উনিশ বছর হয়ে গেল জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের দীর্ঘদিনের খতিব, প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও আলেমে দ্বীন মাওলানা উবায়দুল হক রহ. আমাদের মাঝে নেই।
কারণ তাঁর কাছে জাতীয় মসজিদের মিম্বর শুধু জুমার খুতবা দেওয়ার জায়গা ছিল না। শরিয়াহ ও ইসলামের প্রশ্নে রাষ্ট্রীয় কোনো সিদ্ধান্তের সঙ্গে দ্বিমত হলে তিনি কথা বলেছেন। ক্ষমতাসীনদের অসন্তুষ্টির আশঙ্কায় অবস্থান বদলাননি। তাঁকে খতিবের পদ থেকে সরানোর চেষ্টা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকার তাঁকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছিল। কিন্তু সরকারের সিদ্ধান্ত তিনি মেনে নেননি। বাধ্যতামূলক অবসরের সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে রিট করেন। পরে আদালতের রায়ে তিনি আবার সেই মিম্বরেই ফিরে আসেন।
ফিলিস্তিন, কাশ্মীর, আফগানিস্তান কিংবা ইরাকে মুসলমানদের ওপর আগ্রাসন হলে তিনি কণ্ঠ তুলেছেন। ইসলাম ও মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতকারী সংবাদমাধ্যমের ভূমিকার বিরুদ্ধেও দাঁড়িয়েছেন। আবার ইসলামের নামে বোমা হামলা ও মানুষ হত্যার ঘটনা ঘটলে একই দৃঢ়তায় এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। স্পষ্ট করে বলেছেন, বোমা মেরে মানুষ হত্যার সঙ্গে ইসলামের কোনো সম্পর্ক নেই।
এই জায়গাতেই মাওলানা উবায়দুল হক রহ.-এর জীবন শুধু একজন মুহাদ্দিস বা জাতীয় মসজিদের সাবেক খতিবের জীবনী নয়। তাঁর জীবন বাংলাদেশের জাতীয় মিম্বরের একটি সময়ের ইতিহাস।
বারোঠাকুরী থেকে দেওবন্দ
মাওলানা উবায়দুল হক রহ. ১৯২৮ সালের ২ মে সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলার বারোঠাকুরী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মাওলানা জহুরুল হক রহ. ছিলেন দারুল উলূম দেওবন্দের ফাজিল এবং হাকিমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানভি রহ.-এর খলিফা। বাবার কাছেই তাঁর দ্বীনি শিক্ষা ও তরবিয়তের সূচনা।
প্রাথমিক শিক্ষার পর স্থানীয় বিভিন্ন মাদরাসায় পড়াশোনা করে মাত্র ১৪ বছর বয়সে, ১৯৪২ সালে, উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি ভারতের দারুল উলূম দেওবন্দে যান।
সেখানে শায়খুল ইসলাম মাওলানা সাইয়েদ হুসাইন আহমদ মাদানি রহ., মাওলানা ইবরাহিম বালিয়াভি রহ., মাওলানা ইজাজ আলী আমরুহি রহ., মাওলানা ইদরিস কান্দলভি রহ. ও কারী মুহাম্মাদ তৈয়্যব রহ.-এর কাছে হাদিস, তাফসির ও অন্যান্য শাস্ত্র অধ্যয়ন করেন।
ছাত্র থেকে উস্তাদ
পড়াশোনা শেষ করে তিনি শিক্ষকতায় প্রবেশ করেন। ঢাকার বড় কাটরা হোসাইনিয়া আশরাফুল উলূমে উচ্চতর শ্রেণিতে পাঠদান করেন। পরে দারুল উলূম করাচিতেও শিক্ষকতা করেন।
১৯৫৪ সালে তিনি ঢাকার সরকারি মাদরাসা-ই-আলিয়ায় যোগ দেন। দীর্ঘদিন হাদিসসহ বিভিন্ন বিষয়ে পাঠদান করেন এবং পর্যায়ক্রমে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮০ সালে তিনি হেড মাওলানা হন। ১৯৮৫ সালে সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেন।
কিন্তু চাকরি থেকে অবসর তাঁর হাদিসের মসনদ থেকে অবসর ছিল না। চট্টগ্রামের পটিয়া মাদরাসা, ঢাকার ফরিদাবাদ ও ফয়জুল উলূম এবং সিলেটের দরগাহ মাদরাসাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে তিনি শাইখুল হাদিস হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
জাতীয় পরিচয়ে তাঁর ‘খতিব’ পরিচয় অন্য সব পরিচয়কে ছাপিয়ে গেলেও তাঁর মূল ভিত ছিল ইলম ও শিক্ষকতার জীবন।
জাতীয় মসজিদের মিম্বরে
১৯৮৪ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর মাওলানা উবায়দুল হক রহ. বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের খতিব হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এরপর ইন্তেকাল পর্যন্ত প্রায় ২৩ বছর তিনি এই দায়িত্বে ছিলেন।
এই দীর্ঘ সময়ে তাঁর সামনে এসেছে একের পর এক সরকার, ধর্মীয় বিতর্ক, আন্তর্জাতিক যুদ্ধ ও মুসলিম বিশ্বের সংকট। কিন্তু ক্ষমতাসীনদের পছন্দ-অপছন্দ বিবেচনা করে তিনি শরিয়াহর বক্তব্য বদলাতেন না।
তাঁর বিরুদ্ধে সরকারবিরোধী বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগও উঠেছিল। নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি জানিয়েছিলেন, তাঁর কাজ সরকারবিরোধী রাজনীতি করা নয়; তিনি শরিয়তের মাসআলা বলেন। সেই বক্তব্য কোনো সরকারের নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হলে সে কারণে ধর্মীয় বক্তব্য পরিবর্তন করা তাঁর কাজ নয়।
হাসিনা সরকারের চাপ, শেষ পর্যন্ত অপসারণ
১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর মাওলানা উবায়দুল হক রহ.-এর সঙ্গে সরকারের টানাপোড়েন দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। সমকালীন আলেমদের স্মৃতিচারণে এসেছে, ইসলামি বিভিন্ন ইস্যুতে সরকারের অবস্থানের বিরুদ্ধে তিনি জাতীয় মসজিদের মিম্বর থেকে সোচ্চার ছিলেন। তাঁর এই অবস্থানকে কেন্দ্র করে শেখ হাসিনা সরকারের সঙ্গে টানাপোড়েনও ক্রমেই বাড়তে থাকে।
১৯৯৭ সালের জুলাইয়ে বায়তুল মোকাররমে একটি ঈদে মিলাদুন্নবী অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে বিশৃঙ্খলার পর ইসলামিক ফাউন্ডেশন তাঁকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়। জানতে চাওয়া হয়, কেন তাঁকে খতিবের পদ থেকে সরানো হবে না। তৎকালীন ধর্ম প্রতিমন্ত্রীও তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন।
উবায়দুল হক রহ. অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেন এবং জানান, ওই বিশৃঙ্খলার সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না।
অভিযোগটি তাঁর বিরুদ্ধে প্রমাণিত হয়নি। কিন্তু ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই তাঁকে জাতীয় মসজিদের মিম্বর থেকে সরানোর প্রক্রিয়া পর্যন্ত এগিয়েছিল।
২০০১ সালে শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকার আরও এক ধাপ এগিয়ে তাঁকে বায়তুল মোকাররমের খতিবের পদ থেকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠায়।
কিন্তু সরকারের সিদ্ধান্ত তিনি মেনে নেননি। বাধ্যতামূলক অবসরের সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে রিট করেন। শেষ পর্যন্ত আদালত তাঁর পক্ষে রায় দেন এবং তাঁকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাতিল হয়ে যায়।
মাওলানা উবায়দুল হক রহ. আবার জাতীয় মসজিদের মিম্বরে ফিরে আসেন।
১৯৯৭ সালের অপসারণের উদ্যোগ, ২০০১ সালের বাধ্যতামূলক অবসর এবং আদালতের রায়ে প্রত্যাবর্তন, সব মিলিয়ে তাঁর কণ্ঠকে জাতীয় মিম্বর থেকে সরিয়ে দেওয়ার একটি ধারাবাহিক চেষ্টা হিসেবে ঘটনাগুলোকে দেখেছেন তাঁর সমকালীন আলেমরা।
ফতোয়াবিরোধী রায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান
২০০১ সালে উচ্চ আদালতের একটি রায়ে ফতোয়াকে অবৈধ ঘোষণা করা হলে দেশের আলেমসমাজে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। মাওলানা উবায়দুল হক রহ. এই রায়ের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নেন।
জাতীয় মসজিদের মিম্বর থেকে তিনি ইসলামে ফতোয়ার প্রয়োজনীয়তা ও শরয়ি অবস্থান ব্যাখ্যা করেন। তাঁর কাছে এটি দলীয় রাজনীতির প্রশ্ন ছিল না; ছিল শরিয়াহর একটি প্রতিষ্ঠিত বিধানের প্রশ্ন।
উচ্চ আদালতের রায় বলেই তিনি নীরব থাকেননি। শরিয়াহর সঙ্গে সাংঘর্ষিক মনে করা ওই রায়ের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যেই অবস্থান নিয়েছিলেন।
মুসলিম বিশ্বের জন্য যে মিম্বর কথা বলত
উবায়দুল হক রহ.-এর দৃষ্টি বাংলাদেশের সীমানায় সীমাবদ্ধ ছিল না। ফিলিস্তিন, কাশ্মীর, আফগানিস্তান ও ইরাকসহ মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের ঘটনা তিনি খুতবা ও বক্তব্যে তুলতেন।
২০০৩ সালে আমেরিকা ও ব্রিটেন ইরাকে সামরিক আগ্রাসন শুরু করলে তিনি প্রকাশ্যে প্রতিবাদে নামেন। বায়তুল মোকাররমে জুমার পর আমেরিকান ও ব্রিটিশ পণ্য বর্জনের আহ্বান জানান এবং আগ্রাসন বন্ধে আন্তর্জাতিক উদ্যোগের দাবি তোলেন।
তাঁর অবস্থান ছিল, রাষ্ট্র তার আন্তর্জাতিক সম্পর্কের হিসাব করবে, কিন্তু মুসলমান আক্রান্ত হলে খতিব মুসলিম ভ্রাতৃত্বের জায়গা থেকে কথা বলবেন।
ইসলামের নামে হত্যাকাণ্ডকেও ছাড় দেননি
২০০৫ সালে বাংলাদেশে ধারাবাহিক বোমা হামলা ও আত্মঘাতী হামলার ঘটনায় তিনি প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করেন।
বায়তুল মোকাররমের খুতবায় তিনি বলেন, বোমা মেরে যারা মানুষ হত্যা করছে তারা ইসলাম ও মানুষের শত্রু; বোমা মেরে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করা যায় না। তাঁর নেতৃত্বে বায়তুল মোকাররম থেকে বোমা হামলার বিরুদ্ধে মিছিলও বের হয়।
ইসলাম অবমাননার ঘটনায় সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি
রাষ্ট্রক্ষমতার পাশাপাশি ইসলাম ও মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতির প্রশ্নে প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধেও অবস্থান নিতে দ্বিধা করেননি মাওলানা উবায়দুল হক রহ.।
২০০৭ সালের সেপ্টেম্বরে দৈনিক প্রথম আলোর সাপ্তাহিক রম্য সাময়িকী ‘আলপিন’-এ একটি কার্টুন প্রকাশকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে তীব্র প্রতিবাদ শুরু হয়। কার্টুনটি মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করেছে বলে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি হয়। উবায়দুল হক রহ.ও এর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেন।
পরে ইসলামিক ফাউন্ডেশনে আলেম, সরকারের উপদেষ্টা ও বিভিন্ন সংবাদপত্রের সম্পাদকদের উপস্থিতিতে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চান।
সমকালীন স্মৃতিচারণে এসেছে, বৈঠকে উবায়দুল হক রহ. শুধু ওই কার্টুনের প্রতিবাদেই সীমাবদ্ধ থাকেননি; ইসলাম ও ইসলামি মূল্যবোধের প্রশ্নে সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা নিয়েও কঠোর সমালোচনা করেন।
তবে ক্ষমা চাওয়ার পর তিনি বিষয়টিকে আর সংঘাতের দিকে নিয়ে যেতে চাননি। ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চাইলে ক্ষমা করা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহ উল্লেখ করে তিনি উত্তেজনা না বাড়ানোর আহ্বান জানান।
ইসলাম অবমাননার প্রতিবাদে দৃঢ়তা এবং ভুল স্বীকারের পর ক্ষমা, এই দুই অবস্থানই তাঁর নেতৃত্বের স্বাতন্ত্র্য তুলে ধরে।
আলেমদের ঐক্য ও নেতৃত্বের ভাবনা
মাওলানা উবায়দুল হক রহ.-এর সঙ্গে হাফেজ্জী হুজুর রহ.-এর গভীর সম্পর্ক ছিল। তিনি তাঁর কাছ থেকে খেলাফত লাভ করেন। গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে হাফেজ্জী হুজুর তাঁর মতামতকে মূল্য দিতেন বলে সমকালীনদের স্মৃতিচারণে এসেছে।
মজলিসে দাওয়াতুল হক এবং খতমে নবুওয়ত আন্দোলনের সঙ্গেও তিনি সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। জাতীয় শরিয়াহ কাউন্সিল এবং বিভিন্ন ইসলামি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শরিয়াহ বোর্ডের সঙ্গেও তাঁর সম্পৃক্ততা ছিল।
তরুণ আলেমদের তিনি শুধু মসজিদ-মাদরাসায় সীমাবদ্ধ থাকতে বলতেন না। আধুনিক ব্যবসা-বাণিজ্য, অর্থনীতি ও সমাজের বাস্তবতা বোঝার আহ্বান জানাতেন।
তাঁর আক্ষেপ ছিল, মানুষ আলেমদের পীর-বুজুর্গ হিসেবে সম্মান করে, কিন্তু সবসময় জাতীয় নেতৃত্বের উপযোগী মনে করে না। তিনি চেয়েছিলেন, আলেমরা সমাজের বাস্তব কাজে সম্পৃক্ত হয়ে নিজেদের নেতৃত্বের উপযোগী করে গড়ে তুলুক।
শেষ রমজান, শেষ বিদায়
২০০৭ সালের ৬ অক্টোবর রমজান মাসে হঠাৎ শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত হন মাওলানা উবায়দুল হক রহ.। তাঁকে ঢাকার ল্যাবএইড হাসপাতালে নেওয়া হয়। রাত সাড়ে ১০টার দিকে সেখানে তিনি ইন্তেকাল করেন। বয়স হয়েছিল ৭৯ বছর।
পরদিন জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা পড়ান তাঁর ছেলে মুফতী মাওলানা আতাউল হক।
রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমেদ, প্রধান উপদেষ্টা ফখরুদ্দীন আহমদ, সরকারের উপদেষ্টা, সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তা, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, দেশের শীর্ষ আলেম এবং বিপুলসংখ্যক সাধারণ মানুষ তাঁর জানাজায় অংশ নেন। পরে তাঁকে আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করা হয়।
প্রায় ২৩ বছর যে মানুষটি জাতীয় মসজিদের মিম্বর থেকে জাতিকে সম্বোধন করেছেন, তাঁর শেষ বিদায়েও মিলেছিল রাষ্ট্র, রাজনীতি, আলেমসমাজ ও সাধারণ মানুষ।
যে শূন্যতা শুধু একজন খতিবের নয়
মাওলানা উবায়দুল হক রহ.-এর ইন্তেকালের পর ১৯ বছর পেরিয়ে গেছে।
তাঁকে স্মরণ করতে গেলে যে শূন্যতার কথা সামনে আসে, সেটি শুধু একজন খতিবের নয়।
এটি এমন এক জাতীয় মিম্বরের শূন্যতা, যেখান থেকে ক্ষমতাসীন সরকারের অপছন্দের ভয় না করে শরিয়াহর কথা বলা হতো।
যে খতিবকে সরিয়ে দিতে সরকার উদ্যোগ নিয়েছে, শেষ পর্যন্ত পদ থেকে সরিয়েও দিয়েছে, তিনি আদালতে গিয়ে আবার সেই মিম্বরে ফিরে এসেছেন।
ফতোয়াবিরোধী রায়ের বিরুদ্ধে তিনি কথা বলেছেন। আমেরিকা ও ব্রিটেন ইরাকে আগ্রাসন চালালে জাতীয় মসজিদের মিম্বর থেকে প্রতিবাদ করেছেন। ইসলাম অবমাননার ঘটনায় প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়েছেন, আবার ভুল স্বীকারের পর ক্ষমা ও সংযমের পথও দেখিয়েছেন। আর ইসলামের নাম ব্যবহার করে মানুষ হত্যা করা হলে সেই হত্যাকাণ্ডকেও প্রত্যাখ্যান করেছেন।
তাঁর আপসহীনতার কেন্দ্রে ছিল শরিয়াহর প্রতি দায়বদ্ধতা, মুসলিম উম্মাহর প্রতি দায়িত্ববোধ এবং ক্ষমতার পছন্দ-অপছন্দের কাছে আলেমের কণ্ঠ সমর্পণ না করা।
এই কারণেই মাওলানা উবায়দুল হক রহ.-কে শুধু বায়তুল মোকাররমের দীর্ঘদিনের একজন খতিব হিসেবে স্মরণ করলে তাঁর জীবনকে সম্পূর্ণভাবে পড়া হয় না।
তিনি ছিলেন মুহাদ্দিস, শিক্ষক ও জাতীয় খতিব। একই সঙ্গে এমন একটি সময়ের প্রতিনিধি, যখন বাংলাদেশের জাতীয় মসজিদের মিম্বর রাষ্ট্রক্ষমতার চাপ, ইসলামবিরোধী প্রবণতা, মুসলিম বিশ্বের ওপর আগ্রাসন এবং ইসলাম ও মুসলমানের মর্যাদার প্রশ্নে একটি শক্তিশালী কণ্ঠ হিসেবে শোনা যেত।
উনিশ বছর ধরে সেই কণ্ঠ নেই।
কিন্তু তাঁর মিম্বরের ইতিহাস এখনো আছে।
আর সেই ইতিহাসের সঙ্গে স্থায়ীভাবে জড়িয়ে আছে একটি নাম।
মাওলানা উবায়দুল হক রহ.।
আল্লাহ তায়ালা তাঁর দ্বীনি খেদমত কবুল করুন, তাঁর ভুলত্রুটি ক্ষমা করুন এবং তাঁকে জান্নাতুল ফিরদাউসের সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করুন। আমিন।











