সিরীয় জনগণের ওপর দীর্ঘ হত্যাযজ্ঞ, নির্যাতন ও নির্মম দমন-পীড়নের হোতা গণহত্যাকারী বাশার আল আসাদকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন সিরিয়ার একটি আদালত। হত্যা, নির্যাতন, নির্বিচার আটক ও মানবতাবিরোধী অপরাধে তাকে দোষী সাব্যস্ত করে এ রায় দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) রাজধানী দামেস্কের চতুর্থ ফৌজদারি আদালত বাশার আল আসাদের অনুপস্থিতিতে এ রায় ঘোষণা করেন। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সিরীয় বিপ্লবীদের অভিযানে আসাদ রেজিমের পতনের পর দেশটির কোনো আদালতে তার বিরুদ্ধে এটিই প্রথম দণ্ডাদেশ। বর্তমানে তিনি রাশিয়ায় আশ্রয়ে রয়েছেন।
পূর্বপরিকল্পিত ও ইচ্ছাকৃত হত্যা, শিশু হত্যা, নির্যাতন, নির্বিচার আটক এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে বাশার আল আসাদকে দোষী সাব্যস্ত করেন আদালত। বিচারক ফখরুদ্দিন আল-আরিয়ান বলেন, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী হিসেবে আসাদ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনে ব্যবহার করেছিলেন।
একই মামলায় বাশারের ভাই এবং আসাদ বাহিনীর কুখ্যাত চতুর্থ সাঁজোয়া ডিভিশনের সাবেক কমান্ডার মাহের আল আসাদকেও অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। মৃত্যুদণ্ড পেয়েছেন দারার সাবেক রাজনৈতিক নিরাপত্তা প্রধান ও আসাদ পরিবারের আত্মীয় আতেফ নাজিবও। নাজিবকে ২০২৫ সালে গ্রেপ্তার করা হয় এবং তিনি সশরীরে আদালতে উপস্থিত ছিলেন।
২০১১ সালে সিরিয়ার দক্ষিণাঞ্চলীয় দারা শহরে সরকারবিরোধী স্লোগান দেয়ালে লেখার অভিযোগে একদল কিশোর শিক্ষার্থীকে আটক করে আসাদ রেজিমের নিরাপত্তা বাহিনী। আটক অবস্থায় তাদের ওপর ভয়াবহ নির্যাতন চালানো হয়। সে সময় দারার রাজনৈতিক নিরাপত্তা শাখার প্রধান ছিলেন আতেফ নাজিব। শিশুদের ওপর এই নির্যাতনের ঘটনায় সিরীয় জনগণের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
তাদের মুক্তি ও রাজনৈতিক সংস্কারের দাবিতে সিরীয়রা রাস্তায় নামলে প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগ করে আন্দোলন দমনের চেষ্টা চালায় আসাদ রেজিম। দারা থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ দ্রুত দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। আন্দোলন দমনে আসাদ বাহিনীর রক্তক্ষয়ী অভিযান শেষ পর্যন্ত সিরিয়াকে প্রায় ১৪ বছরের দীর্ঘ যুদ্ধে ঠেলে দেয়। এ সংঘাতে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটে।
নিজের শাসন টিকিয়ে রাখতে সিরিয়ার সামরিক বাহিনীর পূর্ণ শক্তি বিরোধীদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেন বাশার আল আসাদ। জাতিসংঘ ও রাসায়নিক অস্ত্র নিষিদ্ধকরণ সংস্থা ওপিসিডব্লিউর তদন্তে আসাদ সরকারের বাহিনীর সারিন ও ক্লোরিন গ্যাস ব্যবহারের প্রমাণও উঠে এসেছে। যুদ্ধের সময় সিরিয়ার বিভিন্ন শহর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। বিপুলসংখ্যক মানুষ বাস্তুচ্যুত হন অথবা দেশ ছাড়তে বাধ্য হন।
রেজিমের পতনের পর সিরিয়ার কুখ্যাত কারাগারগুলো থেকে মুক্তি পাওয়া বন্দিরা ভয়াবহ নির্যাতনের বিবরণ দেন। বিভিন্ন গণকবর থেকেও আসাদ আমলের নৃশংসতার আলামত সামনে আসে। একজন আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ প্রসিকিউটর এসব প্রমাণকে রাষ্ট্র পরিচালিত একটি সংগঠিত হত্যাযন্ত্রের আলামত হিসেবে বর্ণনা করেন।
২০২৫ সালে রয়টার্সের এক অনুসন্ধানেও উঠে আসে, আসাদ সরকার নিজেদের নৃশংসতার প্রমাণ গোপন করতে দামেস্কের পূর্বাঞ্চলের মরুভূমিতে গোপনে হাজার হাজার মরদেহ স্থানান্তর করেছিল।
তবে নিজের বাহিনীর বিরুদ্ধে ওঠা যুদ্ধাপরাধ ও নৃশংসতার অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে আসছিলেন বাশার আল আসাদ। রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়ে আন্তর্জাতিক তদন্তের ফলাফলও তিনি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।
সিরিয়ার দীর্ঘ যুদ্ধে আসাদ রেজিমকে টিকিয়ে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে রাশিয়া ও ইরান। ২০১২ সাল থেকে ইরান সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো আসাদের পক্ষে যুদ্ধে অংশ নিতে শুরু করে। ২০১৫ সালে রাশিয়া সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ করলে আসাদ বাহিনী বিভিন্ন এলাকার নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়।
তবে ২০২৪ সালের শেষ দিকে সিরীয় বিপ্লবীদের দ্রুত অভিযানের মুখে আসাদ বাহিনী ভেঙে পড়ে। দুই সপ্তাহেরও কম সময়ের অভিযানে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ শহরের নিয়ন্ত্রণ হারায় তারা। একপর্যায়ে বিপ্লবীরা রাজধানী দামেস্কে প্রবেশ করেন।
রাজধানীর পতনের মুখে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান বাশার আল আসাদ। পরে তিনি রাশিয়ায় আশ্রয় নেন। এর মধ্য দিয়ে তার প্রায় ২৪ বছরের শাসন এবং সিরিয়ায় আসাদ পরিবারের পাঁচ দশকেরও বেশি সময়ের কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান ঘটে।
গণহত্যাকারী বাশার আল আসাদের মৃত্যুদণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর দামেস্কের আদালতের বাইরে বহু সিরীয় জড়ো হয়ে উল্লাস করেন। তারা পতাকা উড়িয়ে ও স্লোগান দিয়ে রায়কে স্বাগত জানান।
২০১১ সালের বিপ্লবের সূতিকাগার দারাতেও মানুষ রাস্তায় নেমে আনন্দ প্রকাশ করেন। অনেকে আসাদ রেজিমের হাতে নিহত ও আটক স্বজনদের ছবি বহন করেন।
তবে বাশার আল আসাদ বর্তমানে রাশিয়ায় থাকায় মৃত্যুদণ্ডটি এখনই কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা নেই। সিরিয়ার নতুন কর্তৃপক্ষ রাশিয়ার কাছে বাশার ও মাহের আল আসাদকে হস্তান্তরের দাবি জানিয়েছে।
সূত্র : রয়টার্স, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) ও সিরিয়ান আরব নিউজ এজেন্সি (সানা)










