ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ‘করবো কাজ, গড়বো দেশ’ গড়ার প্রত্যয়ে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে বিএনপি। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’, ইশতেহারের মূল স্লোগান।
বিএনপি তাদের ইশতেহারকে পাঁচটি অধ্যায়ে ভাগ করেছে, যেখানে ক্ষমতায় এলে আগামী পাঁচ বছরের জন্য মোট ৫১টি দফাকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৯টি প্রধান প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অঙ্গীকারও করেছে দলটি।
শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান এই ইশতেহার ঘোষণা করেন।
বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা রাষ্ট্রদর্শন, খালেদা জিয়ার ‘ভিশন-২০৩০’, তারেক রহমান ঘোষিত রাষ্ট্র মেরামতের ৩১ দফা এবং জুলাই জাতীয় সনদ বিএনপির এবারের ইশতেহারের ভিত্তি।
নির্বাচনি ৯ প্রধান প্রতিশ্রুতিতে জনকল্যাণ ও অর্থনৈতিক সংস্কারের বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিশ্রুতিগুলো হলো:
১. ফ্যামিলি কার্ড: প্রান্তিক ও নিম্নআয়ের পরিবারগুলোকে সুরক্ষা দিতে চালু করা হবে। প্রতি মাসে ২৫০০ টাকা বা সমমূল্যের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে। পরবর্তীতে এই সহায়তার পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে।
২. কৃষক কার্ড: কৃষকদের ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে প্রবর্তন করা হবে। এর আওতায় ভর্তুকি, সহজ শর্তে ঋণ, কৃষি বীমা এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় বাজারজাতকরণ ব্যবস্থা জোরদার করা হবে। মৎস্য ও পশুপালন খাতের উদ্যোক্তারা এই সুবিধা পাবেন।
৩. স্বাস্থ্যসেবা: দুর্নীতিমুক্ত ও মানবিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়তে সারাদেশে এক লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে। জেলা ও মহানগর পর্যায়ে মানসম্মত চিকিৎসা এবং মা ও শিশুর জন্য পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা হবে।
৪. শিক্ষা: বাস্তব দক্ষতা ও মূল্যবোধভিত্তিক নতুন শিক্ষানীতি প্রণয়ন করা হবে। প্রাথমিক শিক্ষায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তি সহায়তা এবং ‘মিড-ডে মিল’ চালু করা হবে।
৫. তরুণ ও কর্মসংস্থান: তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কারিগরি ও ভাষা দক্ষতা উন্নয়ন, স্টার্টআপ সহায়তা এবং বৈশ্বিক ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি করা হবে। মেধাভিত্তিক সরকারি নিয়োগ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
৬. ক্রীড়া: খেলাধুলাকে পেশা ও জীবিকার মাধ্যম হিসেবে গড়ে তুলতে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে আধুনিক ক্রীড়া অবকাঠামো ও প্রশিক্ষণ সুবিধা বাড়ানো হবে।
৭. পরিবেশ ও জলবায়ু: আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষ রোপণ এবং জনসম্পৃক্ততার মাধ্যমে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খনন বা পুনঃখনন করা হবে। আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চালু হবে।
৮. ধর্মীয় সম্প্রীতি: ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষায় সব ধর্মের উপাসনালয়ের নেতাদের জন্য সম্মানী ও প্রশিক্ষণভিত্তিক কল্যাণ ব্যবস্থা চালু করা হবে।
৯. ডিজিটাল অর্থনীতি: আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ে ‘পেপাল’ চালু করা হবে। এছাড়া ই-কমার্সের আঞ্চলিক হাব স্থাপন এবং ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ পণ্যের রপ্তানি সম্প্রসারণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
ইশতেহারের প্রধান ৫টি অধ্যায়
প্রথম অধ্যায়: রাষ্ট্র ব্যবস্থার সংস্কার ও সুশাসন
রাষ্ট্র কাঠামো সংস্কার, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা।
সাংবিধানিক সংস্কার, দুর্নীতি দমন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, জনপ্রশাসন, বিচার বিভাগ ও পুলিশ বাহিনীর সংস্কার।
স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার ওপর জোর।
দ্বিতীয় অধ্যায়: সামাজিক উন্নয়ন ও বৈষম্য নিরসন
দারিদ্র্য নিরসন, সামাজিক সুরক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন, কৃষি ও কৃষকের উন্নয়ন।
কর্মসংস্থান সৃষ্টি, যুব উন্নয়ন, শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা, শ্রমিক কল্যাণ।
পরিবেশ সংরক্ষণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পানিসম্পদ পরিকল্পনা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, প্রতিরক্ষা ও স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি।
তৃতীয় অধ্যায়: ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনর্গঠন ও ট্রিলিয়ন ডলারের লক্ষ্য
অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ণ, বিনিয়োগ ও সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি।
ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও পুঁজিবাজার সংস্কার।
জ্বালানি খাত, তথ্যপ্রযুক্তি, ব্লু ইকোনমি ও সৃজনশীল অর্থনীতি উন্নয়নের মাধ্যমে টেকসই রাজস্ব ব্যবস্থা।
চতুর্থ অধ্যায়: অঞ্চলভিত্তিক সুষম উন্নয়ন ও পরিকল্পিত নগর
আঞ্চলিক বৈষম্য দূরীকরণ, চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে প্রতিষ্ঠা।
উত্তরাঞ্চল, হাওর-বাওড় ও উপকূলীয় অঞ্চলের আলাদা উন্নয়ন পরিকল্পনা, পরিকল্পিত নগরায়ণ।
ঢাকাকে নিরাপদ ও টেকসই মেগাসিটি হিসেবে গড়ে তোলা।
পঞ্চম অধ্যায়: ধর্ম, সংস্কৃতি ও গণমাধ্যম
ধর্মীয় সম্প্রীতি রক্ষা, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অধিকার সুরক্ষা।
ক্রীড়া, শিল্প ও সংস্কৃতির বিকাশ, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা।
সমাজের নৈতিকতা পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে মানবিক রাষ্ট্র গঠন।
বিএনপি বলছে, এটি কেবল নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি নয়, বরং একটি ‘নতুন সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় চুক্তি’। প্রতিশোধ নয়, ন্যায় ও মানবিকতায় বিশ্বাসী দলটি। ক্ষমতার চেয়ে জনগণের অধিকারই তাদের রাজনীতির মূল কেন্দ্রবিন্দু। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং দুর্নীতি ও সন্ত্রাসমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার করেছে দলটি।











