পাকিস্তানের কারাবন্দি সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিকে ইনসাফের (পিটিআই) নেতৃত্বাধীন নির্বাচিত প্রাদেশিক সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে খাইবার পাখতুনখোয়ায় জরুরি অবস্থা ও গভর্নর শাসন জারি করেছে শাহবাজ শরীফের নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকার।
রোববার (১১ অক্টোবর) প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফের নেতৃত্বাধীন ফেডারেল মন্ত্রিসভার সুপারিশে প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি এ সিদ্ধান্ত অনুমোদন করেন। পাকিস্তানের সংবিধানের ২৩২ ও ২৩৪ অনুচ্ছেদ ব্যবহার করে প্রদেশটিতে জরুরি অবস্থা ও গভর্নর শাসন কার্যকর করা হয়েছে।
এর মধ্য দিয়ে পিটিআই নেতা সোহেল আফ্রিদির নেতৃত্বাধীন প্রাদেশিক সরকারের কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী, প্রাদেশিক মন্ত্রিসভা ও উপদেষ্টাদের নির্বাহী ক্ষমতা কেন্দ্রের নিয়োগ দেওয়া গভর্নর ফয়সাল করিম কুন্দির হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে।
প্রদেশ পরিচালনায় গভর্নরকে সহায়তার জন্য ১১ সদস্যের একটি পরামর্শক পরিষদও গঠন করেছে কেন্দ্রীয় সরকার। একই সঙ্গে খাইবার পাখতুনখোয়ার ১২টি জেলার কার্যক্রম পরিচালনায় গভর্নর ও প্রাদেশিক প্রধান সচিবের অধীনে পৃথক সচিবালয় গঠন করা হয়েছে, যা সরাসরি কেন্দ্রের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করবে।
এতেই থেমে থাকেনি শাহবাজ সরকার। সংবিধানের ২৪৫ অনুচ্ছেদ ব্যবহার করে প্রদেশটিতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী মোতায়েনেরও অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং নাগরিক ও সরকারি স্থাপনার নিরাপত্তায় বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তা করবে সেনাবাহিনী।
ইমরান খানের দলের সরকারকে সরানোর পক্ষে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি ও সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রমে প্রাদেশিক সরকারের সহযোগিতার ঘাটতির অভিযোগ সামনে এনেছে কেন্দ্রীয় সরকার। আইনমন্ত্রী আজম নাজির তারারের দাবি, গত আড়াই বছরে খাইবার পাখতুনখোয়ায় সন্ত্রাসবাদ ও উগ্রবাদী সহিংসতার ঘটনা ১৯৬ শতাংশ বেড়েছে।
তবে কেন্দ্রের এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে পিটিআই। দলটির নেতাদের অভিযোগ, নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে সামনে রেখে মূলত ইমরান খানের সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক ঘাঁটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়া হয়েছে।
ইমরান খানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী জুলফিকার বুখারি গভর্নর শাসন জারিকে ‘ছদ্মবেশী অভ্যুত্থান’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। পিটিআই নেতৃত্বের বক্তব্য, জনগণের ভোটে নির্বাচিত একটি প্রাদেশিক সরকারকে এভাবে সরিয়ে দেওয়া গণতান্ত্রিক ম্যান্ডেটের প্রতি সরাসরি আঘাত।
গভর্নর শাসন জারির আগের দিনই মুখ্যমন্ত্রী সোহেল আফ্রিদি জানিয়েছিলেন, পিটিআই কোনো ‘অবৈধ পদক্ষেপ’ মেনে নেবে না। ইমরান খান ও পাখতুনদের অধিকারের প্রশ্নে নিজের মুখ্যমন্ত্রীর পদও ত্যাগ করতে প্রস্তুত বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন তিনি।
বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হলো, ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে পিটিআইয়ের বড় ধরনের আন্দোলন চলার মধ্যেই তার দলের একমাত্র প্রাদেশিক সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরানো হলো। সোহেল আফ্রিদির নেতৃত্বে কয়েক দিন ধরে পিটিআইয়ের লংমার্চ চলছিল এবং দলটির কর্মী-সমর্থকেরা ইসলামাবাদ অভিমুখে অগ্রসর হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।
ইমরান খান ২০২৩ সাল থেকে কারাবন্দি। তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলায় সাজা দেওয়া হলেও বিভিন্ন মামলার সাজা পরবর্তী সময়ে স্থগিত বা বাতিল হয়েছে। ইমরান খান ও পিটিআই শুরু থেকেই এসব মামলাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করে আসছে।
২০২৪ সালের নির্বাচনের পর খাইবার পাখতুনখোয়া ছিল পাকিস্তানের একমাত্র প্রদেশ, যেখানে ইমরান খানের দল সরকার পরিচালনা করছিল। পাকিস্তানের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই প্রদেশটি পিটিআই ও ইমরান খানের অন্যতম প্রধান শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। এমন একটি সময়ে নির্বাচিত পিটিআই সরকারকে সরিয়ে সরাসরি কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ ও সেনা উপস্থিতি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত দেশটির সরকার ও ইমরান খানপন্থীদের মধ্যকার চলমান রাজনৈতিক সংঘাতকে আরও তীব্র করে তুলতে পারে।
সূত্র: ডন, রয়টার্স, এপি ও রেডিও পাকিস্তান











