spot_img
spot_img

গাজ্জায় ইসরাইলি হামলায় বাবা-মা ও দুই শিশুকন্যাসহ একই পরিবারের সবাই শহীদ

বুধবার সন্ধ্যা ৭টা। উত্তর গাজ্জার বাইত লাহিয়ার মাশরু এলাকায় তখন সতর্কতামূলক এক ধরনের শান্ত পরিবেশ বিরাজ করছিল। দীর্ঘ কয়েক রাত ধরে বাড়ি থেকে দূরে থাকা মুমিন আহমদ এই সুযোগটিকেই বেছে নিয়েছিলেন পরিবারের পুরোনো বাড়িতে যাওয়ার জন্য। সঙ্গে ছিলেন তার স্ত্রী ও দুই ছোট মেয়ে লানা ও বানা।

বাড়িটি ছিল তাদের আপন ঠিকানা। কিন্তু যুদ্ধের ভয়াবহতায় সেই ঠিকানাই হয়ে উঠেছিল অনিরাপদ। সেখানে চলছিল গোলাবর্ষণ। দখলদার ইসরাইলি বাহিনীর ট্যাংকগুলো বাড়ি থেকে মাত্র কয়েক মিটার দূরে অবস্থান করছিল। তাই মুমিন নিয়মিত সেখানে রাত কাটানোর সাহস করতেন না।

সেদিনও তার যাওয়ার উদ্দেশ্য ছিল খুব সাধারণ। বাড়ির পথ ও দেয়ালগুলো একবার দেখে আসা, পুরোনো আসবাবপত্রের খোঁজ নেওয়া এবং বাস্তুচ্যুত জীবনের একাকিত্ব কিছুটা কাটিয়ে দাদার বাড়ির ছাদের নিচে পরিবারের সঙ্গে একটি রাত কাটানো। কিন্তু সেই রাতই হয়ে উঠল তাদের জীবনের শেষ রাত।

দুই শিশুর চাচা মাইসারা আহমদ সাফা নিউজ এজেন্সিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সেই রাতের কথা স্মরণ করেন। ক্ষোভ ও বিস্ময়ে মিশ্রিত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘মুমিন মাঝেমধ্যে পরিবারের বাড়িতে যেত, বাড়ি ও আসবাবপত্রের খোঁজখবর নিতে।’

তিনি বলেন, ‘সামরিক যানবাহনের চলাচল ও ব্যাপক গোলাগুলির কারণে সে নিয়মিত সেখানে রাত কাটাত না। সেদিন পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হওয়ার পর সে তার দুই মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে সেখানে এক রাত কাটাতে যায়।’

পরিবারের সদস্যরা তখনও ভাবছিলেন, এটি হয়তো সাময়িক একটি সফর। মাইসারা বলেন, ‘আমরা তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছিলাম এবং মনে করেছিলাম, এটি শুধু সাময়িক একটি সফর। শান্তিতেই কেটে যাবে।’

কিন্তু রাত যত গভীর হলো, সেই আপাত শান্তির আড়াল থেকে বেরিয়ে এলো দখলদার বাহিনীর হামলা।

মধ্যরাতের পরপরই আশপাশের বাড়িঘর লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালানোর খবর আসতে শুরু করে। বাইত লাহিয়ায় গোলাবর্ষণের খবর শুনেছিলেন মাইসারা। কিন্তু যে বাড়িতে তার ভাই, ভাবি ও দুই ভাতিজি আশ্রয় নিয়েছেন, হামলার লক্ষ্য সেই বাড়িটিই হবে, তা তিনি কল্পনাও করতে পারেননি।

মাইসারা বলেন, ‘আমরা বাইত লাহিয়ায় গোলাবর্ষণের খবর শুনেছিলাম। কিন্তু কখনোই ভাবিনি, হামলাটি পরিবারের সেই বাড়ির ওপর হবে।’

এরপর শুরু হয় উৎকণ্ঠা। তিনি তার ভাই মুমিনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। কিন্তু ফোনগুলো পুরোপুরি বন্ধ ছিল। একে একে আত্মীয়দের সঙ্গে যোগাযোগ করেন তিনি। শেষ পর্যন্ত যে খবরটি আসে, তা ছিল একটি পরিবারের পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার খবর।

প্রতিবেশী ও আত্মীয়রা জানান, ক্ষেপণাস্ত্রগুলো সরাসরি বাড়িটিতে আঘাত করেছে। বৃহস্পতিবারের ভোর হওয়ার আগেই বাবা, মা ও দুই শিশুর ওপর থাকা বাড়িটি পরিণত হয় ধ্বংসস্তূপে।

বুধবার দিবাগত রাতে দখলদার বাহিনীর যুদ্ধবিমান বাইত লাহিয়ার মাশরু এলাকায় তাদের বাড়িতে হামলা চালায়। এতে শহীদ হন মুমিন আহমদ, তার স্ত্রী এবং দুই মেয়ে বানা ও লানা। ফিলিস্তিনি প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিহত চারজন হলেন মুমিন আবদুর রহমান আহমদ, হানিন মুসা ফারেস সালেহ, ১২ বছর বয়সী লানা মুমিন আহমদ এবং ৮ বছর বয়সী বানা মুমিন আহমদ।

ভোরের আলো ফুটতে শুরু করলে সেখানে পৌঁছায় উদ্ধারকারী দল। ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে তারা খুঁজে পান একটি পরিবারের চার সদস্যের মরদেহ। তবে তারা যেভাবে সেখানে প্রবেশ করেছিলেন, সেভাবে আর বের হতে পারেননি।

মাইসারা সেই মুহূর্তের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, ‘ভোরে তারা আমাদের জানায়, আমার ভাই, তার স্ত্রী ও দুই মেয়েকে ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে বের করা হয়েছে। তবে তারা যেভাবে সেখানে প্রবেশ করেছিল, সেভাবে বের হয়নি। তাদের দেহ খণ্ড-বিখণ্ড অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে।’

লানা ও বানা শুধু দুটি শিশু ছিলেন না, তারা ছিলেন পরিবারের প্রাণ। তাদের চাচা মাইসারার কাছে তারা ছিলেন হৃদয়ের সবচেয়ে কাছের দুটি শিশুর মতো।

কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন, ‘লানা ও বানা আমার হৃদয়ের সবচেয়ে প্রিয় শিশুদের মধ্যে ছিল। তারা আমার ও আমার সন্তানদের সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে ছিল, যা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।’

তিনি বলেন, ‘তারা চরিত্র ও মেধার দিক থেকেও সেরা মেয়েদের মধ্যে ছিল। ১২ বছর বয়সী লানা সব পরিস্থিতির মধ্যেও ইউএনআরডব্লিউএ পরিচালিত অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে আগ্রহী ছিল। আর আট বছর বয়সী বানা ছিল এমন এক ফেরেশতা, যে পুরো বাড়ি আনন্দে ভরিয়ে রাখত।’

যে বাড়িটি একসময় তাদের আশ্রয় ছিল, সেই বাড়িই শেষ পর্যন্ত তাদের কবর হয়ে দাঁড়াল। আজ তাদের ওপর বাড়িটি ধসে পড়েছে। মাইসারা বলেন, তার ভাইয়ের পুরো পরিবার কোনো অপরাধ ছাড়াই বেসামরিক নিবন্ধন থেকে মুছে দেওয়া হয়েছে।

মুমিন আহমদের পরিবারের এই পরিণতি গাজ্জায় শিশুদের ওপর চলমান নৃশংসতার আরেকটি মর্মান্তিক প্রতিচ্ছবি। যুদ্ধবিরতির মধ্যেও যখন মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতিকে তুলনামূলক শান্ত বলা হয়, তখনও কোনো পরিবার জানে না, পরবর্তী মুহূর্তে তাদের ঘরটি নিরাপদ থাকবে কি না।

তথ্য অনুযায়ী, গাজ্জায় গণহত্যামূলক যুদ্ধ শুরুর পর থেকে শহীদদের মোট সংখ্যার ৪০ শতাংশের বেশি শিশু। এসব শিশুর হাজার হাজার জন নিজেদের বাড়ির ভেতরে অথবা বাস্তুচ্যুত হওয়ার সময় শহীদ হয়েছে।

শুধু শিশুদের প্রাণহানিই নয়, এই যুদ্ধ গাজ্জার পরিবারগুলোকেও ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, গাজ্জায় ১৭ হাজারের বেশি শিশু বাবা অথবা মা, কিংবা উভয়কেই হারিয়ে এতিম হয়েছে। একই সময়ে ১ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি পরিবারকে পুরোপুরি সরকারি নথি থেকে মুছে দেওয়া হয়েছে।

যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও দখলদার বাহিনীর হামলা থামেনি। এসব হামলায় ১ হাজার ৩৫৮ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। তাদের ৭০ শতাংশই নারী ও শিশু।

বাইত লাহিয়ার সেই বাড়িটিও এখন আর নেই। নেই মুমিন, নেই তার স্ত্রী হানিন, নেই লানা, নেই আট বছরের বানা। একটি রাতের জন্য পুরোনো বাড়িতে ফিরে যাওয়া পরিবারটি ফিরে গেল না আর কোনোদিন। পড়ে রইল শুধু ধ্বংসস্তূপ আর স্বজনদের বুকভরা স্মৃতি।

সূত্র : সাফা নিউজ এজেন্সি

spot_img
spot_img
spot_img

সর্বশেষ