সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমাদ হুসাইন আল-শারাআ আল-জুলানী ও তাঁর নেতৃত্বাধীন সাবেক সংগঠন হায়াত তাহরির আল-শাম সম্পর্কে দেওয়া বক্তব্য ঘিরে বিতর্কের পর নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন দেশটির গ্র্যান্ড মুফতী শাইখ উসামা আবদুল করিম আল-রিফায়ী। তিনি জানিয়েছেন, অতীতে সংগঠনটির বিরুদ্ধে চরমপন্থা ও তাকফিরের যেসব অভিযোগ তাঁর কাছে পৌঁছেছিল, পরবর্তী সময়ে সংগঠনটির নেতাদের সঙ্গে আলেমদের বৈঠকের মাধ্যমে সেগুলোকে অসত্য বলে জানতে পারেন তিনি।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত এক বিবৃতিতে এসব কথা জানান সিরিয়ার গ্র্যান্ড মুফতী।
সম্প্রতি ইন্দোনেশিয়ার একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে তাঁর বৈঠকের ভিডিওর কিছু অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে আহমাদ শারাআ ও তাঁর সহযোগীদের অতীতের ধর্মীয় চিন্তাধারা নিয়ে আলোচনা করেন তিনি। তাঁদের মধ্যে একসময় ওহাবি মতাদর্শ ও কঠোর অবস্থানের প্রভাব ছিল বলে মন্তব্য করেন। এ বক্তব্যের পর বিশেষত সালাফি মহলের একাংশে সমালোচনা তৈরি হয়।
বিবৃতিতে আল-রিফায়ী বলেন, নির্বাসিত জীবনে ইস্তাম্বুলে অবস্থানকালে হায়াত তাহরির আল-শাম ও সিরিয়ার অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি সম্পর্কে তাঁর কাছে বিভিন্ন পরস্পরবিরোধী তথ্য পৌঁছেছিল। এসব তথ্যের কারণে সংগঠনটির বিষয়ে তাঁর মধ্যে সংশয় ও সতর্কতা তৈরি হয়।
তবে বাশার আল আসাদ সরকারের পতনের আগে ‘রাদউল উদওয়ান’ সামরিক অভিযান শুরুর পূর্বে আহমাদ শারাআর নেতৃত্বাধীন হায়াত তাহরির আল-শামের নেতাদের সঙ্গে কয়েকজন আলেমের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
গ্র্যান্ড মুফতীর ভাষ্য অনুযায়ী, ওই বৈঠকের মাধ্যমে সংগঠনটির বিরুদ্ধে চরমপন্থা ও মুসলমানদের কাফের ঘোষণার যেসব অভিযোগ প্রচারিত হয়েছিল, সেগুলোর অসত্যতা তাঁদের কাছে স্পষ্ট হয়। পাশাপাশি সংগঠনটির নিয়ন্ত্রিত এলাকায় আহলে সুন্নাতের স্বীকৃত মাজহাব অনুযায়ী ধর্মীয় আচার পালনের সুযোগ রয়েছে বলেও তাঁরা জানতে পারেন।
আল-রিফায়ী জানান, বাশার আল আসাদ সরকারের পতনের পর প্রেসিডেন্ট আহমাদ শারাআ ও রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে সিরিয়ান ইসলামিক কাউন্সিলের আগের কাঠামোর কার্যক্রম সমাপ্ত করে সুপ্রিম ফতোয়া কাউন্সিল প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের বিভিন্ন ধারার আলেমদের জন্য একটি অভিন্ন প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গঠিত এ কাউন্সিলের সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন তিনি।
গ্র্যান্ড মুফতী বলেন, কাউন্সিলের কার্যক্রমের মাধ্যমে বিভিন্ন চিন্তাধারার আলেমদের মধ্যে পারস্পরিক পরিচয়, বোঝাপড়া ও সহযোগিতা বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশ পুনর্গঠনে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে গিয়ে তাঁরা উপলব্ধি করেছেন, মতের বৈচিত্র্য বিভেদের কারণ না হয়ে ভ্রাতৃত্ব ও দ্বীনি খেদমতের ক্ষেত্রকে আরও সমৃদ্ধ করতে পারে।
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের পরিচয় প্রসঙ্গে তিনি স্পষ্ট করেন, আকিদাগত ক্ষেত্রে আশআরি, মাতুরিদি ও আহলে হাদিস এবং ফিকহের চার মাজহাবই আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের অন্তর্ভুক্ত।
বিশেষভাবে সালাফি ধারার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, সালাফি চিন্তাধারা সিরিয়ার ধর্মীয় শিক্ষা ও দাওয়াতি ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সালাফি আলেম ও অনুসারীদের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত।
আল-রিফায়ী বলেন, সালাফি আলেমরা তাঁদেরই অংশ এবং তাঁরাও সালাফি আলেমদের অংশ। ধর্মীয় বিষয়ে ইলমি মতপার্থক্য থাকলেও তা পারস্পরিক ভালোবাসা ও সম্পর্ক নষ্ট করার কারণ হতে পারে না।
বিবৃতিতে তিনি ‘ইসলামি বক্তব্যের ঐক্য সনদ’ মেনে চলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। সনদটিকে আলেমদের ঐক্যের একটি অভিন্ন ও বাধ্যতামূলক কাঠামো হিসেবে উল্লেখ করে এটি সংরক্ষণ ও অনুসরণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন তিনি।
সবশেষে সিরিয়ার আলেমদের পারস্পরিক মতপার্থক্যের পরিবর্তে অভিন্ন বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া, বিভিন্ন ধর্মীয় ধারার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা এবং ঐক্যবদ্ধভাবে দেশ পুনর্গঠনে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান গ্র্যান্ড মুফতী।
সূত্র: সিরিয়ার গ্র্যান্ড মুফতীর ২১ সেপ্টেম্বরের আনুষ্ঠানিক বিবৃতি, শাম নিউজ নেটওয়ার্ক ও আরাবি২১।











