শুক্রবার | ৩০ জানুয়ারি | ২০২৬
spot_img

ইন্তিকাল করলেন শহীদ বাবরি মসজিদ মামলার প্রধান আইনজীবী জাফরয়াব জিলানী

ইন্তিকাল করলেন শহীদ বাবরি মসজিদ মামলার প্রধান আইনজীবী এবং অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ডের সেক্রেটারি জাফরয়াব জিলানী। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। ইন্তিকালের সময় তার বয়স হয়েছিল ৭৪ বছর।

বুধবার (১৭ মে) লক্ষ্ণৌর নাশাত গঞ্জের একটি হাসপাতালে তিনি ইন্তিকাল করেন।

লক্ষ্ণৌর আইশবাগ কবরস্থানে তাকে দাফন করার কথা জানায় তার পরিবার।

ভারতের প্রখ্যাত আলেম মাওলানা খালেদ রশিদ ফিরাঙ্গি মহলী সংবাদমাধ্যমকে জানান, ইন্তিকালের আগে এডভোকেট জাফরয়াব জিলানী দীর্ঘদিন যাবত অসুস্থ হয়ে লক্ষ্ণৌর এক হাসপাতালের আইসিউতে চিকিৎসারত ছিলেন।

জানা যায়, ২০২১ সালে একদিন পা পিছলে পড়ে গিয়ে মাথায় মারাত্মকভাবে আঘাত প্রাপ্ত হয়েছিলেন। হাসপাতালে নেওয়া হলে ডাক্তারগণ পরীক্ষানিরীক্ষার পর জানান যে তার অবস্থা আশঙ্কাজনক। ব্রেইনে রক্তক্ষরণ হয়েছে। কিন্তু এরপরও আইসিউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বেঁচে ছিলেন তিনি। অবশেষে আজ দুপুরে মেড-আন্ত হাসপাতালে দুপুর ১২ টার দিকে এক স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক মেয়েকে রেখে দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করেন তিনি।

উল্লেখ্য; জাফরয়াব জিলানী ছিলেন শহীদ বাবরি মসজিদের স্থানে উগ্র হিন্দুত্ববাদী সন্ত্রাসীদের রাম মন্দির নির্মাণের বিরুদ্ধে মামলায় সুপ্রিম কোর্টে মুসলিমদের পক্ষে আইনী লড়াই চালানো প্রধান আইনজীবী ও শহীদ বাবরি মসজিদ অ্যাকশন কমিটির চেয়ারম্যান। অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ডের সেক্রেটারিও ছিলেন তিনি।

এছাড়া উত্তর প্রদেশের এডিশনাল এডিজি বা এডভোকেট অফ ডিরেক্টর জেনারেলের দায়িত্বেও নিয়োজিত ছিলেন জাফরয়াব জিলানী।

সুপ্রিম কোর্টে শহীদ বাবরি মসজিদের পক্ষে তার সাথে আইনি লড়াই চালানো এডভোকেট শামশাদ বলেন, তিনি হয়ে উঠেছিলেন শহীদ বাবরি মসজিদ মামলার চোখ-কান। প্রকৃতপক্ষে মুসলিমদের হয়ে উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের মামলার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য তিনি তার পুরো জীবনটাই উৎসর্গ করে দিয়েছিলেন। মুসলিমদের পক্ষে আইনী লড়াইয়ে তিনি প্রচুর খাটতেন।

তার ভাষ্যমতে জাফরয়াবের একনিষ্ঠ আইনী প্রচেষ্টার ফলেই শহীদ বাবরি মসজিদের পুরো জায়গা দখলে নিতে পারেনি উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা।

তিনি বলেন, ভবিষ্যতে শহীদ বাবরি মসজিদের ইতিহাস বর্ণনার ক্ষেত্রে এডভোকেট জাফরয়াবের ভূমিকা উল্লেখ না করলে ইতিহাস অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।

জানা যায়, ২০১৯ সালে যখন ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বাবরি মসজিদের জায়গাটি হিন্দুদের সমর্পণ করে মুসলিমদের জন্য ৫ একর পরিমাণ অন্য একটি জায়গা বরাদ্দ দিতে চেয়েছিলো তখন এডভোকেট জাফরয়াব জিলানীর নেতৃত্বাধীন মুসলিম পক্ষ এর প্রতিবাদ জানায়।

তিনি বলেছিলেন, পুরো জায়গাটি বাবরি মসজিদের আওতাধীন হওয়ার পক্ষে আমাদের যথেষ্ট প্রমাণাদি রয়েছে। মসজিদকে শহীদ করার আগ পর্যন্ত প্রতি ওয়াক্তে সেখানে নিয়মিত নামাজ অনুষ্ঠিত হওয়াই প্রমাণ করে সেখানে কোনো মূর্তি ইত্যাদি ছিলো না।

উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের দাবী ছিলো মসজিদটি ১৫২৮ সালে প্রথম মুঘল সম্রাট বাদশাহ বাবরের আমলে তৈরি হয়েছিল, যা কি না তাদের দেবতা রামের জন্মভূমি ছিল। মুসলমানরা হিন্দুত্ববাদ নিশ্চিহ্ন করে দিতেই যাবতীয় স্থাপনা ধ্বংস করে রামের জন্মভূমিতে বাবরি মসজিদ নির্মাণ করেছিলো বলে অভিযোগ করে তারা। তাই তা পুনরুদ্ধারে রামভক্তরা ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদে হামলা চালিয়েছিলো।

তবে বালবীর সিংহ নামী একজন কট্টর হিন্দুত্ববাদী কর সেবক যিনি বাবরি মসজিদে হামলার ক্ষেত্রে অগ্রে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন একটি উগ্র হিন্দুত্ববাদী সন্ত্রাসী সংগঠনকে, তার জীবনী এক্ষেত্রে ভিন্ন বার্তা দেয়।

১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর কট্টর হিন্দুত্ববাদী সন্ত্রাসীদের সংগঠন বিজেপি, আরএসএস ও অসংখ্য কর সেবক কর্তৃক ঐতিহাসিক শহীদ বাবরি মসজিদের ধ্বংসযজ্ঞে তিনিও অংশগ্রহণ করেছিলেন।

ধ্বংসযজ্ঞে অংশগ্রহণ করায় কট্টর হিন্দুত্ববাদী জনসাধারণ ও উগ্র হিন্দুত্ববাদী সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো তাকে অভাবনীয় অভ্যর্থনা ও জনসম্মুখে সংবর্ধনা দিয়েছিলো।

তবে তার মধ্যে পরবর্তীতে অনুশোচনা আসে। শত শত মুসলিম ও ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদে হামলার জন্য তার মধ্যে অপরাধ বোধ কাজ করছিলো।

এছাড়া এমন জঘন্য অপরাধ ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্য তার সাথে তার পরিবারের দূরত্ব তৈরি হতে থাকে।

এঘটনার পর তিনি মানসিক ভাবে ভেঙ্গে পড়েন এবং অজানা রোগে আক্রান্ত হোন। কোনো ফলপ্রসূ চিকিৎসা না পেয়ে তিনি শেষমেশ উত্তর প্রদেশের মুজাফফর নগরের একজন ইমাম ও প্রখ্যাত দাঈ মাওলানা কালিম সিদ্দিকীর দ্বারস্থ হোন। মাওলানা কালিম সিদ্দিকীর আধ্যাত্মিক চিকিৎসায় তিনি ধীরে ধীরে সেরে উঠে। সুস্থ হওয়ার পর তিনি তার অতীতের সবকিছু তার কাছে খুলে বলেছিলেন এবং ওই সকল অতীত কর্মকাণ্ডের জন্য তিনি কী ধরণের সমস্যায় ভুগেছিলেন তাও বলেছিলেন।

মাওলানা সাহেবের সাথে বালবীরের সাক্ষাৎ চিকিৎসার স্বার্থে হয়েছে ঠিক, কিন্তু সুস্থ হওয়ার পরেও তিনি তার সাথে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রেখেছিলেন।

সুস্থ হয়ে ওঠার কয়েক বছর পর যথারীতি আবার মাওলানা কালিম সিদ্দিকীর সাথে সাক্ষাৎ করতে গিয়ে তিনি ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ করে কট্টর হিন্দুত্ববাদী কর সেবক বালবীর সিংহ থেকে শতাধিক মসজিদ নির্মাণ ও অন্যান্য মসজিদ রক্ষণাবেক্ষণে প্রত্যয়ী মুহাম্মাদ আমির হয়ে যান।

তার নির্মিত প্রথম মসজিদটি ভারতের হরিয়ানায় অবস্থিত। ২৬ বছরে তিনি মোট ৯১টি মসজিদ নির্মাণ করেন এবং ১০ এর অধিক মসজিদের পুনঃনির্মাণ ও সংস্কার করেন।

শহীদ বাবরি মসজিদ দিবস উপলক্ষে ২০১৯ সালের ৬ ডিসেম্বর হায়দ্রাবাদে তিনি একটি মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন এবং মসজিদটির নাম দিয়েছিলেন মসজিদে রহিমিয়্যাহ। তবে ২০২১ সালের ২৩ জুলাই শুক্রবার হায়দ্রাবাদে তার রহস্যজনক মৃত্যু হয়।

সূত্র: দেওবন্দ টাইমস, ইয়েনি শাফাক

spot_img
spot_img
spot_img
spot_img

সর্বশেষ