spot_img
spot_imgspot_img

ভারতে গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো ১৫০ বছরের পুরোনো মসজিদ

ভারতের উত্তর প্রদেশের সাহারানপুরে প্রায় ১৫০ বছরের পুরোনো একটি মসজিদ ভোরে বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) বিপুলসংখ্যক পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করে কালেক্টরেট চত্বরে থাকা মসজিদটি ভেঙে দেয় যোগী আদিত্যনাথের বিজেপি সরকারের অধীন জেলা প্রশাসন।

হিন্দুত্ববাদী বিজেপি শাসিত উত্তর প্রদেশে মুসলিমদের ধর্মীয় স্থাপনা ঘিরে একের পর এক বিতর্কের মধ্যেই এ ঘটনা ঘটল। সাহারানপুরের এই মসজিদকে ঘিরে প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার সূত্রপাতও হয় হিন্দুত্ববাদী সংগঠন বজরং দলের সাবেক প্রাদেশিক সমন্বয়ক বিকাশ ত্যাগীর অভিযোগের পর।

মসজিদটির মোতাওয়াল্লি তানভীর আহমেদ জানিয়েছেন, মসজিদটি প্রায় ১৫০ বছরের পুরোনো। সেখানে এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে নিয়মিত নামাজ আদায় হয়ে আসছিল।

এআইএমআইএম প্রধান ও হায়দরাবাদের এমপি আসাদুদ্দিন ওয়াইসি জানিয়েছেন, মসজিদ কমিটি এর দীর্ঘদিনের অস্তিত্ব প্রমাণে ১৯১১ সাল পর্যন্ত পুরোনো নথি উপস্থাপন করেছে।

জেলা আদালতে মসজিদ পরিচালনা কমিটির আপিল খারিজ হওয়ার পরও উচ্চ আদালতে যাওয়ার সুযোগ ছিল। কিন্তু তার আগেই ভোরে ব্যাপক পুলিশি নিরাপত্তার মধ্যে মসজিদটি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। প্রশাসনের এই তড়িঘড়ি পদক্ষেপ নিয়ে বিরোধী নেতারা প্রশ্ন তুলেছেন।

ঘটনার পর মুসলমানদের ধর্মীয় স্বাধীনতা, সাংবিধানিক অধিকার এবং উত্তর প্রদেশে বিজেপির হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি নিয়ে নতুন করে সমালোচনা শুরু হয়েছে।

মসজিদ ভাঙার আগে কিরানার সমাজবাদী পার্টির লোকসভা সদস্য ইকরা হাসানকে তার বাড়িতে আটকে রাখা হয় বলে তিনি জানিয়েছেন।

ইকরা হাসান বলেন, শুক্রবার রাত থেকেই তার বাড়ির বাইরে বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয় এবং তাকে সাহারানপুরে যেতে দেওয়া হয়নি। কালেক্টরেটের মসজিদের বিষয়ে কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলতে এবং সাধারণ মানুষের উদ্বেগ তুলে ধরতে তিনি সেখানে যেতে চেয়েছিলেন।

বহুজন সমাজ পার্টির প্রধান ও উত্তর প্রদেশের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মায়াবতীও যোগী সরকারের অধীনে মসজিদ ভাঙার ঘটনাগুলোর সমালোচনা করেছেন।

তিনি বলেন, রাজ্যজুড়ে মসজিদকে অবৈধ ঘোষণা করে তড়িঘড়ি ভেঙে ফেলার যে কার্যক্রম চলছে, তা সঠিক নয়। একটি সাংবিধানিক ও ধর্মনিরপেক্ষ সরকারের দায়িত্ব সব ধর্মের অনুসারী ও তাদের ধর্মীয় স্থানকে সমানভাবে সম্মান করা এবং সেগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

আসাদুদ্দিন ওয়াইসি মুসলমানদের ধর্মীয় স্বাধীনতার সাংবিধানিক নিশ্চয়তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।

তিনি বলেন, “ধর্মীয় স্বাধীনতার সাংবিধানিক নিশ্চয়তা কি মুসলমানদের জন্য আর প্রযোজ্য নয়? কেন আমাদের উপাসনালয়গুলো বারবার দুর্বল অজুহাতে বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে?”

ওয়াইসি বলেন, মসজিদটিতে এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে প্রকাশ্যে ও নিয়মিতভাবে নামাজ আদায় হয়ে আসছিল। তার মতে, দীর্ঘদিনের ব্যবহার, ওয়াকফ মর্যাদা এবং দখলসংক্রান্ত আইনি বিষয়গুলোও যথাযথভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন ছিল।

তিনি আরও বলেন, কারও কাছে মসজিদ দেখাটাই অস্বস্তির কারণ হলে সেটি তাদের সমস্যা; সেই কারণে মুসলমানদের মসজিদ বুলডোজার দিয়ে ভেঙে দেওয়া যায় না। মুসলমানদের ধর্মীয় স্বাধীনতা কারও দয়ার ওপর নির্ভরশীল নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ভীম আর্মির প্রধান ও নাগিনা থেকে নির্বাচিত এমপি চন্দ্র শেখর আজাদও মসজিদ ভাঙার দ্রুততা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

জেলা আদালতের সিদ্ধান্ত উচ্চ আদালতে চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ থাকা অবস্থায় ভোরে মসজিদ ভাঙার তাড়াহুড়ো কেন করা হলো, সেই প্রশ্ন তুলে তিনি এ ঘটনাকে বিজেপি সরকারের “সাম্প্রদায়িক রাজনীতি ও সমর্থকদের তুষ্ট করার আরেকটি উদাহরণ” হিসেবে বর্ণনা করেন।

সাহারানপুরের কংগ্রেস এমপি ইমরান মাসুদ দিনটিকে সাহারানপুরবাসীর জন্য ‘কালো দিন’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

তিনি জানিয়েছেন, মসজিদ ভাঙার সময় চারপাশ ঘিরে ফেলা হয় এবং স্থানীয় মানুষকে ঘর থেকে বের হতে দেওয়া হয়নি।

ইমরান মাসুদ বলেন, এটি শুধু একটি মসজিদ ভাঙার ঘটনা নয়, বরং সংবিধানের ওপর আঘাত। আদালত ও সাংবিধানিক পন্থায় এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার কথাও জানান তিনি।

তিনি আরও বলেন, মামলার প্রক্রিয়ায় ওয়াকফ বা ওয়াকফ বোর্ডকে পক্ষ করা হয়নি এবং দীর্ঘদিনের দখল ও ব্যবহারের আইনি বিষয়গুলোও যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।

অন্যদিকে যোগী সরকারের অধীন প্রশাসনের ভাষ্য, মসজিদটি ৩১৫ বর্গমিটার সরকারি জমিতে অননুমোদিতভাবে ছিল। গত জুলাইয়ে সাহারানপুরের সিটি ম্যাজিস্ট্রেট জায়গাটি খালি করার নির্দেশ দেন এবং অননুমোদিত দখলের অভিযোগে প্রায় ৬ কোটি ৪১ লাখ রুপি জরিমানা ধার্য করেন।

মসজিদ পরিচালনা কমিটি ওই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে জেলা আদালতে আপিল করে। আপিল খারিজ হওয়ার পর শনিবার ভোরে মসজিদটি ভেঙে ফেলা হয়।

অভিযানের সময় কালেক্টরেটের প্রবেশপথগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। স্থানীয় পুলিশের পাশাপাশি প্রাদেশিক সশস্ত্র কনস্ট্যাবুলারি ও র‌্যাপিড অ্যাকশন ফোর্সের বিপুলসংখ্যক সদস্য মোতায়েন করা হয়।

মসজিদটিকে ঘিরে সরকারি পদক্ষেপের শুরু হয়েছিল বজরং দলের সাবেক প্রাদেশিক সমন্বয়ক বিকাশ ত্যাগীর অভিযোগের পর। তার অভিযোগের ভিত্তিতে রাজস্ব বিভাগ তদন্ত শুরু করে। পরে মসজিদের ব্যবস্থাপক ও ইমাম আবদুল হামিদের বিরুদ্ধে সরকারি জমি অননুমোদিতভাবে দখলের অভিযোগ আনা হয়।

মসজিদপক্ষ জানিয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে সেখানে মসজিদ ও ধর্মীয় কার্যক্রমের অস্তিত্ব ছিল এবং উচ্চ আদালতে যাওয়ার সুযোগ নেওয়ার আগেই মসজিদটি ভেঙে দেওয়া হয়েছে। তারা বিষয়টি উচ্চ আদালতে চ্যালেঞ্জ করার কথা জানিয়েছে।

সূত্র : মাকতুব মিডিয়া

spot_img
spot_img
spot_img

সর্বশেষ