spot_img
spot_img

মুক্তিযুদ্ধ কোনো রাজনৈতিক দলের যুদ্ধ ছিল না: ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি

ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম বলেছেন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ ছিল জনতার যুদ্ধ, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার যুদ্ধ এবং মানুষের ভোটাধিকার, মানবিক মর্যাদা ও সম-অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। এটি কোনো রাজনৈতিক দলের যুদ্ধ ছিল না, বরং জনগণের রায়কে অগ্রাহ্য করে গণতন্ত্রকে পদদলিত করার ফলেই মুক্তিযুদ্ধের সূচনা হয়।

শুক্রবার (৭ আগস্ট) ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের কুর্মিটোলা গলফ ক্লাবে বাংলাদেশ লিবারেশন ওয়ার কোর্সেস ফাউন্ডেশন আয়োজিত বাংলাদেশ লিবারেশন ওয়ার কোর্সেস-এর ৫৪তম কমিশনিং ও ফেলোশিপ ডে উদযাপন অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।

হাফিজ উদ্দিন বলেন, স্বাধীনতার পর যারা রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছিলেন, তারা অনেকেই মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চিত্র জনগণের সামনে তুলে ধরতে চাননি। এ কারণে স্বাধীনতা যুদ্ধের অসংখ্য ঘটনা, ত্যাগ ও বীরত্বগাঁথা এখনও যথাযথভাবে ইতিহাসে স্থান পায়নি, সেগুলো এখনও সাধারণ মানুষের কাছে অজানা রয়ে গেছে এবং সেই ইতিহাসকে সঠিকভাবে লিপিবদ্ধ করতে হবে ও জনগণের সামনে তুলে ধরতে হবে।

তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর এমন ধারণা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হয়েছে যে, কেবল কয়েকটি ভাষণের মাধ্যমেই দেশ স্বাধীন হয়েছে। অথচ প্রকৃতপক্ষে অসংখ্য তরুণ, সাধারণ পরিবারের সন্তান এবং সৈনিক জীবন উৎসর্গ করে দেশকে স্বাধীন করেছেন। মহান মুক্তিযুদ্ধ ছিল গণতন্ত্র, মানবিক মর্যাদা, সম-অধিকার এবং বৈষম্যহীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম।

তিনি আরও বলেন, নতুন প্রজন্মকে জানতে হবে- কীভাবে দেশ স্বাধীন হয়েছে এবং মুক্তিযোদ্ধাদের স্বপ্ন কী ছিল। তারা যেন সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে কাজ করে এবং একটি সুখী, সমৃদ্ধ ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তোলে।

ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বলেন, দেশে আর কোনো স্বৈরশাসনের সৃষ্টি হওয়া উচিত নয়। সরকার ভুল করলে জনগণ গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে তা সংশোধন করবে, কিন্তু কোনো অবস্থাতেই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ধ্বংস করা উচিত নয়। মুক্তিযুদ্ধকালীন বিভিন্ন ঘটনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগ ও দেশপ্রেমই ছিল তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি।

তিনি বলেন, শারীরিক যোগ্যতার কারণে অনেককে যুদ্ধের জন্য নেওয়া সম্ভব না হলে তারা কান্নায় ভেঙে পড়ত এবং দেশের জন্য লড়াই করার সুযোগ চেয়ে তারা নিজ গাড়ির সামনে শুয়ে পড়ত, যাতে তাদেরকে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার সুযোগ দেওয়া হয়। এসব দৃশ্য মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের এক অনন্য ও গৌরবময় অধ্যায় বলে উল্লেখ করেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী জনগণের ভোটের প্রতি কোনো সম্মান দেখায়নি। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে এ দেশের মানুষ ছয় দফার ভিত্তিতে আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে রায় দিলেও সেই গণরায় উপেক্ষা করা হয়। পরবর্তীতে পাকবাহিনী নিরস্ত্র মানুষের ওপর গণহত্যা চালায় এবং ভয়াবহ নির্যাতন শুরু করে। এমন পরিস্থিতিতে যখন রাজনৈতিক নেতৃত্বের পক্ষ থেকে জনগণকে আশ্বস্ত করার বা দিকনির্দেশনা দেওয়ার মতো কার্যকর পরিস্থিতি ছিল না, তখন ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও ইপিআরের বাঙালি সৈনিক এবং কর্মকর্তারা বিদ্রোহ ঘোষণা করে প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু করেন। ১৯৭১ সালের মার্চে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও ইপিআরের সদস্যরা যদি পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ না করতেন, তাহলে বাংলাদেশ স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস অন্যরকম হতে পারতো।

হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, দেশের বিভিন্ন ক্যান্টনমেন্টে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ব্যাটালিয়নগুলো প্রতিরোধ গড়ে তোলে এবং সীমিত সংখ্যক সৈনিকের নেতৃত্বে হাজার হাজার ছাত্র-যুবক মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন।

তিনি বলেন, প্রায় পাঁচ হাজার সৈনিকের আহ্বানে সাড়া দিয়ে প্রায় ৮০ হাজার তরুণ মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন এবং মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা এক সময় প্রায় এক লাখে পৌঁছে যায়। এসব যোদ্ধাকে প্রশিক্ষণ দিয়ে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করেছিলেন ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও ইপিআরের সৈনিক ও অফিসাররা। তিনি এ সকল ইতিহাস সঠিকভাবে লিপিবদ্ধ করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। এ সময় তিনি শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের অবদান ও বলিষ্ঠ নেতৃত্বের কথা উল্লেখ করে বলেন, বিশেষ করে মেজর জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা জাতিকে উদ্দীপ্ত করেছে। তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষেও ঘোষণা দিয়েছেন।

তিনি আরও বলেন, মুক্তিযোদ্ধারা কোনো ব্যক্তিগত কৃতিত্ব অর্জনের জন্য যুদ্ধ করেননি বরং দেশের অস্তিত্ব, মানুষের জীবন এবং মা-বোনের সম্মান রক্ষার জন্য অস্ত্র হাতে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী মনে করেছিল বাঙালিরা যুদ্ধ করতে পারবে না। কিন্তু ১৯৭১ সালে বাঙালি সৈনিক ও মুক্তিযোদ্ধারা তাদের সাহস, দক্ষতা ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে সেই ধারণা ভুল প্রমাণ করেন।

spot_img
spot_img
spot_img

সর্বশেষ