বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ মারা গেছেন। সোমবার (১ জুন) বিকেলে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছিলেন তিনি।
তোফায়েল আহমেদ আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের প্রভাবশালী নেতা ছিলেন। শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনামলেও তিনি দলটির গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মুখ হিসেবে সক্রিয় ছিলেন। হেফাজতে ইসলাম, শাপলা গণহত্যা ও ইসলামপন্থীদের নিয়ে তার বিভিন্ন বক্তব্যে আওয়ামী লীগের দমননীতির পক্ষে অবস্থান স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
২০১৩ সালের ৫ মে ঢাকার শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের অবস্থান কর্মসূচি চলাকালে রাতের অন্ধকারে সংঘটিত শাপলা গণহত্যা বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম রক্তাক্ত ঘটনা। শাপলা গণহত্যার পর আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা ঘটনাটিকে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র হিসেবে তুলে ধরতে থাকেন। তোফায়েল আহমেদও একই অবস্থান নেন। তিনি হেফাজতে ইসলাম, সংগঠনটির নেতৃত্ব ও শাপলা চত্বরের ঘটনাকে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির পরিকল্পনার অংশ হিসেবে উপস্থাপন করেন।
শাপলা গণহত্যার কয়েক দিনের মাথায় তোফায়েল আহমেদ বলেন, “৫ মে আমরা বিজয়ী হয়েছি। আগামী দিনেও হব। কিন্তু এ জন্য আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।”
২০১৩ সালের ১৩ মে রাজধানীর ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর রাজনৈতিক কার্যালয়ে ১৪ দলের এক মতবিনিময় সভায় সভাপতির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। সেখানে তোফায়েল আহমেদ দাবি করেন, সন্ধ্যার সময় হেফাজতকে সমর্থন দিয়ে খালেদা জিয়া প্রমাণ করেছেন, তিনি অস্বাভাবিক পরিস্থিতি সৃষ্টি করে অশুভ শক্তিকে ক্ষমতায় আনতে চেয়েছিলেন। তবে সেটি প্রতিহত করা হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
একই বক্তব্যে তোফায়েল আহমেদ হেফাজতের বিরুদ্ধে কোরআন শরিফ পোড়ানোর অভিযোগ তোলেন। তার ভাষ্য ছিল, হেফাজত একদিকে ধর্মের কথা বলেছে, অন্যদিকে কোরআন শরিফ পুড়িয়েছে। মতিঝিলকে বাণিজ্যিক এলাকা উল্লেখ করে সেখানে হেফাজতকে সমাবেশ করতে দেওয়ায়ও বিস্ময় প্রকাশ করেন তিনি।
শাপলা গণহত্যার পর ইসলামপন্থী মহলে যখন ক্ষোভ ও শোক চলছিল, তখন তোফায়েল আহমেদ ঘটনাটিকে রাজনৈতিক বিজয় হিসেবে তুলে ধরেন। তার এই বক্তব্য হেফাজত ও ইসলামপন্থী মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করে।
শাপলা গণহত্যার পর ১৪ দলের আরেক বৈঠকে তোফায়েল আহমেদ দাবি করেন, হেফাজতকর্মীদের শাপলা চত্বর থেকে রক্তপাত ছাড়াই সরানো হয়েছিল। একইসঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, বিএনপি হেফাজতকে ব্যবহার করে নির্বাচিত সরকার উৎখাতের চেষ্টা করেছিল।
তার বক্তব্যে শাপলার হতাহত, নিখোঁজ ও দমন-পীড়নের অভিযোগ গুরুত্ব পায়নি। বরং পুরো ঘটনাকে তিনি বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির ষড়যন্ত্র হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। এই অবস্থান শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনের হেফাজতবিরোধী দমননীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল।
পরবর্তী বছরগুলোতেও হেফাজত প্রসঙ্গে তোফায়েল আহমেদের অবস্থানে বড় কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি। ২০২১ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরবিরোধী আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ইসলামপন্থীদের ওপর দমন-পীড়ন ও হতাহতের ঘটনার পর তিনি আবারও সংগঠনটির বিরুদ্ধে কঠোর বক্তব্য দেন।
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ২০২১ সালের ২৯ মার্চ কেন্দ্রীয় ১৪ দলের ভার্চুয়াল আলোচনা সভায় তোফায়েল আহমেদ হেফাজত নিয়ে কঠোর ভাষায় বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, “হেফাজতের মধ্যে অধিকাংশই জামায়াতের লোক। মামুনুল হকের পিতা কে ছিল? তাদের অন্যরা কারা? আপস করে কখনও লক্ষ্যে পৌঁছানো যায় না। রাজনীতিতে আজ যেটা শুরু হয়েছে, তা অশনি সংকেত। এটা বন্ধ করতে না পারলে, আমাদের সমস্ত শক্তি নিয়ে নামতে হবে। সনদ দেই আর যেভাবেই যতই খুশি করার চেষ্টা করি, তারা কিন্তু তাদের রাজনৈতিক দর্শন থেকে সরবে না। তারা যেখানে আছে সেখানেই থাকবে। তাদের খুশি করার কোনও সুযোগ নেই। রাজনীতির লক্ষ্যে পৌঁছাতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে।”
মাওলানা মামুনুল হক ও তার পরিবারকে ইঙ্গিত করে দেওয়া এই বক্তব্যে তোফায়েল আহমেদ হেফাজতের নেতৃত্বকে জামায়াতঘনিষ্ঠ হিসেবে তুলে ধরেন। একইসঙ্গে কওমি সনদের স্বীকৃতি ও সমঝোতার রাজনীতিকেও অকার্যকর বলে দাবি করে সংগঠনটির বিরুদ্ধে আরও কঠোর অবস্থানের পক্ষে মত দেন।
মোদিবিরোধী আন্দোলনের পর দেওয়া এই বক্তব্যে হেফাজত নিয়ে তোফায়েল আহমেদের অবস্থান আরও স্পষ্ট হয়। তিনি হেফাজতকে ধর্মীয় দাবিনির্ভর আন্দোলন হিসেবে না দেখে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে তুলে ধরেন। তার বক্তব্যে সংগঠনটির বিরুদ্ধে আরও কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত ছিল।
এর কয়েক সপ্তাহ পর, ২০২১ সালের ২০ এপ্রিল ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস উপলক্ষে ১৪ দলের আরেক ভার্চুয়াল আলোচনা সভায়ও তোফায়েল আহমেদ হেফাজত প্রশ্নে একই ধরনের বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, নীতির প্রশ্নে শক্তভাবে দাঁড়ালে ২০১৩ সালের ৫ মে’র পরই হেফাজত প্রশ্নে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত ছিল।
ওই বক্তব্যে তোফায়েল আহমেদ ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে হেফাজতের অবস্থানকে “নারকীয় ঘটনা” হিসেবে আখ্যা দেন। তার ভাষ্য ছিল, নীতির প্রশ্নে শক্ত থাকলে কোনো অশুভ শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে না। বায়তুল মোকাররম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও হাটহাজারীর ঘটনাও তিনি হেফাজতের প্রসঙ্গে টেনে আনেন।
তোফায়েল আহমেদের এসব বক্তব্যে শাপলা গণহত্যা ও হেফাজতে ইসলাম নিয়ে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট হয়। যেখানে ইসলামপন্থী মহল ৫ মে’কে শাপলা গণহত্যা হিসেবে স্মরণ করে, সেখানে আওয়ামী লীগের এই প্রবীণ নেতা ঘটনাটিকে রাজনৈতিক বিজয় হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন।
তার মৃত্যুতে রাজনৈতিক জীবনের নানা অধ্যায় নতুন করে আলোচনায় এলেও হেফাজতে ইসলাম, শাপলা গণহত্যা ও ইসলামপন্থীদের নিয়ে তার বক্তব্যগুলো ফ্যাসিবাদী দমননীতির পক্ষে দাঁড়ানো রাজনৈতিক অবস্থানের দলিল হিসেবেই আলোচিত হবে।











