বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের অন্যতম প্রতীক শহীদ আবরার ফাহাদ। তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের নেতা ছিলেন না। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের একজন শিক্ষার্থী ছিলেন। কিন্তু ভারতের বাংলাদেশবিষয়ক আধিপত্যবাদী নীতি এবং ভারতকে একের পর এক সুবিধা দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন তিনি। এর কয়েক দিনের মধ্যেই তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা তাকে পিটিয়ে হত্যা করে।
২০১৯ সালের ৭ অক্টোবর বুয়েটের শেরেবাংলা হল থেকে ২১ বছর বয়সী আবরারের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মামলার তদন্ত ও আদালতের নথিতে উঠে আসে, তার ফেসবুক পোস্ট নিয়ে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে আলোচনা হয়েছিল। পরে তাকে ডেকে নিয়ে মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট পরীক্ষা করা হয়। ‘শিবির’ সন্দেহে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ ও দীর্ঘ সময় ধরে নির্যাতন করা হয়।
আবরার হত্যা শুধু বুয়েটের একটি হলের হত্যাকাণ্ড হয়ে থাকেনি। বর্তমান ভারতে পালিয়ে থাকা ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনামলে ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের দখলদারত্ব, ভিন্নমতের শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতন এবং রাজনৈতিক তকমা দিয়ে দমন করার ভয়াবহ চিত্রও সামনে নিয়ে আসে এই ঘটনা।
ভারতকে দেওয়া সুবিধা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন আবরার
কুষ্টিয়ার আবরার ফাহাদ কুষ্টিয়া জিলা স্কুল ও নটর ডেম কলেজে পড়াশোনা শেষে বুয়েটে ভর্তি হন। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়মিত মতামত দিতেন তিনি। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নিয়েও তার একাধিক পোস্ট ছিল।
২০১৯ সালের ৫ অক্টোবর ভারত সফরে দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক করেন শেখ হাসিনা। ওই সফরে দুই দেশের মধ্যে কয়েকটি চুক্তি ও সমঝোতা হয়।
এর মধ্যে ছিল ভারতের পণ্য পরিবহনে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহারের পদ্ধতি এবং ত্রিপুরার সাব্রুম শহরে পানীয় জল সরবরাহের জন্য ফেনী নদী থেকে ভারতকে ১ দশমিক ৮২ কিউসেক পানি উত্তোলনের সুযোগ। একই সময়ে বাংলাদেশ হয়ে ভারতের ত্রিপুরায় এলপিজি পরিবহনের ব্যবস্থাও সামনে আসে।
এসব সিদ্ধান্ত নিয়ে ৫ অক্টোবর ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন আবরার। কয়েকটি ঐতিহাসিক ঘটনার উদাহরণ টেনে তিনি প্রশ্ন তোলেন, বাংলাদেশ ভারতকে পানি, বন্দর ও জ্বালানি খাতে সুবিধা দিচ্ছে, এর বিপরীতে বাংলাদেশ কী পাচ্ছে।
এর আগেও ফারাক্কা, অভিন্ন নদীর পানি এবং ভারতে ইলিশ পাঠানোর মতো বিষয় নিয়ে সমালোচনামূলক পোস্ট দিয়েছিলেন তিনি।
আবরারের প্রশ্ন ছিল বাংলাদেশের স্বার্থ নিয়ে। দেশের নদী, বন্দর ও সম্পদ ব্যবহারের সিদ্ধান্তে বাংলাদেশের স্বার্থই আগে থাকবে, এটাই ছিল তার বক্তব্যের মূল কথা। ভারতকে একের পর এক সুবিধা দেওয়ার বিপরীতে বাংলাদেশের প্রাপ্তি কোথায়, সেই প্রশ্নই তিনি তুলেছিলেন।
‘শিবির’ সন্দেহে ডেকে নিয়ে নির্যাতন
আবরারের ফেসবুক পোস্ট ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের নজরে আসে। ৬ অক্টোবর রাতে তাকে শেরেবাংলা হলের ২০১১ নম্বর কক্ষে ডেকে নেওয়া হয়।
মামলার তদন্ত ও আদালতের নথি অনুযায়ী, সেখানে তার মোবাইল ফোন নিয়ে ফেসবুক ও মেসেঞ্জার পরীক্ষা করা হয়। তিনি ইসলামী ছাত্রশিবিরের সঙ্গে যুক্ত কি না, তা জানতে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এরপর ক্রিকেট স্টাম্পসহ বিভিন্ন বস্তু দিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে তাকে মারধর করেন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা।
নির্যাতনে গুরুতর আহত আবরারের মৃত্যু হয়। ৭ অক্টোবর ভোরে হলের সিঁড়ির কাছ থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
বিচারপ্রক্রিয়াতেও উঠে আসে, শিবিরের সঙ্গে সম্পৃক্ততার সন্দেহেই আবরারকে জিজ্ঞাসাবাদ ও নির্যাতন করা হয়েছিল।
হাসিনা আমলে বিরোধী মতের মানুষকে ‘জামায়াত-শিবির’ তকমা দিয়ে হেনস্তা ও নির্যাতনের বহু ঘটনা ঘটেছে। বুয়েটের আবাসিক হলগুলোতেও ছাত্রলীগের নিয়ন্ত্রণ ছিল প্রবল। শিক্ষার্থীদের ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ, রাজনৈতিক পরিচয় যাচাই, মারধর ও ভয়ভীতি দেখানোর ঘটনাও ছিল নিয়মিত।
আবরারের ক্ষেত্রেও একই তকমা ব্যবহার করা হয়। ভারতীয় আধিপত্যবাদ নিয়ে প্রশ্ন তোলার পর তাকে ডেকে নেওয়া হয়, ফোন তল্লাশি করা হয় এবং ‘শিবির’ সন্দেহে নির্যাতন করা হয়। সেই নির্যাতনই শেষ পর্যন্ত তার মৃত্যুর কারণ হয়।
ছাত্রলীগের দখলে হল, নির্যাতন ছিল নিয়মিত
আবরারকে যারা হত্যা করেছে, তারা সবাই বুয়েটের শিক্ষার্থী এবং ছাত্রলীগের নেতাকর্মী ছিল। তদন্তে ২৫ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়।
কিন্তু কয়েক ঘণ্টা ধরে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে একজন শিক্ষার্থীকে আটকে রেখে তার মোবাইল পরীক্ষা, জিজ্ঞাসাবাদ ও মারধর করার সাহস তারা কোথা থেকে পেয়েছিল, আবরার হত্যার পর সেই প্রশ্নও সামনে আসে।
বুয়েটের আবাসিক হলগুলোতে ছাত্রলীগের দখল ও নির্যাতনের কথা তখন শিক্ষার্থীরা প্রকাশ্যে বলতে শুরু করেন। কক্ষে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ, রাজনৈতিক পরিচয় যাচাই, মারধর এবং ভয়ভীতি দেখানোর ঘটনাও সামনে আসে।
এ চিত্র শুধু বুয়েটের ছিল না। হাসিনার দীর্ঘ শাসনে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের দখলদারত্ব, হল নিয়ন্ত্রণ, বিরোধী মতের শিক্ষার্থীদের মারধর এবং রাজনৈতিক তকমা দিয়ে নির্যাতনের বহু ঘটনা ঘটেছে।
আবরার হত্যার পর তাই শুধু হত্যাকারীদের শাস্তির দাবি ওঠেনি। ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের দখলদারত্ব ও নির্যাতনের রাজনীতির বিরুদ্ধেও শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নামেন।
দেশজুড়ে প্রতিবাদ, বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ
আবরার হত্যার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বুয়েটসহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তীব্র প্রতিবাদ শুরু হয়। শিক্ষার্থীরা হত্যাকারীদের শাস্তি, আবাসিক হলে নির্যাতন বন্ধ এবং দলীয় ছাত্ররাজনীতির প্রভাব থেকে ক্যাম্পাস মুক্ত করার দাবি জানান।
আন্দোলনের মুখে ২০১৯ সালের ১১ অক্টোবর বুয়েটে সব ধরনের সাংগঠনিক ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।
আবরারের বাবা বরকত উল্লাহ হত্যার ঘটনায় মামলা করেন। তদন্ত শেষে পুলিশ ২৫ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয়।
২০২১ সালের ৮ ডিসেম্বর ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল ২০ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং পাঁচজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। পরে মামলাটি হাইকোর্টে যায়। ২০২৫ সালের ১৬ মার্চ হাইকোর্টও ২০ জনের মৃত্যুদণ্ড এবং পাঁচজনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল রাখেন।
তবে হত্যাকাণ্ডের সাত বছর পরও বিচারপ্রক্রিয়া পুরোপুরি শেষ হয়নি। ২০২৬ সালের ৭ অক্টোবর পর্যন্ত দণ্ডিত কয়েকজন আসামির আপিল সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে বিচারাধীন রয়েছে।
আবরারের স্মৃতি মুছে দিতে চেয়েছিল হাসিনা সরকার
আবরার হত্যার পর তার নাম দ্রুত ভারতীয় আধিপত্যবাদবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। বিভিন্ন কর্মসূচিতে তার ছবি ও বক্তব্য ব্যবহার হতে থাকে।
২০২০ সালে আবরারের প্রথম শাহাদাতবার্ষিকীতে রাজধানীর পলাশীতে তার স্মরণে ‘আগ্রাসনবিরোধী আট স্তম্ভ’ নির্মাণ করা হয়। কিন্তু ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই হাসিনা সরকারের অধীন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন সেটি গুঁড়িয়ে দেয়।
তবে আবরারের নাম ও স্মৃতি মুছে যায়নি।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনের পতনের পর আবরার আবারও সামনে আসেন ভারতীয় আধিপত্যবাদবিরোধী প্রতিবাদের প্রতীক হিসেবে।
২০২৫ সালের ৭ অক্টোবর পলাশী মোড়ে নতুন করে ‘আগ্রাসনবিরোধী আট স্তম্ভ’ উদ্বোধন করা হয়। সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র, গণপ্রতিরক্ষা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা, দেশীয় শিল্প-কৃষি-নদী-বন-বন্দর রক্ষা, সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা ও মানবিক মর্যাদা, এই আট বিষয়কে সেখানে তুলে ধরা হয়েছে।
২০২৫ সালে ‘প্রতিবাদী তারুণ্য’ ক্ষেত্রে আবরার ফাহাদকে মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কারও দেওয়া হয়। তার মা রোকেয়া খাতুন ছেলের পক্ষে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক রাষ্ট্রীয় সম্মান গ্রহণ করেন।
ভারতীয় আধিপত্যবিরোধী প্রতিবাদের শহীদ
আবরার ফাহাদ কোনো রাজনৈতিক দলের নেতা ছিলেন না। তিনি ছিলেন একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী। কিন্তু তিনি এমন একটি প্রশ্ন তুলেছিলেন, যে প্রশ্ন তখন বাংলাদেশের রাজনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল: ভারতকে একের পর এক সুবিধা দেওয়ার বিনিময়ে বাংলাদেশ কী পাচ্ছে?
এই প্রশ্ন তোলার পর তাকে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ডেকে নেয়। ‘শিবির’ সন্দেহে জিজ্ঞাসাবাদ করে। দীর্ঘ সময় নির্যাতন করে। শেষ পর্যন্ত হত্যা করে।
আবরার হত্যার পর সাত বছর পার হয়েছে। কিন্তু ফেনীর পানি, বন্দর, অভিন্ন নদী, সীমান্ত, বাংলাদেশের সম্পদ এবং দেশের রাজনীতিতে ভারতের প্রভাব নিয়ে যে প্রশ্ন তিনি তুলেছিলেন, সেসব প্রশ্ন এখনও বাংলাদেশের রাজনীতিতে রয়েছে।
আর এ কারণেই শহীদ আবরার ফাহাদ শুধু একটি হত্যা মামলার নাম নন। ভারতীয় আধিপত্যবাদ ও হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের তরুণদের প্রতিবাদের অন্যতম প্রধান প্রতীক হয়ে আছেন তিনি।











