আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) বিচারকরা গত বছর তালেবানের জ্যেষ্ঠ দুই সদস্যের বিরুদ্ধে গোপনে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিলেন। লিঙ্গ ও রাজনৈতিক ভিত্তিতে নিপীড়নের মাধ্যমে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে এসব পরোয়ানা জারি করা হয়।
মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে মিডল ইস্ট আই।
সিলগালা করা নথি এবং বিষয়টি সম্পর্কে অবগত সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে তিন বিচারকের একটি প্যানেল গোপনীয়ভাবে পরোয়ানা দুটি জারি করেন।
এর দুই মাস আগে একই বিচারক প্যানেল একই অপরাধের অভিযোগে তালেবানের সর্বোচ্চ নেতা মাওলানা হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা এবং আফগানিস্তানের প্রধান বিচারপতি আবদুল হাকিম হক্কানির বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিলেন।
গোপন পরোয়ানা দুটিতে নতুন প্রমাণ এবং নতুন কয়েকজন কথিত ভুক্তভোগীর বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যাদের আগের প্রকাশ্য দুটি আবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
আইসিসি তালেবানের ওই চার সদস্যের বিরুদ্ধে ২০২১ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত আফগানিস্তানের কার্যত সরকার হিসেবে ক্ষমতায় থাকার সময়ে সংঘটিত কথিত অপরাধের অভিযোগ এনেছে।
বিচারিক কার্যক্রমের গোপনীয়তা রক্ষায় গোপন পরোয়ানায় থাকা ওই দুই তালেবান সদস্যের পরিচয় প্রকাশ করছে না মিডল ইস্ট আই।
তালেবান সদস্যদের বিরুদ্ধে এসব পরোয়ানা আন্তর্জাতিক আইনে একটি ঐতিহাসিক নজির স্থাপন করেছে। এর মধ্য দিয়ে প্রথমবারের মতো আইসিসি কিংবা অন্য কোনো আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল এলজিবিটিকিউ ভুক্তভোগীদের স্বীকৃতি দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক আইনে লিঙ্গভিত্তিক নিপীড়নের অভিযোগও অত্যন্ত বিরল। এ অভিযোগে এখন পর্যন্ত কখনো কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়নি। আইসিসি এ অভিযোগে মাত্র একবার, আল হাসান মামলায়, বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। তবে সেটিও কোনো দণ্ডাদেশে গড়ায়নি।
নিষেধাজ্ঞার হুমকি
তালেবান সদস্যদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানার আবেদনগুলো ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিষেকের অল্প সময় পর দাখিল করা হয়।
চারটি আবেদনই প্রস্তুত করা হয়েছিল সাবেক প্রসিকিউটর করিম খান এবং আইসিসির ডেপুটি প্রসিকিউটর নাজহাত শামীম খানের নেতৃত্বে। নাজহাত শামীম খান আফগানিস্তান তদন্তের তত্ত্বাবধান করেন। দলটিকে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন বিশেষ উপদেষ্টা লিসা ডেভিস, যিনি লিঙ্গভিত্তিক অপরাধ বিষয়ে প্রসিকিউটরের দপ্তরের নীতিমালা প্রণয়ন করেছিলেন।
অতিরিক্ত ওই দুটি পরোয়ানার আবেদন মাওলানা আখুন্দজাদা ও হক্কানির আবেদনের একই দিনে দাখিল করা হয়েছিল কি না, তা স্পষ্ট নয়। ২৩ জানুয়ারি প্রকাশ্য ঘোষণায় তৎকালীন প্রসিকিউটর করিম খান বলেছিলেন, আরও আবেদন শিগগিরই দাখিল করা হবে। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত সূত্রগুলো এমইইকে জানিয়েছে, ওই দিন গোপন দুটি আবেদন দাখিলের জন্য প্রায় প্রস্তুত ছিল।
এমইই জানতে পেরেছে, আদালতের কর্মকর্তারা অতিরিক্ত ওই দুটি আবেদন প্রকাশ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কারণ তারা জানতেন, আমেরিকা এসব আবেদনের বিরোধী এবং এর ফলে আইসিসির বিরুদ্ধে আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা আসতে পারে বলে তারা আশঙ্কা করেছিলেন।
আখুন্দজাদা ও হক্কানির বিরুদ্ধে আবেদন প্রকাশের এক মাস পরই আমেরিকা সত্যিই আইসিসির কর্মকর্তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। প্রথমে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হয় করিম খানকে।
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত সূত্রগুলো জানিয়েছে, কর্মীদের অনেকে নিজেদের ওপর সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং এর ফলে আমেরিকায় থাকা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার সক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়ার আশঙ্কায় ছিলেন। এমনকি কেউ কেউ আবেদনপত্রে নিজেদের নাম রাখতেও অনিচ্ছুক ছিলেন।
এপ্রিল থেকে বিচারকরা প্রসিকিউটরের দপ্তরকে নতুন কোনো গ্রেপ্তারি পরোয়ানার আবেদন প্রকাশ না করার নির্দেশ দিয়েছেন।
গ্রেপ্তারি পরোয়ানার আবেদনগুলোর অবস্থা জানতে এমইই একাধিকবার যোগাযোগ করলেও প্রসিকিউটরের দপ্তর কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। নতুন আবেদনগুলো গোপন রাখার বাধ্যবাধকতা আরোপ করে আদালতের সংশোধিত বিধিমালার কথা উল্লেখ করেছে দপ্তরটি।
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে আফগানিস্তান ও ফিলিস্তিন তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আদালতের কর্মকর্তাদের ওপর প্রতিশোধমূলক আর্থিক ও ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে আমেরিকা। আমেরিকার নাগরিক বা মিত্রদের বিচারের আওতায় আনার প্রচেষ্টাকে এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে ওয়াশিংটন।
প্রথম লক্ষ্যবস্তু ছিলেন সাবেক প্রসিকিউটর করিম খান। ১৮ মাসের অসদাচরণসংক্রান্ত তদন্তের পর গত মাসে সদস্য রাষ্ট্রগুলো বিতর্কিতভাবে তাকে পদ থেকে সরিয়ে দেয়।
এ ছাড়া আট বিচারকের ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। তাদের মধ্যে কিম্বারলি প্রোস্ট, সোলোমি বোসা এবং লুজ ইবানেজ ২০২০ সালের সেই আপিল চেম্বারের সদস্য ছিলেন, যে চেম্বার আফগানিস্তান তদন্তের অনুমোদন দিয়েছিল।
২০২১ সালে তৎকালীন প্রসিকিউটর করিম খান আফগানিস্তান তদন্তে আমেরিকার সামরিক বাহিনী ও সিআইএ সদস্যদের পাশাপাশি সাবেক আফগান সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগসংক্রান্ত অংশকে কম অগ্রাধিকার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। এর পরিবর্তে তদন্তে তালেবান এবং ইসলামিক স্টেট-খোরাসান প্রদেশের (আইএস-কে) ওপর গুরুত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তা সত্ত্বেও এসব নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।
এমইই জানতে পেরেছে, প্রসিকিউটরের দপ্তর আমেরিকান নাগরিকদের বিরুদ্ধে তদন্ত না করলেও জো বাইডেন প্রশাসনসহ ধারাবাহিক আমেরিকান সরকারগুলো ব্যবহারিক কারণে তালেবানকে আইসিসির বিচারের আওতায় আনার বিরোধিতা করেছে।
এর প্রধান কারণ হলো, তালেবান বর্তমানে আফগানিস্তানের কার্যত সরকার হিসেবে ক্ষমতায় রয়েছে। ফলে তাদের সদস্যদের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ বজায় রাখা প্রয়োজন। তালেবান সরকারের পতন হলে ইসলামিক স্টেটের মতো আরও চরমপন্থী গোষ্ঠী তাদের স্থলাভিষিক্ত হতে পারে, এমন সম্ভাবনা নিয়েও উদ্বিগ্ন আমেরিকা।
আলাদা তদন্ত করতে চান বিচারকরা
আইসিসিতে আফগানিস্তান পরিস্থিতি নিয়ে তদন্তের সূত্রপাত ২০১৭ সালের নভেম্বরে। তখন তৎকালীন প্রসিকিউটর ফাতু বেনসুদা ২০০৩ সাল থেকে সংঘটিত কথিত অপরাধ তদন্তের অনুমতি চেয়ে প্রথম আবেদন করেন। এর মধ্যে আফগান ও আমেরিকান বাহিনীর পাশাপাশি তালেবান এবং আইএস-কে গোষ্ঠীর সংঘটিত কথিত অপরাধও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
২০১৯ সালে একটি প্রি-ট্রায়াল চেম্বার প্রথমে ওই আবেদন প্রত্যাখ্যান করে। পরে ২০২০ সালের মার্চে আপিল চেম্বার সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করে তদন্ত এগিয়ে নেওয়ার অনুমতি দেয়। এর কয়েক মাস পর আমেরিকান নাগরিকদের আদালতের এখতিয়ারের আওতায় আনার কথিত প্রচেষ্টার অভিযোগে আমেরিকা সরকার বেনসুদার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।
ওই বছরের শেষদিকে তৎকালীন আফগান সরকারের তদন্ত স্থগিত রাখার আবেদনের পর তদন্তটি স্থগিত হয়ে যায়। পরে ২০২২ সালের শেষদিকে তদন্ত আবার শুরু হয়। ২০২৩ সালের এপ্রিলে আপিলেও এ সিদ্ধান্ত বহাল থাকে।
২০২৪ সালের নভেম্বরে ছয় দেশ, চিলি, কোস্টারিকা, স্পেন, ফ্রান্স, লুক্সেমবার্গ ও মেক্সিকো, যৌথভাবে ২০২১ সালের আগস্টে তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর থেকে নারী ও মেয়েদের বিরুদ্ধে সংঘটিত কথিত অপরাধের বিষয়টি আইসিসির কাছে পাঠায়। একই সঙ্গে তারা প্রসিকিউটরদের এসব অভিযোগ বিদ্যমান আফগানিস্তান তদন্তের সঙ্গে যুক্ত করার অনুরোধ জানায়।
এর কয়েক সপ্তাহ পর, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে, করিম খান গ্রেপ্তারি পরোয়ানার জন্য আবেদন করেন। তিনি যুক্তি দেন, লিঙ্গভিত্তিক নিপীড়নের অভিযোগগুলো ইতোমধ্যেই ২০২০ সালে অনুমোদিত তদন্তের আওতার মধ্যে পড়ে।
গত সপ্তাহে এমইই প্রকাশ করে, আইসিসির বিচারকরা প্রসিকিউটরের দপ্তরকে তালেবানের বিরুদ্ধে লিঙ্গভিত্তিক নিপীড়নের অভিযোগ নিয়ে স্বতন্ত্র একটি তদন্ত শুরু করতে বলেছেন। অর্থাৎ, আমেরিকান নাগরিকদেরও অন্তর্ভুক্ত করা মূল আফগানিস্তান যুদ্ধাপরাধ তদন্ত থেকে এই তদন্তকে আলাদা করতে বলা হয়েছে।
প্রসিকিউটররা এ পথে এগোলে প্রশ্ন উঠতে পারে, আদালত কি ওয়াশিংটনের সঙ্গে উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা করছে এবং এর মাধ্যমে ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, আমেরিকান বাহিনী ও তাদের মিত্রদের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো আর অনুসরণ করা হবে না।
নতুন প্রসিকিউটর নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত করিম খানের দুই ডেপুটি প্রসিকিউটরের দপ্তরের দায়িত্বে রয়েছেন। তাদের দুজনই বর্তমানে আমেরিকার নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছেন।
সূত্র: মিডল ইস্ট আই










