spot_img

আবু সাঈদের সামনে মানুষ ছিল না, অমানুষগুলো গুলি করে মেরেছে: ট্রাইব্যুনাল

দুই হাত প্রসারিত করে আবু সাঈদ রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন, সামনে মানুষ রয়েছে, তারা তাকে আক্রমণ করবে না। কিন্তু তার সামনে মানুষ ছিল না, সেটি তিনি বুঝতে পারেননি বলে মন্তব্য করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী।

বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) চব্বিশের জুলাই আন্দোলনের সময় রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায় ঘোষণা করা হয়। রায় ঘোষণার শুরুতে বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী এ মন্তব্য করেন।

তিনি বলেন, চব্বিশের গণআন্দোলনের প্রথম শহীদ আবু সাঈদ। তিনি আশা করছিলেন, মানুষ তো আমার সামনে। মানুষ আমাকে আক্রমণ করবে না। তিনি দুই হাত প্রসারিত করে রাস্তায় দাঁড়িয়েছিলেন। কিন্তু তার সামনে তো মানুষ ছিল না, সেটি তিনি বুঝতে পারেননি। আসলে অমানুষগুলো খোলা রাস্তায় তাকে গুলি করে মেরেছে।

বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ সর্বসম্মতিক্রমে এ রায় ঘোষণা করেন। রায়ে দুই আসামিকে মৃত্যুদণ্ড, তিন আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং অন্য আসামিদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে।

ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য ছিলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। রায়টি বাংলাদেশ টেলিভিশনে (বিটিভি) সরাসরি সম্প্রচার করা হয়।

দুইজনের মৃত্যুদণ্ড

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই আসামি হলেন সাবেক এএসআই (সশস্ত্র) মো. আমির হোসেন এবং সাবেক কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়। তারা দুজনই গ্রেপ্তার রয়েছেন।

তিনজনের যাবজ্জীবন

যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক তিন আসামি হলেন সাবেক সহকারী পুলিশ কমিশনার আরিফুজ্জামান ওরফে জীবন, সাবেক পুলিশ পরিদর্শক (নিরস্ত্র) রবিউল ইসলাম ওরফে নয়ন এবং বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ক্যাম্প ইনচার্জ এসআই (নিরস্ত্র) বিভূতি ভূষণ রায় ওরফে মাধব।

পাঁচজনের ১০ বছরের কারাদণ্ড

রায়ে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. হাসিবুর রশিদ ওরফে বাচ্চু, রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক কমিশনার মনিরুজ্জামান ওরফে বেল্টু, বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক মশিউর রহমান, সহযোগী অধ্যাপক আসাদুজ্জামান মন্ডল ওরফে আসাদ এবং বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের তৎকালীন সভাপতি পোমেল বড়ুয়াকে ১০ বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

আটজনের ৫ বছরের কারাদণ্ড

পাঁচ বছরের কারাদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন সাবেক উপ-পুলিশ কমিশনার আবু মারুফ হোসেন ওরফে টিটু, সাবেক অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার শাহ নূর আলম পাটোয়ারী ওরফে সুমন, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী রেজিস্ট্রার রাফিউল হাসান রাসেল, বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এমরান চৌধুরী ওরফে আকাশ ওরফে দিশা এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাসুদুল হাসান ওরফে মাসুদ।

এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর মাহাবুবার রহমান ওরফে বাবু, স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ রংপুরের সভাপতি ডা. সারোয়ার হোসেন ওরফে চন্দন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রক্টর শরীফুল ইসলামকে পাঁচ বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

১১ জনের তিন বছরের কারাদণ্ড

তিন বছরের কারাদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন সহকারী রেজিস্ট্রার হাফিজুর রহমান ওরফে তুফান, সেকশন অফিসার মনিরুজ্জামান পলাশ, বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মাহাফুজুর রহমান শামীম, সহসভাপতি ফজলে রাব্বী ওরফে গ্লোরিয়াস ফজলে রাব্বী এবং সহসভাপতি আখতার হোসেন।

এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সেজান আহম্মেদ ওরফে আরিফ, সাংগঠনিক সম্পাদক ধনঞ্জয় কুমার ওরফে টগর, দপ্তর সম্পাদক বাবুল হোসেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের এমএলএসএস মোহাম্মদ নুরুন্নবী মন্ডল, নিরাপত্তাকর্মী নূর আলম মিয়া এবং এমএলএসএস একেএম আমির হোসেন ওরফে আমুকে তিন বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অফিসের চুক্তিভিত্তিক কর্মচারী আনোয়ার পারভেজ ওরফে আপেলের হাজতবাসের সময়কেই কারাদণ্ড হিসেবে গণ্য করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

রায় ঘোষণার সময় প্রসিকিউশনের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম, প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম, প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামীমসহ অন্য প্রসিকিউটররা।

আসামি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন প্রক্টর শরিফুল ইসলামের পক্ষে ছিলেন অ্যাডভোকেট আমিনুল গণি টিটো। এএসআই আমির হোসেন, কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায় এবং আনোয়ার পারভেজ ওরফে আপেলের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু। পলাতক আসামিদের পক্ষে ছিলেন রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী সুজাদ মিয়া।

২০২৪ সালের ১৬ জুলাই দুপুরে কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে পার্ক মোড়ে পুলিশের গুলিতে নিহত হন ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী ও আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আবু সাঈদ।

দুই হাত প্রসারিত করে পুলিশের সামনে বুক পেতে দাঁড়ানো আবু সাঈদের ভিডিও দেশজুড়ে তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি করে। পরে তার হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য হাসিবুর রশীদসহ ৩০ আসামির বিরুদ্ধে গত বছরের ৩০ জুন আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। বিচারিক প্রক্রিয়ায় মামলার তদন্ত কর্মকর্তাসহ মোট ২৫ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়।

spot_img
spot_img
spot_img

সর্বশেষ