spot_img
spot_img

তরুণদের ‘ককরোচ’ আন্দোলনের চাপে মোদি সরকার

ভারতে তরুণ প্রজন্মের ক্ষোভ ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হওয়া এক ব্যঙ্গাত্মক উদ্যোগ এখন জাতীয় রাজনীতিতে আলোড়ন তুলেছে। বেকারত্বের ঊর্ধ্বগতি এবং শিক্ষা ব্যবস্থার ধারাবাহিক অনিয়মে হতাশ যুবকদের সমর্থনে গড়ে ওঠা কাল্পনিক সংগঠন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি অল্প সময়েই ব্যাপক আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে। অনেকে সংগঠনটিকে ‘তেলাপোকা পার্টি’ নামেও ডাকছেন।

মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে ইনস্টাগ্রামে সিজেপির অনুসারীর সংখ্যা ২ কোটি ২০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে বলে দাবি করা হচ্ছে। এই সংখ্যা ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) অফিশিয়াল অ্যাকাউন্টের ফলোয়ার সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে গেছে বলেও দাবি করা হচ্ছে। এই অভাবনীয় উত্থান ভারতের রাজনৈতিক মহলে কৌতূহল ও উদ্বেগ, দুটোই তৈরি করেছে।

ঘটনার সূত্রপাত মে মাসের মাঝামাঝি। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি সূর্যকান্ত এক শুনানির সময় কিছু বেকার যুবককে ‘পরজীবী’ ও ‘তেলাপোকা’র সঙ্গে তুলনা করেছেন, এমন অভিযোগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। পরে বিচারপতি সূর্যকান্ত বলেন, তার মন্তব্য ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। কিন্তু এর আগেই ক্ষুব্ধ তরুণদের প্রতিক্রিয়া তীব্র আকার নেয়।

এই ক্ষোভকে প্রতীকে রূপ দেন আমেরিকার বোস্টন ইউনিভার্সিটির গ্র্যাজুয়েট ও রাজনৈতিক যোগাযোগ কৌশলবিদ অভিজিৎ দিপকে। ব্যঙ্গের সুরে তিনি ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র নামে একটি ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম চালু করেন। সেখানে অবহেলিত, বেকার ও হতাশ তরুণদের পক্ষে কণ্ঠস্বর তোলার ঘোষণা দেওয়া হয়। অল্প সময়েই এটি ভাইরাল হয়ে পড়ে।

অনলাইন জনপ্রিয়তা দ্রুত বাস্তব রূপ নেয়। আমেরিকা থেকে দেশে ফিরে শনিবার (৬ জুন) দিল্লির যন্তর-মন্তরে বিশাল যুব সমাবেশের ডাক দেন অভিজিৎ দিপকে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস ও শিক্ষা ব্যবস্থার অনিয়মের প্রতিবাদে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবি করা হয়।

সমাবেশে অংশগ্রহণকারীদের অনেকেই মাথায় তেলাপোকার মুখোশ পরে এবং হাতে ‘আমিই তেলাপোকা’ লেখা প্ল্যাকার্ড নিয়ে উপস্থিত হন। অনলাইনের সমর্থন যে বাস্তব রাজনৈতিক জমিনেও প্রভাব ফেলতে পারে, এই সমাবেশ ছিল তার প্রথম বড় প্রমাণ।

বিশ্লেষকদের মতে, এটি সরকারের জন্য একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা। ভারতের প্রায় ৬৫ শতাংশ মানুষের বয়স ৩৫ বছরের নিচে। অথচ দেশটির নীতিনির্ধারকদের গড় বয়স ৬০ থেকে ৭০ বছরের মধ্যে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বয়সও ৭৫। এই প্রজন্মগত ব্যবধান রাজনীতির সঙ্গে তরুণ সমাজের দূরত্ব আরও বাড়িয়েছে বলে মনে করছেন অনেকে।

অর্থনীতির আকার বড় হলেও উচ্চশিক্ষিত যুবকদের মধ্যে বেকারত্বের হার প্রায় ২৯ শতাংশে পৌঁছেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর সঙ্গে বারবার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বাড়িয়েছে। ফলে ‘তেলাপোকা’ প্রতীকে গড়ে ওঠা এই প্রতিবাদ অনেকের কাছে বৃহত্তর ক্ষোভের প্রতিফলন হয়ে উঠেছে।

দক্ষিণ এশিয়ার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাও বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। বাংলাদেশ ও নেপালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক তরুণদের আন্দোলন দ্রুত বিস্তার লাভ করে সরকারবিরোধী শক্তিতে রূপ নিয়েছিল। সেই উদাহরণ টেনে অনেকে বলছেন, ভারতেও পরিস্থিতি অবহেলার সুযোগ নেই।

যদিও সিজেপি অহিংস আন্দোলনের কথাই বলছে, তবুও এর ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর নজর কেড়েছে। ইতোমধ্যে কয়েকজন প্রভাবশালী নেতাও এই উদ্যোগের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন।

প্রথমদিকে বিজেপি একে ‘সামাজিক মাধ্যমে তৈরি কৌতুক’ কিংবা ‘বিরোধীদের কৌশল’ বলে উড়িয়ে দিলেও, দিল্লির রাজপথে তরুণদের জোরালো উপস্থিতি এবং অনলাইনে বিস্তৃত সমর্থন মোদি সরকারের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।

সূত্র: রয়টার্স

spot_img
spot_img
spot_img

সর্বশেষ