দেশের কৃষকদের নিবন্ধন, কৃষি উপকরণ ও আর্থিক সহায়তা প্রদান এবং পর্যায়ক্রমে দেশব্যাপী কৃষক কার্ড বিতরণের লক্ষ্যে বড় পরিসরে কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার। আগামী চার বছরে প্রায় ২ কোটি ৪০ লাখ কৃষককে এ কর্মসূচির আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) বাসসের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৪৩ লাখ কৃষককে কৃষক কার্ড কর্মসূচির আওতায় আনার কাজ চলমান রয়েছে। দেশের ৬৪ জেলার ৫০৩টি উপজেলায় ১৪ হাজার ১৮০টি কৃষি ব্লককে পর্যায়ক্রমে এ কর্মসূচির আওতায় আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
কৃষক কার্ড কর্মসূচির মাধ্যমে কৃষকদের একটি সমন্বিত তথ্যভান্ডার গড়ে তোলা এবং তাঁদের কাছে আর্থিক ও কৃষি উপকরণ সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকদের বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৬৪ জেলার ৫০৩টি উপজেলার ১ হাজার ৬৮১টি কৃষি ব্লকে তথ্য সংগ্রহের কার্যক্রম এগিয়েছে। এসব ব্লকে এখন পর্যন্ত ১৯ লাখ ২৫ হাজার কৃষকের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। পাশাপাশি কৃষক কার্ড-সংক্রান্ত ৯ লাখ ব্যাংক হিসাব খোলা হয়েছে।
কৃষকদের তথ্য সংগ্রহ, তথ্য যাচাই, ব্যাংক হিসাব খোলা এবং পর্যায়ক্রমে কার্ড বিতরণের মাধ্যমে কর্মসূচির আওতায় একটি সমন্বিত তথ্যভান্ডার গড়ে তোলার কাজ চলছে।
কৃষক কার্ড কর্মসূচির বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া যাচাই ও প্রাথমিক কার্যক্রম পরিচালনার অংশ হিসেবে চলতি বছরের মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত প্রাক-পাইলটিং কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। এ পর্যায়ে দেশের আটটি বিভাগের ১০টি জেলার ১১টি উপজেলার ১১টি কৃষি ব্লকে ২০ হাজার ৮৩২ জন কৃষকের মধ্যে কৃষক কার্ড বিতরণ করা হয়েছে।
গত ১৪ এপ্রিল, বাংলা নববর্ষের প্রথম দিনে টাঙ্গাইল সদর উপজেলায় আনুষ্ঠানিকভাবে কৃষক কার্ড বিতরণের প্রাক-পাইলটিং কার্যক্রম উদ্বোধন করা হয়।
প্রাক-পাইলটিংয়ের আওতায় ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকদের মধ্যে ২০ হাজার ৪৮০ জনকে আর্থিক প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। জনপ্রতি বছরে ২ হাজার ৫০০ টাকা হারে এ পর্যায়ে মোট ৫ কোটি ১২ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়।
প্রাক-পাইলটিংয়ের অভিজ্ঞতার পর কর্মসূচির কার্যক্রম আরও বিস্তৃত এলাকায় সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে গত ১ অক্টোবর দেশের ৫৬ জেলার ৭৭টি উপজেলায় ভার্চুয়ালি একই সঙ্গে কৃষক কার্ড কর্মসূচির কার্যক্রম উদ্বোধন করা হয়।
এ পর্যায়ে প্রতিটি উপজেলা থেকে একটি করে কৃষি ব্লক নির্বাচন করা হয়েছে। ফলে মোট ৭৭টি কৃষি ব্লক কর্মসূচির আওতায় এসেছে।
এ পর্যায়ে মোট ১ লাখ ১০ হাজার ১৬৫ জন কৃষককে কর্মসূচির আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ফেনী জেলার ছয়টি উপজেলার ৭ হাজার ৬৪৩ জন কৃষক রয়েছেন।
নির্বাচিত এলাকাগুলোতে কৃষক কার্ড কর্মসূচি সম্প্রসারণের পাশাপাশি কৃষি উপকরণ সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। এ সহায়তায় ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকদের অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যায়ে ১ লাখ ৪৭ জন কৃষককে কৃষি উপকরণ সহায়তার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ফেনী জেলার ছয়টি উপজেলার ৭ হাজার ১৫৩ জন এবং বাকি ৫৫ জেলার ৯২ হাজার ৮৯৪ জন কৃষক রয়েছেন।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সেলিম খান বাসসকে বলেন, কৃষক কার্ড কর্মসূচি দেশের কৃষকদের একটি সমন্বিত তথ্যভান্ডারের আওতায় আনার গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। এর মাধ্যমে প্রকৃত কৃষকদের শনাক্ত করা, তাঁদের প্রয়োজন অনুযায়ী কৃষি উপকরণ ও আর্থিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া এবং কৃষিসেবা কার্যক্রম আরও সুশৃঙ্খল করার সুযোগ তৈরি হবে।
তিনি বলেন, কৃষকবান্ধব প্রধানমন্ত্রী কৃষকের কল্যাণে ‘কৃষক কার্ড’ প্রবর্তন করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসন ও নির্দেশনা অনুযায়ী আগামী চার বছরের মধ্যে ২ কোটি ৪০ লাখ কৃষককে কৃষক কার্ড প্রদান করা হবে।
মো. সেলিম খান বলেন, কৃষক কার্ডের মাধ্যমে কৃষকেরা ১০ ধরনের সেবা পাবেন। এর মধ্যে রয়েছে স্বল্প সুদে কৃষিঋণ, সেচ, সার, বীজ, প্রণোদনা, কৃষি বিমা, আবহাওয়ার তথ্য ও বালাইনাশক পরামর্শসহ বিভিন্ন কৃষিসেবা ও সহায়তা।
তিনি বলেন, কৃষক কার্ডের মাধ্যমে কৃষককে তাঁর প্রাপ্য সম্মান প্রদর্শনের পাশাপাশি সরকার ও রাষ্ট্র যে তাঁদের পাশে রয়েছে, তারও প্রতিফলন ঘটবে।
কৃষক কার্ড কর্মসূচি বাস্তবায়নে মাঠপর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছে প্রোগ্রাম অন এগ্রিকালচারাল অ্যান্ড রুরাল ট্রান্সফরমেশন ফর নিউট্রিশন, এন্টারপ্রেনারশিপ অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স ইন বাংলাদেশ (পার্টনার) প্রকল্প।
প্রকল্পের ডেপুটি প্রোগ্রাম ডিরেক্টর (ডিপিডি) মো. রাকিবুজ্জামান খান বাসসকে বলেন, কৃষকদের সঠিক তথ্য সংগ্রহ, তাঁদের চাহিদা নিরূপণ এবং কৃষির আধুনিকায়নে সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছে।
তিনি আরও বলেন, কৃষকের চাহিদা সময় ও পরিস্থিতি অনুযায়ী পরিবর্তিত হয়, তাই কিছুটা চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তবে একটি নির্ভরযোগ্য তথ্যভান্ডার গড়ে তোলা গেলে কৃষকদের প্রয়োজন অনুযায়ী প্রশিক্ষণ, আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তি, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং কৃষি উদ্যোক্তা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া সহজ হবে।
রাকিবুজ্জামান খান বলেন, ইতোমধ্যে ২২ হাজার কৃষকের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। কৃষক কার্ড কর্মসূচির সঙ্গে তথ্য ও কার্যক্রমের সমন্বয়ের মাধ্যমে কৃষকদের বিভিন্ন কৃষিসেবার আওতায় আনা এবং মাঠপর্যায়ে সরকারি উদ্যোগগুলোর কার্যকারিতা বাড়ানো সম্ভব হবে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের কৃষক কার্ড সেলের অতিরিক্ত সচিব মো. ইয়াসীন বাসসকে বলেন, কৃষক কার্ড কর্মসূচির মূল লক্ষ্য হচ্ছে কৃষকদের সঠিক তথ্য সংরক্ষণ এবং তাঁদের কাছে সরকারি সহায়তা পৌঁছানোর প্রক্রিয়াকে আরও সহজ ও কার্যকর করা। এ জন্য কৃষকদের তথ্য সংগ্রহ, যাচাই, ব্যাংক হিসাব খোলা এবং পর্যায়ক্রমে কার্ড বিতরণের কার্যক্রম সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
চার বছরে প্রায় ২ কোটি ৪০ লাখ কৃষককে অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষ্য অর্জনে দেশের সব জেলা, উপজেলা ও কৃষি ব্লককে পর্যায়ক্রমে কর্মসূচির আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৪৩ লাখ কৃষককে অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
সূত্র: বাসস











