পবিত্র মাহে রমজানে মসজিদে আকসায় মুসলিমদের প্রবেশাধিকার আরো কমিয়ে আনার পরিকল্পনা করছে গাজ্জায় গণহত্যা চালিয়ে যাওয়া ইহুদিবাদী সন্ত্রাসীদের অবৈধ রাষ্ট্র ইসরাইল।
শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) আনাদোলুকে দেওয়া এক সাক্ষাতকারে জেরুসালেমের সাবেক গ্র্যান্ড মুফতি শায়েখ ইকরিমা সাবরি একথা জানান।
তিনি দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে বলেন, আগামী সপ্তাহের মাঝামাঝিতে শুরু হতে যাওয়া পবিত্র রমজান মাসে মুসলমানদের জন্য মসজিদে আকসায় প্রবেশ সীমিত করার পরিকল্পনা করছে দখলদার ইসরাইলী প্রশাসন। জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে অধিকৃত পূর্ব জেরুসালেমে মেজর জেনারেল আভশালোম পেলেদকে নতুন পুলিশ কমান্ডার হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার মধ্য দিয়েই তাদের এই অসৎ উদ্দেশ্য স্পষ্ট হয়ে গেছে।
সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে, এই পদক্ষেপকে উগ্র ইহুদিবাদী ইসরাইলী নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গাভির কর্তৃক আল-আকসায় ইহুদি মন্দির নির্মাণ পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইসরাইলী পত্রিকা হারেৎজ লিখেছে, “মনে হচ্ছে বেন-গাভির পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত করতে যা যা করা সম্ভব সবই করছেন।”
শাইখ সাবরি এপ্রসঙ্গে আরো বলেন, “মুসলমানরা মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহ অনুসরণে মুসলিমরা শাবান মাসের শেষে আশাবাদ নিয়ে রমজানকে স্বাগত জানায়। কিন্তু জেরুসালেমের ক্ষেত্রে আমরা দুঃখিত যে, দখলদার কর্তৃপক্ষ আল-আকসা মসজিদে আগত মুসল্লিদের উপর কঠোর ব্যবস্থা আরোপ করতে যাচ্ছে।”
এছাড়াও বলেন, “ইসরাইলী কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে বহু তরুণকে মসজিদে প্রবেশে বাধা দিয়েছে এবং ঘোষণা করেছে যে, অধিকৃত পশ্চিম তীর থেকে আগত ইবাদতকারীদের জন্য রমজানে কোনো শিথিলতা প্রদর্শন করা হবে না।”
“এর অর্থ হলো বিধিনিষেধ আরও কঠোর হবে। আল-আকসায় মুসল্লির সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় কম হবে। এটি ধর্মীয় স্বাধীনতার পরিপন্থী এবং রোজার মাসে মুসলমানদের ইবাদতে বিঘ্ন ঘটাবে। অথচ প্রতিবছর রমজানে পশ্চিম তীর থেকে লক্ষ লক্ষ ফিলিস্তিনি অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমে আল-আকসা মসজিদে নামাজ আদায় করতে ও শেষ দশকের ই’তেকাফ পালনের জন্য আসেন।”
“২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইসরাইলী কর্তৃপক্ষ সামরিক চেকপয়েন্টে কঠোরতা বাড়িয়েছে, যার ফলে পশ্চিম তীরের বাসিন্দাদের জেরুসালেমে প্রবেশ এমনিতেই সীমিত হয়ে পড়েছে।”
“গত দুই বছরে খুব অল্পসংখ্যক মানুষই ইসরাইলী সেনাবাহিনীর ইস্যু করা পারমিট পেয়েছেন, যা ফিলিস্তিনিদের মতে পাওয়া অত্যন্ত কঠিন। এ বছর রমজান উপলক্ষে কোনো বিশেষ ব্যবস্থার ঘোষণাও দেওয়া হয়নি।”
সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইসরাইলী কর্তৃপক্ষ পূর্ব জেরুসালেমের শত শত ফিলিস্তিনি বাসিন্দা—যাদের বেশিরভাগই তরুণ— তাদের বিরুদ্ধে অস্থায়ী আদেশ জারি করেছে, যেখানে রমজানে তাদের জন্য আল-আকসায় প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। এসব আদেশের কয়েকটি, ছয় মাস পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।
এই পদক্ষেপগুলো নেওয়া হয়েছে এমন সময়ে, যখন খুনী প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ইসরাইলের সন্ত্রাসবাদী সরকার ফিলিস্তিনি কর্মকর্তাদের সমালোচনার মুখে রয়েছে। তারা অভিযোগ করছেন যে, আল-আকসা প্রাঙ্গণের দীর্ঘদিনের “স্থিতাবস্থা” নীতিতে পরিবর্তন আনা হচ্ছে।
তবে ২০০৩ সাল থেকে স্থানীয় পুলিশ একতরফাভাবে উগ্র ইহুদিবাদীদের মসজিদ প্রাঙ্গণে প্রবেশের অনুমতি দিয়ে আসছে, যদিও আকসার দায়িত্বে থাকা ইসলামিক ওয়াক্ফ বিভাগ বারবার এসব অনুপ্রবেশ বন্ধের দাবি জানিয়েছে।
সাবেক গ্র্যান্ড মুফতী সাবরি বলেন, “কোনো সন্দেহ নেই যে সন্ত্রাসবাদী দখলদার সরকার আল-আকসা মসজিদ নিয়ে তাদের আগ্রাসী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে চায়।”
“বহু বছর ধরে তারা অবাধে আকসায় প্রবেশ, প্রকাশ্যে ও উন্মুক্তভাবে (ইহুদি ধর্মীয়) নামাজ আদায়, ধর্মীয় শিঙ্গা ব্যবহার এবং সিজদা আদায়ের জন্য দাবি জানিয়ে আসছিলো, যা একসময় তাদের গোপন আকাঙ্ক্ষা ছিলো। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তা প্রকাশ্যে এসেছে।”
তিনি আরো বলেন, “আমরা বহুদিন ধরেই সতর্ক করে আসছি যে, ইসরাইল এই স্থানের উপর নিজেদের সার্বভৌমত্ব আরোপ করতে চায় এবং ইসলামিক ওয়াকফের কর্তৃত্ব কমাতে চায়।”
“তবে তাদের পদক্ষেপ শুধু আল-আকসা মসজিদেই সীমাবদ্ধ নয়। অধিকৃত পূর্ব জেরুসালেমের ফিলিস্তিনি পাড়াগুলোতেও ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষত মসজিদের নিকটবর্তী এলাকার বাড়িঘর ভাঙার কার্যক্রমও শুরু করেছে।”
তিনি এসময় আক্ষেপ করে বলেন, “বাড়িঘর ভাঙার নীতি একটি বর্ণবাদী, অন্যায়, অবৈধ ও অমানবিক নীতি। এটি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে ফিলিস্তিনে ব্রিটেনের অন্যায় নীতিরই ধারাবাহিকতা।”
তিনি আরব ও মুসলিম বিশ্বের জনগণকে জেরুসালেম ও মসজিদে আকসার প্রতি তাদের ধর্মীয় ও নৈতিক দায়-দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। মসজিদে আকসা ও ফিলিস্তিনিদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান।
সূত্র: মিডল ইস্ট মনিটর











