সীমান্তে বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে বাড়তে থাকা উত্তেজনা এবং বিএসএফের পুশইন ঠেকাতে বিজিবির কঠোর অবস্থানের মধ্যেই ভারতের নয়াদিল্লিতে বিজিবি-বিএসএফ সীমান্ত বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।
আগামীকাল সোমবার (৮ জুন) থেকে শুরু হওয়া চার দিনব্যাপী এই বৈঠক চলবে ১১ জুন পর্যন্ত। মহাপরিচালক বা ডিজি পর্যায়ের ৫৭তম এই বৈঠকে সীমান্ত নিরাপত্তা ও নজরদারির জন্য ভারতের ড্রোন ব্যবহারের বিষয়টিসহ ১৬টি গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা তুলে ধরবে বিজিবি।
বিজিবি সদর দপ্তর সূত্র জানায়, এবারের বৈঠকে সীমান্ত হত্যা ও পুশইন বন্ধের দাবি প্রথম এজেন্ডায় থাকছে। বিগত দুই বছরে বিএসএফ বাংলাদেশে ২২শ’র বেশি মানুষকে পুশইন করেছে। এর মধ্যে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী ও ভারতীয় নাগরিকও রয়েছে।
সূত্র জানায়, গত মাস থেকে শুরু করে চলতি জুন মাসে বিএসএফ বাংলাদেশের বিশেষ করে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে দুই শ’র বেশি মানুষকে পুশইন করার চেষ্টা করেছে। পুশইন নিয়ে বিএসএফের কাছে ব্যাখ্যা চাইবে বিজিবি।
বিজিবি সদর দপ্তর সূত্র জানায়, বিএসএফ বা ভারতীয় নাগরিকদের মাধ্যমে অবৈধভাবে ড্রোন ও হেলিকপটার প্রায়ই বাংলাদেশের আকাশসীমায় প্রবেশ করছে। বিএসএফ সীমান্তের নদী ও পাহাড়বেষ্টিত দুর্গম এলাকায় নজরদারির জন্য ড্রোন উড়ায়। দেশের উত্তরাঞ্চলের বিশেষ করে পঞ্চগড়, লালমনিরহাট ও খাগড়াছড়ির পাহাড়ি এলাকায় ভারতীয় হেলিকপটার প্রবেশের ঘটনাও ঘটেছে। বাংলাদেশের আকাশসীমায় এসব অনুপ্রবেশ বন্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তাব দেবে বিজিবি।
বাংলাদেশ নেটওয়ার্ক প্রকল্পের আওতায় পাটগ্রাম-দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা অপটিক্যাল ফাইবার কেবল স্থাপন প্রকল্পের জন্য তিনবিঘা করিডোর ব্যবহারের এজেন্ডাও উত্থাপন করবে বিজিবি। ছিটমহল দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা গ্রামে অপটিক্যাল ফাইবার স্থাপন করতে হলে এর সংযোগ সড়ক তিনবিঘা করিডোর ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।
বৈঠকের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা হলো, আগরতলা থেকে আখাউড়ামুখী চারটি খাল দিয়ে ত্রিপুরার শিল্পবর্জ্য আসার বিষয়টি। এই শিল্পবর্জ্যের কারণে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কয়েকটি উপজেলার নদী, নালা ও খালের পানির স্রোত কমে গেছে। ফলে বর্ষা মৌসুমে ওই এলাকায় বন্যার সৃষ্টি হয়।
আগরতলার শিল্পবর্জ্য ত্রিপুরার চারটি খাল দিয়ে বাংলাদেশের আখাউড়ায় প্রবেশ করে। এতে এলাকার ফসলি জমির উর্বরতা কমে গেছে এবং পরিবেশও নষ্ট হচ্ছে। এ কারণে আখাউড়ায় চার খালের মুখে চারটি বর্জ্য শোধনাগার বা ইটিপি স্থাপন করতে চায় বাংলাদেশ। এই ইটিপি স্থাপনের খরচ ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে বহন করার প্রস্তাব দেবে বিজিবি।
বিজিবি সদর দপ্তর সূত্র জানায়, দুই দেশের সীমান্ত পর্যায়ের এই বৈঠকে প্রথমবারের মতো গণমাধ্যমের বিষয়ে একটি প্রস্তাব তুলবে বিজিবি। এজেন্ডায় বলা হয়েছে, সম্প্রতি বাংলাদেশের সীমান্ত নিয়ে ভারতীয় গণমাধ্যমে নেতিবাচক তথ্য প্রচার করা হচ্ছে। এমনকি ভারতের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাংলাদেশের সীমান্ত সম্পর্কে উসকানিমূলক ও মিথ্যা তথ্য দিয়ে বিভিন্ন ভিডিও বানিয়ে প্রচার করা হচ্ছে। এতে দুই দেশের সীমান্ত এলাকার জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিরূপ প্রভাব পড়ছে। এসব মিথ্যা তথ্য প্রচার বন্ধ করতে ভারতের সম্প্রচার ও তথ্য মন্ত্রণালয়কে বিএসএফের মাধ্যমে অনুরোধ জানাবে বিজিবি।
এদিকে ভারতের নর্থইস্ট নিউজ এক প্রতিবেদনে বিএসএফের বরাতে জানিয়েছে, বৈঠকে তারা বাংলাদেশি নাগরিকদের হাতে বিএসএফ সদস্য ও ভারতীয়দের ওপর কথিত হামলা এবং সীমান্ত বেড়া ক্ষতিগ্রস্ত করার বিষয়গুলো উত্থাপন করবে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশি নাগরিকদের মাধ্যমে বিএসএফ সদস্য ও ভারতীয় বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলা প্রতিরোধ, আন্তঃসীমান্ত অপরাধ দমন, ভারতে অপরাধীদের প্রবেশ রোধ, সীমান্ত বেড়া নির্মাণ, বাংলাদেশে থাকা ভারতীয় বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া, সীমান্ত অবকাঠামো উন্নয়ন, দুই বাহিনীর মধ্যে আস্থা বাড়ানোর পদক্ষেপ এবং সংস্কার-সংক্রান্ত একাধিক বিষয় বৈঠকে তুলবে বিএসএফ।
চার দিনব্যাপী এই বৈঠকে বাংলাদেশের বিজিবির ডিজি মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী ১৫ সদস্যের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন। ভারতীয় প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন বিএসএফ প্রধান প্রবীণ কুমার।










