জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ জ্বালানি খাতকে চিহ্নিত মাফিয়া ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর হাতে তুলে দিয়ে রাষ্ট্র ও জনগণকে জিম্মি করার গভীর চক্রান্ত চলছে বলে অভিযোগ করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। এই উদ্যোগকে দেশবিরোধী ও জনস্বার্থবিরোধী আখ্যায়িত করে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে রাজপথে কঠোর আন্দোলনের মাধ্যমে তা রুখে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে দলটি।
সোমবার (১০ আগস্ট) এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও সদস্যসচিব আখতার হোসেন এক যৌথ বিবৃতিতে এ হুঁশিয়ারি দেন। দলটির দপ্তর সেলের সদস্য সাদিয়া ফারজানা দিনার পাঠানো স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে এসব কথা বলা হয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ জ্বালানি খাতকে চিহ্নিত মাফিয়া ব্যবসায়ীদের হাতে তুলে দিয়ে রাষ্ট্র ও জনগণকে জিম্মি করার একটি গভীর দেশবিরোধী অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে।
এনসিপি বলেছে, গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, আইনি বাধ্যবাধকতা ও রাষ্ট্রীয় নিয়মকানুনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ঋণ জালিয়াতি, ব্যাংক লুটপাট ও অর্থপাচারের দায়ে অভিযুক্ত একটি বিতর্কিত মাফিয়া ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর হাতে জাতীয় পেট্রোলিয়াম বাণিজ্যের সিংহভাগ নিয়ন্ত্রণের চাবি তুলে দেওয়ার তোড়জোড় চলছে।
দলটি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, দেশের জ্বালানি সার্বভৌমত্ব নিয়ে যেকোনো চক্রান্ত জনগণকে সঙ্গে নিয়ে কঠোরভাবে রুখে দেওয়া হবে।
বিবৃতিতে বলা হয়, মাফিয়াদের হাতে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা তুলে দেওয়ার এই ষড়যন্ত্র ফ্যাসিবাদী শাসনের পুরোনো ও অন্ধকার মডেলেরই হুবহু পুনরাবৃত্তি।
এনসিপি বলেছে, বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার যেভাবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে বিশেষ সুবিধাভোগী মাফিয়াদের হাতে তুলে দিয়ে দেশকে দেউলিয়া এবং লুটেরাদের স্বর্গরাজ্যে পরিণত করেছিল, আজও সেই একই বিপজ্জনক প্রেসক্রিপশন বাস্তবায়নের অপচেষ্টা করা হচ্ছে।
দলটির দাবি, বিগত দিনে কুইক রেন্টালের নামে ও ‘দায়মুক্তি আইনের’ সুযোগ নিয়ে ইচ্ছামতো বিদ্যুতের দাম নির্ধারণ এবং ক্যাপাসিটি চার্জের মাধ্যমে জনগণের হাজার হাজার কোটি টাকা লুট করে বিদেশে পাচারের মচ্ছব চালানো হয়েছে। এখন আবার জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত জ্বালানি খাতকেও একই মাফিয়াতন্ত্রের শিকারে পরিণত করার নীলনকশা আঁকা হচ্ছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, মাত্র দুই দিনের সময় বেঁধে দিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন, বিপিসির চেয়ারম্যান অপসারণ এবং মাত্র চার দিনে নীতিমালার খসড়া তৈরির মতো নজিরবিহীন তাড়াহুড়া প্রমাণ করে, এটি কোনো সাধারণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং মাফিয়া ব্যবসায়ী তোষণের নগ্ন চক্রান্ত।
এনসিপি বলেছে, আমদানিনির্ভর ও কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই জ্বালানি খাতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) নিজস্ব শোধন, সংরক্ষণ ও বিপণন সক্ষমতা বৃদ্ধি না করে গুরুতর দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত মাফিয়া গোষ্ঠীর হাতে বাজার নিয়ন্ত্রণের সুযোগ দেওয়া চরম জনস্বার্থবিরোধী এবং জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে প্রত্যক্ষ বিশ্বাসঘাতকতা।
দলটি বলেছে, এলপিজি খাতকে বেসরকারি আমদানিকারকদের হাতে তুলে দিয়ে মাফিয়া সিন্ডিকেটের কাছে সাধারণ জনগণকে যেভাবে জিম্মি করা হয়েছিল, ঠিক একই কৌশলে ডিজেল, পেট্রোল ও অকটেনের মতো জরুরি জ্বালানির সরবরাহ ও দর নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা মাফিয়াদের হাতে ছেড়ে দেওয়ার বন্দোবস্ত করা হচ্ছে।
এনসিপির মতে, এটি স্পষ্টতই জনগণকে জিম্মি করে মুনাফা লোটা এবং রাষ্ট্রের নিরাপত্তাকে চরম ঝুঁকির মধ্যে ফেলার অপপ্রয়াস।
বিবৃতিতে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলা হয়, কোনো অবস্থাতেই বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মতো রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত জরুরি খাতকে মাফিয়া বা লুটেরা ব্যবসায়ীদের মুনাফা লোটার হাতিয়ার হতে দেওয়া হবে না। মাফিয়া ব্যবসায়ীদের সঙ্গে রাতের অন্ধকারে আঁতাত কিংবা জনগণের সম্পদ নিয়ে কোনো গোপন রফাও মেনে নেওয়া হবে না।
এনসিপি দাবি জানিয়েছে, অবিলম্বে এই ‘আত্মঘাতী’ প্রাইভেটাইজেশন নীতি ও অপপ্রক্রিয়া বাতিল করে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের হাতেই জ্বালানি খাতের পূর্ণ পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে হবে।
একই সঙ্গে বিগত দিনে বেসরকারি খাতের হাতে ছেড়ে দিয়ে লুটপাটের যে সাম্রাজ্য গড়ে তোলা হয়েছিল, সেখান থেকে পুরো বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে বের করে এনে সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণে ফিরিয়ে আনার দাবিও জানিয়েছে দলটি।
বিবৃতির শেষে এনসিপি বলেছে, জনগণের অধিকার ও দেশের সার্বভৌমত্ব বিকিয়ে দিয়ে মাফিয়া তোষণের এই নগ্ন চক্রান্ত অনতিবিলম্বে বন্ধ না করা হলে দেশের আপামর জনগণকে সঙ্গে নিয়ে রাজপথে তীব্র গণআন্দোলন গড়ে তুলে তা রুখে দেওয়া হবে।










