বৃহস্পতিবার | ১৯ ফেব্রুয়ারি | ২০২৬
spot_img

শাসকদের জন্য ওলামাদের পরামর্শ অপরিহার্য : আফগান আমীরুল মু’মিনীন

ইমারাতে ইসলামিয়া আফগানিস্তানের আমীরুল মু’মিনীন বা সর্বোচ্চ নেতা মাওলানা হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা বলেছেন,  “ওলামায়ে কেরামই হলেন শরিয়তের বিষয়ে উম্মাহর প্রকৃত নেতা ও পথপ্রদর্শক। উম্মাহর সকল আমির ও শাসকের জন্য শরিয়তের হুকুম-আহকাম মেনে চলা বাধ্যতামূলক। শরিয়তের যেকোনো বিষয়ে ওলামায়ে কেরামের কাছ থেকে হেদায়েত বা নির্দেশনা নেওয়া এবং তাদের সাথে পরামর্শ করা শাসকদের অপরিহার্য দায়িত্ব।”

কান্দাহারে ওলামায়ে কেরামের সম্মানে আয়োজিত এই সমাবেশে তিনি এসব কথা বলেন।

মাওলানা আখুন্দজাদা বলেন, “দ্বীন, ইসলাম এবং শরিয়তের বিধানাবলী একমাত্র ওলামায়ে কেরামের মাধ্যমেই সংরক্ষিত থাকে। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, প্রতিটি যুগেই দ্বীন ও ইসলামকে দুর্বল করার গভীর ষড়যন্ত্র হয়েছে এবং শরিয়তের বিধি-বিধানকে বিকৃত করার অপচেষ্টা চালানো হয়েছে। মানুষকে সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত করার সেই পুরোনো ষড়যন্ত্র আজও অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু ওলামায়ে কেরামই শরিয়তের বিধি-বিধানের বিকৃতি রোধ করেছেন এবং দ্বীনের আসল রূপ পরিবর্তন হতে দেননি।”

তিনি আরও বলেন, “আল্লাহ তা’আলা আপনাদের কাঁধে এক বিশাল দায়িত্ব অর্পণ করেছেন। ওলামায়ে কেরাম যদি দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ হন এবং মজবুত ইচ্ছা পোষণ করেন, তবে সমাজ থেকে সকল প্রকার অনাচার অতি দ্রুত দূর হয়ে যাবে। আপনারা যদি মসজিদের মিম্বরে দাঁড়িয়ে এবং বিভিন্ন সামাজিক সভা-সমাবেশে অন্যায়ের ভয়াবহ পরিণাম সম্পর্কে মানুষকে সতর্ক করেন এবং শরিয়তের বিধি-বিধান স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন, তবে মানুষ অবশ্যই সংশোধিত হবে। কারণ, এই দেশের মানুষ মুমিন ও মুসলমান। তাই সমাজ থেকে অনাচার প্রতিহত করার দায়িত্ব ওলামায়ে কেরামেরই। আফগানিস্তানের জনগণ অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ। ইসলামের প্রতিরক্ষায় তারা অকাতরে শাহাদাত বরণ করেছে, জখম হয়েছে, জেল খেটেছে এবং অবর্ণনীয় কষ্ট সহ্য করেছে। ফেতনা বা বিশৃঙ্খলা রোধ করা, মানুষের মন ও চরিত্র সংশোধন করা এবং দুর্নীতির পথ বন্ধ করা ওলামাদেরই পবিত্র ও নৈতিক দায়িত্ব।”

দ্বীন রক্ষায় ওলামায়ে কেরামের অবদান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তাঁরা যুগে যুগে বিভিন্ন বই-পুস্তক ও রিসালা লিখে মানুষের বিভ্রান্ত মনকে পরিশুদ্ধ করেছেন। স্বয়ং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইহুদি ও ইসলাম বিদ্বেষীদের মোকাবেলায় কঠোর সংগ্রাম করেছেন এবং ইসলামের প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করেছেন।

ইমারাতে ইসলামিয়ার প্রতি আনুগত্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমি আফগানিস্তানের জনগণ এবং ওলামায়ে কেরামের প্রতি মহান আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করছি যে, তারা ইসলামি আমিরাতের আনুগত্য করেছেন এবং নির্দ্বিধায় মেনে নিয়েছেন।”

তিনি বলেন, “ইসলামি শাসনব্যবস্থার স্থায়িত্ব, টিকে থাকা এবং চূড়ান্ত সফলতা নির্ভর করে দ্বীনি ইলম বা ধর্মীয় জ্ঞানের ওপর। ইসলামি ব্যবস্থার একটি অন্যতম প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো ধর্মীয় জ্ঞানের ব্যাপক প্রসার ঘটানো, যাতে তা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে এবং প্রকাশিত হয়। যেন মানুষ দ্বীন, ইসলাম ও শরিয়ত সম্পর্কে সঠিক বুঝ ও ধারণা লাভ করতে পারে। তাই ওলামায়ে কেরামের উচিত মানুষের দ্বারে দ্বারে ধর্মীয় জ্ঞান পৌঁছে দেওয়া।”

ঐক্য ও আনুগত্যের বিষয়ে তিনি নির্দেশ দিয়ে বলেন, “আপনারা মানুষকে ঐক্যের পথে আহ্বান করুন। অন্তরের গভীর থেকে আনুগত্য করুন। নিজেদের মধ্যে আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করুন। আপনারা যদি ঐক্যবদ্ধ থাকেন, তবে এই শাসনব্যবস্থা অক্ষত ও নিরাপদ থাকবে। আর যদি (আল্লাহ না করুন) আপনারা নিজেদের মধ্যে বিবাদে জড়িয়ে পড়েন, তবে এই ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। আপনারা সজাগ ও সতর্ক থাকুন, যাতে এই নিজাম বা ব্যবস্থা কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় এবং জাহিলিয়াতের সেই অন্ধকার যুগ আর ফিরে না আসে। আপনারা অলসতা করবেন না। দায়িত্বশীলদের উচিত দিন-রাত নিজেদের দায়িত্বের প্রতি সজাগ থাকা এবং অহেতুক কাজে সময় নষ্ট না করা। দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী মোহ বা পদমর্যাদার লোভ করবেন না। আনুগত্য করলে তা আপনাদের নিজেদেরই উপকারে আসবে। আনুগত্যের ক্ষেত্রে কারো প্রতি অনুগ্রহ করছেন, এমনটা ভাববেন না। সাধারণ মানুষের মনে আনুগত্যের জাজবা বা স্পৃহা জাগিয়ে তুলুন। কারণ, আনুগত্যের মাধ্যমেই ঐক্য সৃষ্টি হয় এবং আমাদের জামাত বা দল শক্তিশালী হয়।”

সমাবেশে ওলামায়ে কেরাম ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন কান্দাহারের গভর্নর মোল্লা মোহাম্মদ শিরীন আখুন্দ, গোয়েন্দা প্রধান মাওলানা আবদুল হক ওয়াসিক, রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির প্রধান মাওলানা শাহাবুদ্দিন দেলাওয়ার, সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি মাওলানা আবদুল হাকীম হক্কানী, সুপ্রিম কোর্টের সামরিক শাখার উপ-প্রধান সর্দার মোহাম্মদ আবু আল ফায়যান, কেন্দ্রীয় দারুল ইফতার প্রধান খাইরজান খাইরখাহ, সুপ্রিম কোর্টের বিচারিক শাখার উপ-প্রধান নুরুল্লাহ মুনীর এবং আরও অসংখ্য বিশিষ্ট ওলামায়ে কেরাম ও উচ্চপদস্থ দায়িত্বশীল ব্যক্তি।

সমাবেশের শেষ পর্যায়ে উপস্থিত সকল ওলামায়ে কেরাম আবারও আমীরুল মুমিনীনের হাতে বাইয়াত গ্রহণ করেন এবং অঙ্গীকার নবায়ন করেন। তারা তাদের নেতা এবং এই ইসলামি শরিয়াহ ব্যবস্থার পক্ষে পাহাড়সম দৃঢ়তা নিয়ে পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দেন। সবশেষে আমীরুল মুমিনীনের দোয়ার মাধ্যমে সভা সমাপ্ত হয়।

spot_img
spot_img
spot_img
spot_img

সর্বশেষ