ বা ফিরে আসা, আর ‘ফিতর’-এর অর্থ ভঙ্গ করা বা রোজার সমাপ্তি। অর্থাৎ, আল্লাহর নির্দেশে মাসব্যাপী রোজা পালনের পর তা সমাপ্তির যে আনন্দ, সেটিই ঈদুল ফিতরের মূল তাৎপর্য। এক মাসের রোজা, তারাবির নামাজ, তাহাজ্জুদ, কুরআন তিলাওয়াত এবং নানা ইবাদতের পর এই দিনটি বান্দার জন্য মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বিশেষ উপহার।
হাদিসে ঈদের এই আনন্দ ও মর্যাদার গভীর তাৎপর্য তুলে ধরা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, রোজাদারের জন্য রয়েছে দুটি আনন্দ, একটি ইফতারের সময়, অন্যটি তার রবের সঙ্গে সাক্ষাতের সময়। অন্য এক হাদিসে এসেছে, ঈদের দিন আল্লাহ তায়ালা ফেরেশতাদের উদ্দেশে বলেন, আমার বান্দারা তাদের দায়িত্ব পালন করেছে, তারা তাকবির উচ্চারণ করতে করতে আমার দরবারে এসেছে, আমি তাদের ক্ষমা করে দিলাম। পবিত্র কুরআনের সূরা বাকারার ১৮৫ নম্বর আয়াতেও আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা নির্দেশ দিয়েছেন, তোমরা রমজানের সংখ্যা পূর্ণ করো এবং আল্লাহর বড়ত্ব ঘোষণা করো, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞ হতে পারো। এই মর্মবাণী ধারণ করেই আজ চারদিকে ধ্বনিত হচ্ছে তাকবিরের সুর।
ইতিহাসের আলোকে দেখা যায়, প্রথম ঈদুল ফিতর পালিত হয় হিজরি দ্বিতীয় সনে, ৬২৪ খ্রিস্টাব্দে পবিত্র মদিনায়। রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করার পর দেখতে পান, সেখানকার মানুষ ‘নওরোজ’ ও ‘মেহেরজান’ নামে দুটি উৎসব পালন করে, যা ছিল জাহেলি যুগের সংস্কৃতির অংশ। তখন তিনি ঘোষণা করেন, আল্লাহ তোমাদের জন্য এর চেয়ে উত্তম দুটি দিন নির্ধারণ করে দিয়েছেন, একটি ঈদুল ফিতর, অন্যটি ঈদুল আজহা। এভাবেই মুসলমানদের জন্য সূচনা হয় এক স্বতন্ত্র, পবিত্র ও আধ্যাত্মিক উৎসবধারার।
ঈদ কেবল ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি সামাজিক সাম্য, সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ববোধেরও এক উজ্জ্বল প্রতীক। ঈদের দিন সকালে ধনী-গরিব, মালিক-শ্রমিক, ছোট-বড় সবাই এক কাতারে দাঁড়িয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নামাজ আদায় করেন। সালাত শেষে মুসাফাহা, কোলাকুলি ও শুভেচ্ছা বিনিময়ের মধ্য দিয়ে মুসলিম সমাজে গড়ে ওঠে ভালোবাসা, সৌহার্দ্য ও পারস্পরিক মমত্বের বন্ধন। বিদ্বেষ, বিভেদ ও অহংকার মুছে গিয়ে ঈদ মানুষের হৃদয়ে জাগিয়ে তোলে ভ্রাতৃত্বের নবীন অনুভব।
ঈদের এই সাম্যের চেতনাকে আরও দৃঢ় করে সাদাকাতুল ফিতর। ঈদের নামাজের আগেই তা আদায় করা ওয়াজিব। এর মাধ্যমে সমাজের বিত্তবানরা তাদের সম্পদের একটি অংশ দরিদ্রদের মাঝে বণ্টন করেন, যাতে সুবিধাবঞ্চিত মানুষও ঈদের আনন্দে শরিক হতে পারে। এই বিধান ঈদকে নিছক আনুষ্ঠানিক উৎসব নয়, বরং এক মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক ও সার্বজনীন আনন্দোৎসবে পরিণত করেছে।
বাংলার মাটিতেও ঈদুল ফিতরের রয়েছে দীর্ঘ ঐতিহাসিক শেকড়। ইতিহাসবিদদের মতে, এ অঞ্চলে আগত সুফি-দরবেশ ও মুসলিম বণিকদের মাধ্যমেই ঈদ উদ্যাপনের প্রচলন ক্রমে বিস্তৃত হয়। ১২০৪ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে মুসলিম শাসনের সূচনা হলেও, এরও আগে সীমিত পরিসরে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা ঈদ পালন করতেন। পরবর্তীতে মোগল আমলে ঈদ উদ্যাপন পায় আরও জাঁকজমকপূর্ণ ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। সে সময় সুবাদারদের নির্দেশে সৈন্যশিবিরে ঈদের তোপধ্বনি দেওয়া হতো, আর সুশোভিত হাতি-ঘোড়া নিয়ে ঈদগাহমুখী শোভাযাত্রাও বের হতো। ঢাকায় ১৬৪০ সালে নির্মিত ধানমন্ডি শাহী ঈদগাহ আজও সেই ঐতিহ্যের নীরব সাক্ষী হয়ে আছে। বর্তমানে জাতীয় ঈদগাহ ময়দান, বায়তুল মোকাররমসহ দেশের প্রতিটি শহর, বন্দর ও গ্রামে ঈদের আনন্দ একই আবেগে ছড়িয়ে পড়ে।
পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে ইনসাফ-এর পক্ষ থেকে সকল পাঠক, দর্শক, শুভাকাঙ্ক্ষী এবং সমগ্র মুসলিম উম্মাহকে জানানো হচ্ছে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও ঈদ মোবারক। ঈদের এই পবিত্র দিনে আসুন, আমরা সব ভেদাভেদ ভুলে একে অপরের প্রতি সহানুভূতিশীল হই, অসহায় ও দুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়াই এবং পরিবার, সমাজ ও দেশজুড়ে সম্প্রীতি, ভালোবাসা ও মানবিকতার বার্তা ছড়িয়ে দিই।
রমজানের আত্মশুদ্ধি, তাকওয়া ও সংযমের আলোয় আলোকিত হোক আমাদের প্রতিটি দিন। সত্য ও ন্যায়ের পথে অবিচল থাকুক আমাদের অঙ্গীকার।










