রক্তস্নাত জুলাই অভ্যুত্থানের পর দীর্ঘ দেড় দশকের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ভোটগ্রহণের সময় শেষ হয়েছে। এখন চলছে ভোট গণনা, অপেক্ষা ফল প্রকাশের।
বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) সকাল ৭টা ৩০ মিনিট থেকে সারা দেশের ৪২ হাজার ৭৭৯টি কেন্দ্রে একযোগে ভোটগ্রহণ শুরু হয়। ভোটগ্রহণের সময় শেষ হয় বিকেল ৪টা ৩০ মিনিটে। তবে যারা এখনো ভোটকেন্দ্রে অপেক্ষায় আছেন, তারা ভোট প্রয়োগ করার সুযোগ পাবেন।
সকাল থেকেই কেন্দ্রগুলোতে ভোটারদের উপস্থিতি কম থাকলেও বেলা বাড়ার পর ব্যাপক ভিড় লক্ষ্য করা যায়। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। ভোটাররা আগামীর বাংলাদেশ পুনর্গঠনে তাদের মতামত দিয়েছেন। এখন অপেক্ষা ফল প্রকাশের।
কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া মোটামুটি শান্তিপূর্ণভাবেই শেষ হয়েছে বহুল প্রত্যাশিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। এখন চলছে ভোট গণনা। এর আগে আজ বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) সকাল সাড়ে ৭টা থেকে শুরু হয়ে টানা ভোটগ্রহণ চলে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত। সারাদেশের ২৯৯টি সংসদীয় আসনে ৪২ হাজার ৯৫৮টি ভোটকেন্দ্রে ভোটগ্রহণ করা হয়। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে শেরপুর-৩ আসনের নির্বাচন স্থগিত রয়েছে।
ঐতিহাসিক এই নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে একটি নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে। আর এই নির্বাচিত সরকারের দেশ পরিচালনার মাধ্যমে বাংলাদেশ গণতন্ত্রে উত্তরণের প্রথম ধাপ পার করবে। দেশের মানুষ দেড় যুগ পর স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়েছে। জনগণ আগামী পাঁচ বছরের জন্য দেশের কান্ডারি বেছে নিতে আজ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছে। এর মাধ্যমে দীর্ঘদিন পর দেশে প্রতিষ্ঠিত হবে একটি নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার।
সংসদ নির্বাচন ছাড়াও আজ বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রীয় সংস্কার সম্পর্কিত গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে ‘হ্যাঁ’ কিংবা ‘না’ এর পক্ষে রায় দিয়েছেন ভোটাররা। জাতির ভবিষ্যত পুনর্গঠনে এই গণভোট অত্যন্ত জরুরি।
আজকের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ ৫৯টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৫১টি দল অংশ নিয়েছে। এই নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী প্রধান দুই প্রতিপক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ফ্যাসিবাদী শাসন, গুম ও গণহত্যা চালানোর জন্য আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় দলটি নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি।
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে ঘিরে দেশে এক ধরনের ‘ঈদের আমেজ’ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। উৎসবমুখর পরিবেশ বজায় রাখতে সরকার ও নির্বাচন কমিশন বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। ভোটারদের স্বাচ্ছন্দ্যে বাড়ি গিয়ে ভোট দেওয়ার সুযোগ করে দিতে ১১ ও ১২ ফেব্রুয়ারি সরকারি দুটি ঘোষণা করে শুক্র ও শনিবারের সাপ্তাহিক ছুটির সঙ্গে মিলিয়ে চারদিনের ছুটির ব্যবস্থা করা হয়েছে। রাজধানীর বাসটার্মিনাল, লঞ্চঘাট ও রেলস্টেশনে ঈদে বাড়ি ফেরার মতো মানুষের ভিড় দেখা গেছে। তারা গ্রামের বাড়িতে গেছেন ভোট দিতে। দীর্ঘ ১৫ বছর পর অনেক ভোটার, বিশেষ করে তরুণরা, প্রথমবারের মতো ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়ে দারুণ উচ্ছ্বসিত।
নির্বাচন কমিশন ক্যারাভ্যান বা ভ্রাম্যমাণ বাহনের মাধ্যমে প্রচার করার সুযোগ দিয়ে নির্বাচনি আমেজ বাড়িয়ে তুলেছে। নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ করার জন্য এক লাখ সেনাবাহিনীসহ ৯ লাখ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করেছে।
এবারের নির্বাচনের প্রচারকে এক কথায় বলতে গেলে এটি ছিল নজিরবিহীন উৎসবমুখর ও ডিজিটালনির্ভর। এবারের প্রচারের সবচেয়ে বড় দিক ছিল ফেসবুক, ইউটিউব এবং টিকটকের ব্যবহার। কোনো প্রকার বড় ধরনের সহিংসতা কিংবা বিশৃঙ্খলা ছাড়াই প্রার্থীরা তাদের প্রচার শেষ করেন।
আজকের নির্বাচন বাংলাদেশের ইতিহাসে কয়েকটি কারণে অত্যন্ত ব্যতিক্রমী এবং একটি ‘ঐতিহাসিক মোড়’ হিসেবে বিবেচিত। এবারই প্রথম একই দিনে সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি ‘জুলাই সনদ’ বা সংবিধান সংস্কারের ওপর একটি জাতীয় গণভোট অনুষ্ঠিত হলো। ভোটাররা দুটি ভিন্ন রঙের ব্যালট পেপার ব্যবহার করেন, সংসদ নির্বাচনের জন্য সাদা এবং গণভোটের জন্য গোলাপি। গত তিনটি প্রহসনের নির্বাচনের পর এটিই প্রথম বড় ধরনের অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন হলো।
এবারের নির্বাচনে প্রায় ৪ কোটি তরুণ ভোটার, যারা মোট ভোটারের এক-তৃতীয়াংশ। কেন্দ্রে সিসিটিভি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য ২৫ হাজার ৭শ ‘বডি ওর্ন ক্যামেরা’ রয়েছে। প্রায় এক হাজার ড্রোন ভোটকেন্দ্রে নজরদারি করছে।
এবার মোট ভোটার ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৮৯৫ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ১৫১ জন। নারী ভোটার সংখ্যা ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ৫২৪ জন। এছাড়া হিজড়া ভোটার রয়েছে ১ হাজার ১২০ জন।











