spot_img

আকাশজুড়ে শ্রাবণ মেঘের ঘনঘটা, সপ্তাহজুড়ে টানা বৃষ্টির মুখে দেশ

আকাশজুড়ে শ্রাবণের মেঘের আনাগোনা, আর নদ-নদীতে উথাল ঢেউ। ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল আর বর্ষার টানা বর্ষণে দেশের উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে কড়া নাড়ছে বন্যা। শান্ত নদীগুলো যেন রাতারাতি উত্তাল হয়ে গেল।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, দেশের অন্তত তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ পয়েন্টে পানি এখন বিপদসীমার ওপর দিয়ে বইছে।

সিলেটের কূলঘেঁষা কুশিয়ারা নদী ফেঞ্চুগঞ্জ পয়েন্টে বিপদসীমার ৩৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সুনামগঞ্জের মারকুলি পয়েন্টে জলস্তর ছুঁয়েছে বিপদসীমার চেয়ে ২ সেন্টিমিটার উঁচুতে। অন্যদিকে, নেত্রকোনার কলমাকান্দায় শান্ত সোমেশ্বরীর পানি বইছে বিপদসীমার ৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে। পর্যবেক্ষণাধীন পানির স্তরের হিসাব রাখা ১২৭টি কেন্দ্রে চোখ রাখলে স্পষ্ট হয় পরিস্থিতি কতটা উদ্বেগের—যার মধ্যে ৭৫টি পয়েন্টেই পানি ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্রের পূর্বাভাস বলছে, সুরমা ও কুশিয়ারার অববাহিকাভুক্ত সিলেট ও সুনামগঞ্জ এবং আত্রাই অববাহিকার নওগাঁ জেলায় বন্যার কালো ছায়া নেমে আসার ঝুঁকি তীব্র। নদী তীরের মানুষ প্রহর গুনছে আশঙ্কায়। লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, রংপুর, বগুড়া কিংবা সিরাজগঞ্জের নদীপাড়ের নিম্নাঞ্চলগুলোতে ইতোমধ্যে তার আগমনী বার্তা পাঠিয়ে দিয়েছে; নদীগুলোর পানি পৌঁছে গেছে সতর্কসীমায়। তবে সামান্য স্বস্তির বাতাস কেবল নেত্রকোনায়, সেখানে সোমেশ্বরীর পানি কিছুটা কমতে থাকায় মিলছে এক চিলতে স্বস্তির নিঃশ্বাস।

পানি বৃদ্ধির এই মন খারাপ করা গল্পটার সূত্রপাত অবশ্য দেশের সীমানা ছাড়িয়ে দূর পাহাড়ে। ভারতের মেঘালয়ের মাওকিরওয়াতে ২৪ ঘণ্টায় ঝরেছে ৬৭ মিলিমিটার বৃষ্টি। আর দেশের ভেতরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ঝরেছে ৬৫ মিলিমিটার মেঘের জল। উজানের ঢল আর দেশীয় বৃষ্টির এমন যুগলবন্দিতে চিলমারী, সারিয়াকান্দি আর ডালিয়ার বুক চিরে বয়ে যাওয়া ব্রহ্মপুত্র, যমুনা ও তিস্তা এখন যেন বিপদসীমার নিঃশ্বাস ছোঁয়া দূরত্বে। নদীপাড়ের মানুষকে দেওয়া হয়েছে সতর্ক থাকার বার্তা।

বৃষ্টির এই সুর কেবল নদ-নদীতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; আছড়ে পড়েছে ইট-কাঠের শহর ঢাকাতেও। বুধবারের সকাল থেকেই রাজধানীর আকাশ ঢাকা পড়েছিল ধোঁয়াসা মেঘের চাদরে। বেলা বাড়তেই অন্ধকার গাঢ় হয়, আর দুপুরের পর থেকেই নামল মুষলধারে বৃষ্টি। আবহাওয়া দপ্তরের হিসেবে দুপুর ৩টা পর্যন্ত ঢাকা ভিজিয়েছে ২১ মিলিমিটার জলরাশি। আর সন্ধ্যা পর্যন্ত সেই হিসাব গিয়ে ঠেকেছে ৩২ মিলিমিটারে। বৃষ্টি ভেজা এই শহরে ফুটপাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আর পথচারীর দীর্ঘশ্বাস ভারি হয়েছে পানির সাথে। জলাবদ্ধতায় স্থবির হয়ে যায় অনেক সড়কের চলাচল, গণপরিবহনের সংকট আর বাড়তি ভাড়ার খড়্গ গৃহমুখী মানুষকে এনে দিয়েছে অবর্ণনীয় ভোগান্তি। আবহাওয়াবিদদের পূর্বাভাস বলছে, শ্রাবণের এই বৃষ্টিধারার ছবি এখনই মুছছে না।

আবহাওয়াবিদ ড. ওমর ফারুক ও এ কে এম নাজমুল হকের সই করা সংকেত—সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগে আরো দুইদিন ঝরতে পারে অতি ভারী বর্ষণ, এর ফলে চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকায় জেগে উঠেছে ভূমিধ্বসের উঁকিঝুঁকি আশঙ্কা।

নগরীর রাজপথে জমে থাকা কাদা-পানি আর নদীর তীরে আছড়ে পড়া ঢেউ—সব মিলিয়ে প্রকৃতি এখন বরষা-কাব্য লিখছে দুর্ভোগের কালিতে। বৃষ্টির পানির এই ঊর্ধ্বমুখী পথচলা কোথায় গিয়ে থামে, সেই আশঙ্কার মেঘ বুক চেপে ধরে আছে নদী আর শহরের কোটি মানুষের।

spot_img
spot_img
spot_img

সর্বশেষ