নিখোঁজ হওয়ার এক দিন পর তুরাগ নদী থেকে বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তাঁর মৃত্যুকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড দাবি করে অভিযোগ তুলেছেন স্বজনেরা। তবে নৌপুলিশ জানিয়েছে, মরদেহে বাইরে থেকে দৃশ্যমান কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা যাবে।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে খবর পেয়ে টঙ্গী নৌপুলিশ ফাঁড়ির একটি দল রাজধানীর উত্তরখান থানার রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন তুরাগ নদ থেকে মরদেহটি উদ্ধার করে। পরে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।
তাহসিফের মৃত্যুর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে আবেগঘন পোস্ট দেন তাঁর খালাতো বোন মোশফেকা জাহান। সেখানে তিনি তাহসিফকে হত্যা করা হয়েছে দাবি করে প্রশ্ন তোলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী হাসিনার পালানোর ভিডিও শেয়ার করার কারণেই কি তাঁকে এমন পরিণতির শিকার হতে হয়েছে?
মোশফেকা জাহান দাবি করেন, তাহসিফ নিজে ভিডিওটি ধারণ করেননি। একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে তিনি শুধু ভিডিওটি শেয়ার করেছিলেন। তাঁর দাবি, ভিডিওটি তাঁর কোনো সহকর্মী ধারণ করে থাকতে পারেন। এরপর তাহসিফকে অন্যায়ভাবে অবসরে পাঠানো এবং দিনের পর দিন মানসিক নির্যাতন করার অভিযোগও করেন তিনি।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, চাকরি থেকে অবসরে পাঠানোর পরও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন নিয়মিত তাহসিফকে অনুসরণ করতেন বলে তিনি তাঁকে জানিয়েছিলেন। সুস্থ একজন মানুষকে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে দাবি করে মোশফেকা জাহান প্রশ্ন তোলেন, দেশপ্রেমিক হওয়া এবং পরিবারের সদস্যদের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে রাজপথে সক্রিয় থাকার কারণেই কি তাহসিফকে এমন চরম মূল্য দিতে হয়েছে?
নৌপুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বুধবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে ৯৯৯ নম্বরে স্থানীয়দের মাধ্যমে তুরাগ নদে একটি মরদেহ ভাসতে থাকার খবর পায় পুলিশ। পরে রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন এলাকা থেকে অজ্ঞাতপরিচয় এক ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
মরদেহ উদ্ধারের সময় তাঁর পরনে ছিল সাদা পাজামা ও কালো জামা। হাতে একটি হাতঘড়ি এবং পকেটে একটি আইফোন পাওয়া যায়। ওই আইফোনের মাধ্যমে পরে তাঁর পরিচয় শনাক্ত করা হয়। এরপর মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।
ঢাকা জেলা নৌপুলিশের পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মামুন জানিয়েছেন, মরদেহে বাইরে থেকে দৃশ্যমান কোনো আঘাত বা জখমের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। ময়নাতদন্তের পর মৃত্যুর কারণ জানা যাবে। স্বজনদের অভিযোগ অনুযায়ী পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানিয়েছে পুলিশ।
এদিকে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী হাসিনার পালানোর ভিডিও প্রকাশের সঙ্গে তাহসিফের নাম দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত হয়ে আসছিল। তবে ভিডিওটি তিনি নিজে ধারণ করেছিলেন কি না, কিংবা তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে ওই ভিডিও প্রকাশের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হয়নি।
তাহসিফের চাকরি থেকে অবসরের বিষয়েও এর আগে আলোচনা হয়েছিল। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) ২০২৫ সালের ৪ আগস্ট জানিয়েছিল, তাঁকে প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম মেনে, ভিন্ন প্রেক্ষাপটে এবং কোনো অভিযোগ ছাড়াই অবসর দেওয়া হয়েছিল।
তাহসিফের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং তিনি কীভাবে তুরাগ নদে গেলেন, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বিষয়টি ময়নাতদন্ত ও আইনগত তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হবে।











