ত্যাগ, তাকওয়া ও আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের চেতনায় আজ বৃহস্পতিবার (২৮ মে) বাংলাদেশে উদযাপিত হচ্ছে মুসলমানদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদুল আজহা। ঈদের নামাজ, খুতবা, কোরবানি, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় এবং দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়ে সারাদেশে দিনটি পালন করছেন মুসলমানরা।
বাংলাদেশে ১৪৪৭ হিজরির জিলহজ মাসের চাঁদ দেখা যাওয়ার পর আজ ১০ জিলহজ পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপিত হচ্ছে। রাজধানীসহ দেশের শহর, মফস্বল ও গ্রামাঞ্চলে সকাল থেকেই ঈদের আবহ ছড়িয়ে পড়েছে। ঈদগাহ, মসজিদ ও খোলা মাঠে নামাজ আদায় শেষে মুসল্লিরা দেশ, জাতি ও মুসলিম উম্মাহর শান্তি, নিরাপত্তা ও কল্যাণ কামনায় দোয়া করেন।
ঈদুল আজহা মুসলমানদের কাছে শুধু উৎসবের দিন নয়; এটি মহান আল্লাহর প্রতি আনুগত্য, আত্মসমর্পণ ও ত্যাগের গভীর শিক্ষা বহন করে। ইসলামী ঐতিহ্য অনুযায়ী, হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম মহান আল্লাহর আদেশ পালনে প্রিয় পুত্র হজরত ইসমাঈল আলাইহিস সালামকে কোরবানি করতে প্রস্তুত হয়েছিলেন। পিতার আনুগত্যের সঙ্গে পুত্রও নিজেকে আল্লাহর পথে সমর্পণ করেন। মহান আল্লাহ তাঁদের এই আত্মসমর্পণ কবুল করেন এবং হজরত ইসমাঈল আলাইহিস সালামের পরিবর্তে কোরবানির জন্য পশুর ব্যবস্থা করেন।
হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম ও হজরত ইসমাঈল আলাইহিস সালামের সেই আনুগত্যের স্মৃতিই মুসলিম উম্মাহর কোরবানির ইবাদতে বিশেষভাবে প্রতিফলিত হয়। তাই কোরবানি শুধু পশু জবাইয়ের আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের প্রিয় বস্তু ত্যাগ করার মানসিকতা গড়ে তোলার ইবাদত।
কোরবানির মূল শিক্ষা তাকওয়া। কুরআনে কারীমে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, আল্লাহর কাছে কোরবানির পশুর গোশত বা রক্ত পৌঁছায় না; বরং পৌঁছায় বান্দার তাকওয়া। সূরা হজ্বের ৩৭ নম্বর আয়াতের এই শিক্ষা কোরবানির প্রকৃত তাৎপর্য স্পষ্ট করে। হানাফি মাজহাব অনুযায়ী সামর্থ্যবান মুসলমানের ওপর কোরবানি ওয়াজিব।
পবিত্র হজ্বের সঙ্গেও ঈদুল আজহার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। হিজরি বর্ষপঞ্জির ১০ জিলহজ এই ঈদ পালিত হয়। এর আগের দিন আরাফাতের ময়দানে অবস্থানের মধ্য দিয়ে হাজ্বীরা হজ্বের প্রধান আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন। সৌদি আরবে মঙ্গলবার (২৬ মে) আরাফাত দিবস এবং বুধবার (২৭ মে) ঈদুল আজহা পালিত হয়েছে। এরপর মিনায় অবস্থান করে হাজ্বীরা জামারাতে পাথর নিক্ষেপ, কোরবানি এবং হজ্বের অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করছেন।
বাংলাদেশে আজ সকাল থেকে রাজধানীসহ সারাদেশের ঈদগাহ, মসজিদ ও খোলা মাঠে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হচ্ছে। রাজধানীর হাইকোর্ট সংলগ্ন জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে সকাল সাড়ে ৭টায় প্রধান ঈদ জামাতের আয়োজন করা হয়। জাতীয় ঈদগাহে একসঙ্গে প্রায় ৩৫ হাজার মুসল্লির নামাজ আদায়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
জাতীয় ঈদগাহের প্রধান জামাতে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। মন্ত্রিসভার সদস্য, বিচারপতি, কূটনীতিক, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষও এতে অংশ নেবেন। বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে ঈদের পাঁচটি জামাতের আয়োজন করা হয়েছে।
রাজধানীর বাইরে দেশের জেলা, উপজেলা ও গ্রামাঞ্চলেও স্থানীয় ঈদগাহ, মসজিদ ও খোলা মাঠে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হচ্ছে। জামাতকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন এলাকায় নিরাপত্তা, অজু, পানি, চিকিৎসা ও মুসল্লিদের চলাচলের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ঈদের খুতবায় খতিবগণ কোরবানির শিক্ষা ধারণ করে আল্লাহভীতি, ন্যায়, মানবিকতা এবং অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান।
ঈদের নামাজ শেষে সামর্থ্যবান মুসলমানরা মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে পশু কোরবানি করছেন। ইসলামী বিধান অনুযায়ী কোরবানির গোশত আত্মীয়স্বজন, দরিদ্র-অসহায় মানুষ এবং নিজ পরিবারের মধ্যে বণ্টন করা হয়। এর মাধ্যমে সমাজে ভ্রাতৃত্ব, সহমর্মিতা, দরিদ্র মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ এবং সাম্যের শিক্ষা বাস্তব রূপ পায়।
এবার দেশে কোরবানিযোগ্য পশুর ঘাটতি নেই। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, এ বছর কোরবানির জন্য দেশে ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৪০টি পশু প্রস্তুত রয়েছে। সম্ভাব্য চাহিদা ধরা হয়েছে ১ কোটি ১ লাখ ৬ হাজার ৩৩৪টি। সে হিসাবে চাহিদার তুলনায় ২২ লাখ ২৭ হাজার ৫০৬টি পশু উদ্বৃত্ত থাকতে পারে। সারাদেশে প্রায় ৩ হাজার ৬০০ পশুর হাট বসানোর কথাও জানানো হয়েছে।
ঈদুল আজহা উপলক্ষে ২৫ মে থেকে ৩১ মে পর্যন্ত সাত দিনের সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। তবে হাসপাতাল, চিকিৎসাসেবা, ফায়ার সার্ভিস, বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস, ইন্টারনেটসহ জরুরি সেবা চালু থাকবে। ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে সড়ক, রেল ও নৌপথে যাত্রীসেবা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং জরুরি সহায়তার বিষয়ে আলাদা প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশবাসী এবং বিশ্ব মুসলিম উম্মাহকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর বাণীতে ঈদুল আজহাকে ত্যাগ, তাকওয়া, আত্মশুদ্ধি এবং মহান আল্লাহর প্রতি নিবেদনের গভীর বার্তাবাহী উৎসব হিসেবে উল্লেখ করেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় সংগঠনের নেতৃবৃন্দও পৃথক বাণীতে দেশবাসীকে ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।
এবারের ঈদ এমন সময়ে উদযাপিত হচ্ছে, যখন গাজ্জাসহ মুসলিম বিশ্বের বহু অঞ্চলে যুদ্ধ, দখলদারিত্ব, বাস্তুচ্যুতি ও মানবিক সংকট চলছে। তাই এবারের ঈদ মুসলমানদের কাছে আনন্দের পাশাপাশি দোয়া, সহমর্মিতা এবং মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের বার্তাও বহন করছে।
ঈদের আনন্দ যেন কেবল পরিবার ও আত্মীয়তার পরিসরে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং দরিদ্র, অসহায় ও বঞ্চিত মানুষের ঘরেও পৌঁছে যায়, সেই আহ্বানও উচ্চারিত হচ্ছে সারাদেশের ঈদ জামাত ও খুতবায়। কোরবানির শিক্ষা ধারণ করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন, মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং সমাজে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন দৃঢ় করাই এই ঈদের মূল বার্তা।











