কওমি মাদরাসাকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন কিংবা সরাসরি উগ্রবাদের সঙ্গে যুক্ত করার প্রচলিত প্রবণতা অনেকটাই সরলীকৃত ও পূর্বধারণানির্ভর বলে মন্তব্য করেছেন সমাজ নৃবিজ্ঞানী ড. নুরুল মোমেন ভূঁইয়া। তিনি বলেন, মাঠপর্যায়ের গবেষণা থেকে দেখা যায়, কওমি মাদরাসা শুধুই পাঠ্যভিত্তিক ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নয়; বরং দীর্ঘকালীন শিক্ষা, নিয়মানুবর্তিতা ও সামাজিকীকরণের মধ্য দিয়ে এটি শিক্ষার্থীদের জীবনাচরণ, মূল্যবোধ ও বিশ্বাস বিনির্মাণের একটি স্বতন্ত্র ব্যবস্থা।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর পুরান ঢাকার শেখ বোরহানুদ্দীন পোস্টগ্র্যাজুয়েট কলেজে আয়োজিত এক বিশেষ সেমিনারে এসব কথা বলেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নুরুল মোমেন ভূঁইয়া। কলেজের নৃবিজ্ঞান বিভাগের ধারাবাহিক একাডেমিক আয়োজন ‘কানেক্টিং অ্যানথ্রোপলজি’র তৃতীয় পর্বে ‘ধর্মীয় সামাজিকীকরণে সময়, স্থান ও প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা: একটি এথনোগ্রাফিক গবেষণা’ শীর্ষক এই সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়।
সিলেটের বিশ্বনাথের একটি কওমি মাদরাসায় টানা ১৫ মাস অবস্থান ও দীর্ঘ তিন বছরের নিবিড় গবেষণার তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, ৯/১১ কিংবা লন্ডনে হামলার মতো বৈশ্বিক ঘটনার পর বিশ্বব্যাপী মাদরাসাগুলো নিয়ে সন্দেহ ও অহেতুক আগ্রহ বেড়েছে। তবে দরিদ্র পরিবারের সন্তানরা মাদরাসায় ভর্তি হয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কোনো নির্দিষ্ট মতাদর্শে দীক্ষিত হয়ে উগ্রবাদী হয়ে ওঠে, এমন দাবির কোনো বাস্তব ভিত্তি তাঁর মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতায় মেলেনি। বরং শিক্ষার্থীদের মনস্তত্ত্ব ও বেড়ে ওঠার প্রক্রিয়া বুঝতে হলে তাঁদের পারিবারিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতাকে সামগ্রিকভাবে অনুধাবন করতে হবে।
ড. নুরুল মোমেন আরও উল্লেখ করেন, কওমি ধারায় ‘আদব’, ‘ইমান’ ও ‘আমল’ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এখানে আদব কেবল কোনো তাত্ত্বিক পাঠ নয়; কথা বলার ভঙ্গি, শরীরী ভাষা এবং দৈনন্দিন আচরণের নিয়মতান্ত্রিক অনুশীলনের মাধ্যমেই শিক্ষার্থীদের স্বতন্ত্র সামাজিক পরিচয় রূপ নেয়। একই সঙ্গে স্থানীয় অর্থনীতি, সামাজিক সহযোগিতা ও পারিপার্শ্বিক বাস্তবতার সঙ্গে নিবিড় মিথস্ক্রিয়া বজায় রেখেই এসব প্রতিষ্ঠান সমাজে নিজেদের প্রাসঙ্গিকতা ধরে রেখেছে।
সেমিনারে অন্যান্য আলোচকরা সাধারণ ও ধর্মীয় শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যকার দূরত্বের কারণে সৃষ্ট ভুল বোঝাবুঝি অবসানের ওপর জোর দেন। কলেজের অধ্যক্ষ ড. কাজী জুলফিকার আলী বলেন, ধর্মীয় ধারার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মূলধারার সমাজের ঐতিহাসিক যে দূরত্ব রয়েছে, তা কমাতে প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ প্রয়োজন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সৈয়দ আরমান হোসেন বলেন, কওমি শিক্ষার্থীরা বর্তমানে অর্থনীতি ও সমাজের বিভিন্ন পরিসরে যুক্ত হচ্ছেন। তাই সোশ্যাল মিডিয়ার প্রোপাগান্ডা এড়িয়ে এদের সামাজিক প্রভাব ও ভূমিকা নিয়ে স্থানীয় গবেষকদের আরও গভীর গবেষণায় এগিয়ে আসা দরকার।
কলেজের নৃবিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান মো. মাহ্ফুজ সরকারের সঞ্চালনায় সেমিনারে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক ও শিক্ষার্থীবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।











