ইরানপন্থী হুথিদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবকে রক্ষায় ‘যে কোনো উপায়’ ব্যবহার করা হবে বলে জানিয়েছেন পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা মুহাম্মদ আসিফ। তিনি বলেছেন, সৌদি আরবের যে কোনো শত্রু পাকিস্তানের শত্রু। সৌদি আরবকে রক্ষা করতে পাকিস্তানের হাতে থাকা যে কোনো উপায় ব্যবহার করা হবে।
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) রোম সফরের সময় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে আসিফ এসব কথা বলেন।
পাকিস্তানি বাহিনী ইতোমধ্যে কোনো বিমান হামলায় অংশ নিয়েছে কি না, সে বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন আসিফ। তবে তিনি বলেন, সৌদি আরব ও তুরস্কের সঙ্গে নতুন পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় পাকিস্তানের সামরিক সক্ষমতা সৌদি আরবের জন্যও ব্যবহার করা হবে।
ইয়েমেনে ইরানি যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে পাকিস্তান কোনো বিমান হামলায় অংশ নিয়েছে কি না, জানতে চাইলে আসিফ বলেন, “আমি বিস্তারিত কিছু বলতে চাই না। তবে স্পষ্টতই যখন আমি বলছি, সৌদি আরবকে রক্ষা করতে এই চুক্তির আওতায় আমরা বাধ্য, তার অর্থ হলো আমাদের হাতে থাকা যে কোনো উপায় সৌদি আরবের জন্যও ব্যবহার করা হবে। আমি মনে করি, এটি একটি সুস্পষ্ট বক্তব্য।”
তার বক্তব্যে পাকিস্তানি বাহিনী কোনো হামলায় অংশ নিয়েছে কি না, তা সরাসরি নিশ্চিত হয়নি। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে হুথিদের বারবার হামলার শিকার সৌদি আরব পাকিস্তানের কাছে কোনো সহায়তা চেয়েছে কি না, সে বিষয়েও তিনি কিছু বলেননি।
রিয়াদে পাকিস্তান, তুরস্ক ও সৌদি আরবের সেনাপ্রধানরা হুথিদের হামলার জবাব নিয়ে বৈঠক করার কয়েক দিন পর আসিফ এসব মন্তব্য করেন।
আসিফ বলেন, হুথিরা সৌদি আরবের ওপর ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা জোরদার করেছে এবং ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলজুড়ে তাদের নিয়ন্ত্রণও বিস্তৃত করেছে।
সম্প্রতি হুথিরা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মোখা এবং লোহিত সাগরের কয়েকটি দ্বীপ দখল করেছে। এর ফলে বাব আল-মানদাব প্রণালির দিকে তাদের নিয়ন্ত্রণ আরও বিস্তৃত হয়েছে। বিশ্বের মোট বাণিজ্যের প্রায় ১২ শতাংশ এই সামুদ্রিক পথ দিয়ে চলাচল করে। হুথিরা এবং ইরাকের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোও সৌদি আরবের তেল স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে এবং সৌদি তেলবাহী জাহাজগুলোকে এই প্রণালি ব্যবহার থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করেছে।
আসিফ হুথিদের আগ্রাসী হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, সৌদি আরবের প্রতি পাকিস্তানের অঙ্গীকারের বিষয়ে কোনো অস্পষ্টতা নেই।
তিনি বলেন, “সৌদি আরবের যে কোনো শত্রু পাকিস্তানের শত্রু। বিষয়টি খুবই স্পষ্ট হওয়া উচিত।”
গত ৭ আগস্ট সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ স্বাক্ষর করে। এতে বলা হয়, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর হামলা হলে সেটিকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। দেশগুলো চুক্তিটিকে প্রতিরক্ষামূলক হিসেবে বর্ণনা করেছে এবং জানিয়েছে, এটি কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নয়।
এই চুক্তির আওতায় তেলসমৃদ্ধ সৌদি আরব, ন্যাটোর সদস্য তুরস্ক এবং পারমাণবিক অস্ত্রধারী পাকিস্তান একত্রিত হয়েছে। তবে আসিফ পারমাণবিক অস্ত্রের কথা উল্লেখ করেননি এবং সৌদি আরবের প্রতি পাকিস্তানের অঙ্গীকারের অংশ হিসেবে এগুলো ব্যবহারের কোনো ইঙ্গিতও দেননি।
সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যে চলমান লড়াই এই জোটের জন্য শুরুতেই একটি পরীক্ষার পরিস্থিতি তৈরি করেছে। চুক্তিটির পূর্ণাঙ্গ পাঠ প্রকাশ করা হয়নি এবং এর কমান্ড ও কার্যক্রম পরিচালনার কাঠামো এখনো গড়ে তোলা হচ্ছে। আসিফ বলেন, তিন দেশ একটি সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করছে এবং জোটের কাঠামো তৈরি করছে।
তিনি বলেন, অন্যান্য দেশও এই জোটে যোগ দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তবে এখনই জোট সম্প্রসারণের কোনো পরিকল্পনা নেই।
আসিফ বলেন, ইরানকে ঘিরে সংঘাত পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ার সময় বিদ্যমান নিরাপত্তা ব্যবস্থাগুলো উপসাগরীয় দেশগুলোকে সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়েছে বলে জোটের সদস্য দেশগুলো মনে করে।
তিনি বলেন, একবার কোনো সংঘাত শুরু হলে আপনি সেই সংঘাতের পরিণতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না। আপনি সেই সংঘাত কোন দিকে এগোবে, সেটিও নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না।
ইরান দীর্ঘদিন ধরে হুথিদের অস্ত্র ও অন্যান্য সহায়তা দিয়ে আসছে। তবে তেহরান হুথিদের সামরিক অভিযান পরিচালনার বিষয়টি অস্বীকার করে। আসিফের বক্তব্য অনুযায়ী, হুথি এবং ইরাকের কিছু সশস্ত্র গোষ্ঠী এখন ইরানের কাছ থেকে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে।
তিনি বলেন, “এই প্রক্সিগুলোর কিছু একসময় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।”
সৌদি আরবকে সামরিকভাবে সহায়তা করার বিষয়ে পাকিস্তানের আগ্রহের কথা জানালেও আসিফ বলেন, ইসলামাবাদ একইসঙ্গে ইরানকে ঘিরে বৃহত্তর সংঘাতের অবসানে আলোচনার জন্য চাপ দিচ্ছে। পাশাপাশি তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে একটি চুক্তি পুনরুজ্জীবিত করার পক্ষেও পাকিস্তান রয়েছে।
পাকিস্তান চলতি বছরের শুরুতে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেছিল। সংঘাতের অবসানে তারা এ অঞ্চলের অন্যান্য দেশের সঙ্গে কাজ করেছিল। মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা আবার শুরু হলেও সর্বশেষ প্রচেষ্টায় পাকিস্তানের ভূমিকা নিয়ে আসিফ কোনো বিস্তারিত তথ্য দেননি।
এপ্রিল মাসে পাকিস্তান ইসলামাবাদে ইরান ও আমেরিকার মধ্যে বিরল সরাসরি আলোচনার আয়োজন করেছিল। জুনে দুই পক্ষ একটি অন্তর্বর্তী চুক্তিতে পৌঁছায় এবং ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর চেষ্টা করার অঙ্গীকার করে। তবে পরে আবারও শত্রুতা শুরু হওয়ায় সেই সময়সীমা পার হয়ে যায়।
সম্প্রতি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে পাকিস্তান, তুরস্ক ও সৌদি আরবের শীর্ষ কূটনীতিকরাও বৈঠক করেছেন। বৈঠকে নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তি বাস্তবায়ন এবং মক্কাসহ সৌদি আরবের অন্যান্য স্থানে হামলার জবাব সমন্বয়ের বিষয়ে আলোচনা করা হয়।
সূত্র : অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস











