spot_img

ঐতিহাসিক আদিনা মসজিদকে মন্দির দাবি, বাইরে শিবলিঙ্গ স্থাপনের ঘোষণা হিন্দুত্ববাদীদের

পশ্চিমবঙ্গের মালদা জেলার প্রায় ৬৫০ বছরের পুরোনো ঐতিহাসিক আদিনা মসজিদকে ‘আদিনাথ মন্দির’ দাবি করেছে হিন্দুত্ববাদীরা। মসজিদের বাইরে একটি বিশাল শিবলিঙ্গ স্থাপনের ঘোষণাও দিয়েছে একটি হিন্দুত্ববাদী সংগঠন।

সংগঠনটির দাবি, আদিনা মসজিদটি একটি প্রাচীন ‘আদিনাথ শিব মন্দিরের’ ধ্বংসাবশেষের ওপর নির্মিত। আগামী সোমবার সেখানে পূজা ও ‘রুদ্র বিশেষ’ যজ্ঞ আয়োজনের ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে।

উত্তরবঙ্গ বিজেপির ‘সুশাসন সেলে’র আহ্বায়ক এবং ‘আদিনাথ পুরাতন শিব মন্দির’ সংগঠনের প্রধান পৃষ্ঠপোষক কাজল গোস্বামী সম্প্রতি ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে এ কর্মসূচি ঘোষণা করেন। তিনি শ্রাবণ মাসের দ্বিতীয় সোমবার তথাকথিত ‘প্রাচীন আদিনাথ শিব মন্দিরে’ উপস্থিত হওয়ার জন্য সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রতি আহ্বান জানান।

কাজল গোস্বামীর দাবি, যে স্থানে শিবলিঙ্গটি বসানো হবে, সেটি ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপের সংরক্ষিত এলাকার বাইরে। স্থানীয় মন্দির প্রশাসনও তারকেশ্বর থেকে আনা ৩ দশমিক ৬ ফুট উচ্চতা ও দেড় টন ওজনের শিবলিঙ্গটি স্থাপনের অনুমতি দিয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

আশা প্রকাশ করে কাজল গোস্বামী বলেন, “আদালতের রায় এবং এএসআইয়ের নতুন সমীক্ষার মাধ্যমে খুব শিগগিরই এই স্থানের প্রকৃত ইতিহাস প্রকাশ্যে আসবে।”

আদিনাথ মন্দির ধ্বংস করেই আদিনা মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি। কাজল গোস্বামী বলেন, “তথাকথিত এই মসজিদের ভেতরে বহু হিন্দু ও বৌদ্ধ দেবদেবীর মূর্তি ও প্রতীক রয়েছে।”

তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য সম্পর্কে তিনি জানান, মন্দিরটি পুনরুদ্ধার এবং পরে মসজিদের ভেতরেই শিবলিঙ্গ স্থাপন করাই তাদের মূল লক্ষ্য। তবে আইনের মধ্যে থেকেই তারা পদক্ষেপ নেবেন বলে দাবি করেন তিনি।

কাজল গোস্বামী জানান, ইতোমধ্যে পুলিশ ও এএসআই কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের কথা হয়েছে। প্রশাসনিক নির্দেশনা অনুযায়ী সব ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান সংরক্ষিত এলাকার বাইরেই পালন করা হবে।

‘আদিনাথ পুরাতন শিব মন্দির’ নামের সংগঠনটির দাবি, মসজিদটিতে হিন্দু ও বৌদ্ধ স্থাপত্যের পাশাপাশি একটি শিবলিঙ্গও রয়েছে। এ বিষয়ে এএসআইয়ের বিস্তারিত প্রতিবেদন চেয়ে শিগগিরই তারা কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হবে।

সম্ভাব্য উত্তেজনা এড়াতে গত ১৫ জুলাই মালদা জেলা পুলিশ একটি বিশেষ সতর্কবার্তা জারি করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আদিনা মসজিদে গিয়ে পূজা দেওয়ার ঘোষণার পর পুলিশ স্পষ্ট জানায়, আদিনা মসজিদ ১৯৫৮ সালের ‘প্রাচীন স্মৃতিসৌধ ও প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান সুরক্ষা আইন’-এর অধীনে সংরক্ষিত জাতীয় স্মারক।

সংরক্ষিত এলাকায় কোনো ধরনের ধর্মীয় আচার বা অনুমোদনহীন কার্যক্রম সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ বলেও জানায় পুলিশ। আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সতর্কতা দেওয়া হয়।

তবে বিষয়টি ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনা ক্রমেই বাড়ছে। শুক্রবার ভারতের সংসদে বক্তব্য দেওয়ার সময় বিজেপি বিধায়ক তরুণজ্যোতি তিওয়ারি দাবি করেন, সম্প্রতি মালদায় আদিনা মসজিদ দেখতে গিয়ে তার মনে হয়েছে, এটি কোনো মসজিদ নয়, বরং একটি ধ্বংসাবশেষ।

তিনি বলেন, “সেখানকার প্রতিটি পাথর যেন চিৎকার করে বলছিল, ‘আমিই আদিনাথ মন্দির’।”

ঘটনাটিকে ইতিহাসের একটি ‘বেদনাদায়ক অধ্যায়’ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, “মনে হচ্ছে ভগবান মহাদেব এখনো তার প্রাচীন আবাস পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন। ইতিহাস প্রমাণের ওপর ভিত্তি করা উচিত, সময়ের গর্ভে হারিয়ে যাওয়া উচিত নয়।”

১৩৭৩ খ্রিস্টাব্দে বাংলা সালতানাতের সুলতান সিকান্দার শাহ সুবিশাল আদিনা মসজিদটি নির্মাণ করেন। এটি ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপের তালিকাভুক্ত জাতীয় গুরুত্বসম্পন্ন স্মৃতিসৌধ এবং ভারতীয় উপমহাদেশের মধ্যযুগীয় বৃহত্তম মসজিদগুলোর অন্যতম।

তবে ২০২২ সালে বিজেপি নেতা রথীন্দ্র বসু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেছিলেন, “আদিনা মসজিদের নিচে আদিনাথ মন্দির ঘুমিয়ে আছে।”

একই সুরে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের নেতারাও মসজিদটির কারুকার্য পর্যবেক্ষণ করে এটিকে প্রাক-ইসলামিক যুগের স্থাপত্য বলে দাবি করেন।

পরবর্তী সময়ে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে হিরণ্ময় গোস্বামী নামের এক হিন্দু পুরোহিতের নেতৃত্বে একটি দল বেআইনিভাবে সংরক্ষিত আদিনা মসজিদে প্রবেশ করে। মসজিদের ভেতরে শিবলিঙ্গ ও মূর্তি থাকার দাবি করে তারা ধর্মীয় আচার পালন করে।

এ ঘটনায় স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায় তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানায়। পরে অনুমতি ছাড়া সংরক্ষিত স্থানে প্রবেশ এবং ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগে এএসআইয়ের পক্ষ থেকে হিরণ্ময় গোস্বামীর বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করা হয়।

২০২৫ সালের অক্টোবরে তৃণমূল কংগ্রেসের সংসদ সদস্য ইউসুফ পাঠান আদিনা মসজিদ পরিদর্শনের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন। পোস্টে তিনি এটিকে ১৪ শতকে বাংলার সুলতান সিকান্দার শাহের নির্মিত একটি ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা হিসেবে উল্লেখ করলে বিতর্ক নতুন করে দানা বাঁধে।

এর জবাবে পশ্চিমবঙ্গ বিজেপি লিখেছিল, “সংশোধনী: এটি আদিনাথ মন্দির।”

এরপর ২০২৫ সালের ৫ ডিসেম্বর ভারতের রাজ্যসভায় বিষয়টি জোরেশোরে উত্থাপন করেন বিজেপির রাজ্যসভা সদস্য ও পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির তৎকালীন সভাপতি শমিক ভট্টাচার্য।

তিনি অভিযোগ করেন, প্রাচীন হিন্দু ও বৌদ্ধ স্থাপত্য ধ্বংস করে সেখানকার উপাদান দিয়ে আদিনা মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছিল। মূল স্থানে শিব ও বিষ্ণুর আদিনাথ মন্দির ছিল বলেও দাবি করেন তিনি। বিষয়টি অবিলম্বে তদন্ত করতে কেন্দ্রীয় সরকার ও এএসআইয়ের প্রতি আহ্বান জানান শমিক ভট্টাচার্য।

অন্যদিকে বিজেপির আরেক রাজ্যসভা সদস্য ও পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির সাবেক সভাপতি রাহুল সিনহা আদিনা মসজিদ বিতর্ককে সরাসরি অযোধ্যার ‘রাম জন্মভূমি-বাবরি মসজিদ’ ঘটনার সঙ্গে তুলনা করেছেন।

তিনি দাবি করেন, “রাম মন্দির ও অন্যান্য প্রাচীন মন্দিরের মতো এটিকেও ধ্বংস করে মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছিল। ভক্তদের ধর্মীয় অনুভূতিকে এভাবে অস্বীকার করা সম্ভব নয়।”

spot_img
spot_img
spot_img

সর্বশেষ