মুসলিম ইতিহাসের অন্যতম গৌরবময় অধ্যায় ইস্তাম্বুল বিজয়ের ৫৭৩তম বর্ষপূর্তি আজ শুক্রবার (২৯ মে)। ১৪৫৩ সালের এই দিনে সুলতান মুহাম্মাদ আল-ফাতিহের নেতৃত্বে কনস্টান্টিনোপলের দুর্ভেদ্য প্রাচীর ভেদ করে নতুন ইতিহাস রচনা করে মুসলিম বাহিনী।
মহানবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “নিশ্চয়ই কনস্টান্টিনোপল বিজিত হবে। সে বাহিনীর আমীর কতই না উত্তম আমীর, সে বাহিনী কতই না উৎকৃষ্ট বাহিনী।”
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই সুসংবাদ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মুসলিম উম্মাহর হৃদয়ে কনস্টান্টিনোপল বিজয়ের আকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে রেখেছিল। সেই বিজয়ের অংশ হওয়া এবং সুসংবাদপ্রাপ্ত বাহিনীর মর্যাদা লাভের আশায় ইসলামের শুরু যুগ থেকেই মুসলিম বীর মুজাহিদগণ কনস্টান্টিনোপলের পথে অগ্রসর হয়েছেন।
হযরত উসমান রাযিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর শাসনামলে হযরত মুয়াবিয়া রাযিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর নেতৃত্বে মুসলিম নৌবহর গঠিত হয়। এরপর গ্রিকদের সঙ্গে মুসলমানদের সংঘর্ষ শুরু হয়। তখন থেকেই বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের রাজধানী কনস্টান্টিনোপল মুসলিম অভিযানের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হয়ে ওঠে।
উমাইয়া খলিফা হযরত মুয়াবিয়া রাযিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর শাসনামলে ৬৭৪ সালে মুসলমানরা কনস্টান্টিনোপলের অভিমুখে প্রথম বড় অভিযান পরিচালনা করেন। সেই অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন প্রবীণ সাহাবী হযরত আবু আইয়ুব আনসারী রাযিয়াল্লাহু তাআলা আনহু। যুদ্ধ চলাকালে তিনি অসুস্থ হয়ে ইন্তিকাল করেন। পরে কনস্টান্টিনোপলের অদূরে তাঁকে দাফন করা হয়।
পরবর্তীতে ৭১৬ থেকে ৭১৭ খ্রিষ্টাব্দে উমাইয়া খলিফা সুলাইমান ইবনে আব্দুল মালিকের শাসনামলে আবারও কনস্টান্টিনোপলের অভিমুখে অভিযান পরিচালিত হয়। আব্বাসীয় যুগেও এ নগরী মুসলমানদের স্বপ্ন থেকে সরে যায়নি।
তৃতীয় আব্বাসীয় খলিফা আল-মাহদির সময়ে হারুনুর রশীদের নেতৃত্বে ৭৮২ সালে কনস্টান্টিনোপল অবরোধ করা হয়। সেই অভিযানে বাইজেন্টাইনরা মুসলমানদের কর দিতে সম্মত হয়।
খলিফা হারুনুর রশীদের শাসনামলে বাইজেন্টাইন সম্রাট নাইসিফোরাস কর দিতে অস্বীকৃতি জানালে আব্বাসীয় বাহিনী আবারও অভিযান চালায়। তারা হিরাক্লিয়া দখল করে। তবে কনস্টান্টিনোপল তখনও অজেয় থেকে যায়।
পরবর্তী সময়ে আব্বাসীয় খেলাফতের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও মুসলিম বিশ্বের রাজনৈতিক দুর্বলতার কারণে বিজয়ের স্বপ্ন অক্ষুণ্ণ থাকলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। সেলজুকদের সময়েও কনস্টান্টিনোপলের দিকে কিছু অভিযান পরিচালিত হয়। কিন্তু শতাব্দীব্যাপী এই স্বপ্ন বাস্তব রূপ পায় উসমানীদের হাতে।
উসমানীদের প্রস্তুতি ও রাজনৈতিক প্রতিকূলতা
১৩৯৬ সালে নিকোপলিসের যুদ্ধের পর উসমানী সুলতান প্রথম বায়জিদ কনস্টান্টিনোপল বিজয়ের সংকল্প করেন। কিন্তু বাইজেন্টাইনদের কূটচালে তৈমুর লং উসমানী সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে অগ্রসর হন। ১৪০২ সালে আঙ্কারার যুদ্ধে বায়জিদ ও তৈমুরের দুই মুসলিম বাহিনী মুখোমুখি হয়। এতে উসমানীদের অগ্রযাত্রা থেমে যায় এবং কনস্টান্টিনোপল তখনও রক্ষা পায়।
১৪২১ সালে সুলতান দ্বিতীয় মুরাদ উসমানী সাম্রাজ্যের ক্ষমতায় আসেন। তাঁর সিংহাসনে আরোহণের পর বাইজেন্টাইনরা উসমানী সাম্রাজ্যের ভেতরে একের পর এক অস্থিরতা সৃষ্টি করতে থাকে। ১৪২২ সালে সুলতান দ্বিতীয় মুরাদ কনস্টান্টিনোপল অবরোধ করেন। অবরোধ তীব্র হয়ে উঠলেও এশিয়া মাইনরে বিদ্রোহের কারণে তাঁকে অভিযান অসমাপ্ত রেখে ফিরে যেতে হয়। ফলে আবারও কনস্টান্টিনোপল রক্ষা পায়।
সুলতান মুহাম্মাদ ১৪৩২ সালের ৩০ মার্চ তৎকালীন উসমানী রাজধানী আন্দ্রিয়ানোপলে জন্মগ্রহণ করেন। ছোটবেলা থেকেই তাঁর জন্য দ্বীনি শিক্ষা, সামরিক প্রস্তুতি ও শাসনদক্ষতার ব্যবস্থা করেন সুলতান দ্বিতীয় মুরাদ। তাঁর শিক্ষকদের মধ্যে আক শামসুদ্দিন ছিলেন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি ছোটবেলা থেকেই শাহজাদা মুহাম্মাদকে কনস্টান্টিনোপল বিজয়ের স্বপ্ন, ঈমানি দৃঢ়তা ও আধ্যাত্মিক প্রস্তুতির দিকে অনুপ্রাণিত করেন।
মাত্র ১১ বছর বয়সে শাহজাদা মুহাম্মাদ এমাসিয়া অঞ্চল শাসনের দায়িত্ব পান। ১৪৪৪ সালের ১২ জুলাই সুলতান দ্বিতীয় মুরাদ ও ইউরোপীয় খ্রিষ্টান শক্তির মধ্যে ১০ বছরের শান্তিচুক্তি হয়। এরপর তিনি নিজের ১২ বছর বয়সী সন্তান সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মাদকে ক্ষমতায় বসিয়ে অবসরে যান।
তরুণ মুহাম্মাদকে ক্ষমতায় দেখে খ্রিষ্টান শক্তি অল্প সময়ের মধ্যেই শান্তিচুক্তি ভঙ্গ করে উসমানী সাম্রাজ্যে আক্রমণ চালায়। এ সময় সুলতান মুহাম্মাদ তাঁর পিতাকে আবার নেতৃত্ব গ্রহণের অনুরোধ করেন। সুলতান দ্বিতীয় মুরাদ প্রথমে অস্বীকৃতি জানালে তরুণ সুলতান দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, “আপনি যদি সুলতান হন, তাহলে এগিয়ে এসে আপনার সৈন্যদের নেতৃত্ব দিন। আর যদি আমি সুলতান হয়ে থাকি, তাহলে আমি নির্দেশ দিচ্ছি, আপনি আমার সৈন্যদের নেতৃত্ব দিন।”
১৪৪৪ সালের ১০ নভেম্বর সুলতান দ্বিতীয় মুরাদ আবার ক্ষমতায় আসেন। এরপর ভারনার যুদ্ধে পোল্যান্ডের সম্রাট ভ্লেডিস্লাও ও সেনাপতি জন হানিয়াডির নেতৃত্বাধীন হাঙ্গেরি, পোল্যান্ড ও ভালাকিয়ার যৌথ খ্রিষ্টান বাহিনীকে পরাজিত করেন।
১৪৫১ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি সুলতান দ্বিতীয় মুরাদ ইন্তিকাল করলে দ্বিতীয়বারের মতো সিংহাসনে আরোহণ করেন সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মাদ। বাইজেন্টাইনরা তাঁকে আগের মতো দুর্বল মনে করে। তারা উসমানী রাজপরিবারের বন্দী সদস্যদের ব্যবহার করে বিদ্রোহ বাঁধানোর চেষ্টা করে। কিন্তু সুলতান মুহাম্মাদ আল-ফাতিহ সব ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে কনস্টান্টিনোপল বিজয়ের প্রস্তুতি শুরু করেন।
দুর্ভেদ্য নগরী ও বিজয়ের প্রস্তুতি
কনস্টান্টিনোপল ছিল তৎকালীন বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও দুর্ভেদ্য নগরীগুলোর একটি। এর তিন দিকে ছিল জলসীমা, এক দিকে স্থলভাগ। পূর্বে বসফরাস প্রণালি, উত্তরে গোল্ডেন হর্ন, দক্ষিণে মারমারা সাগর এবং এক পাশে ছিল শক্তিশালী স্থলপ্রাচীর। ভূমধ্যসাগর ও কৃষ্ণসাগরের সংযোগস্থলে অবস্থানের কারণে এ নগরীর সামরিক, বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক গুরুত্ব ছিল অসাধারণ।
সুলতান মুহাম্মাদ আল-ফাতিহ কনস্টান্টিনোপল বিজয়ের জন্য ব্যাপক প্রস্তুতি নেন। তিনি হাঙ্গেরীয় কামান প্রস্তুতকারী আরবানের মাধ্যমে বিশাল আকৃতির দূরপাল্লার কামান তৈরি করান। অবরোধের সময় এসব কামান বড় ভূমিকা রাখে। সব প্রস্তুতি শেষে ১৪৫৩ সালের ৬ এপ্রিল তিনি কনস্টান্টিনোপল অবরোধ করেন।
কনস্টান্টিনোপলের জলসীমা ছিল বাইজেন্টাইনদের বড় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। গোল্ডেন হর্নের মুখে তারা বিশাল শিকল বসিয়ে দেয়, যাতে উসমানী নৌবাহিনী ভেতরে প্রবেশ করতে না পারে। ফলে সুলতান মুহাম্মাদের বাহিনীকে স্থলভাগে প্রধান আক্রমণ চালাতে হয়।
কিন্তু কনস্টান্টিনোপলের প্রাচীর ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী। বাইজেন্টাইন সেনারা বারবার উসমানীদের আক্রমণ প্রতিহত করতে থাকে। দীর্ঘ অবরোধে মুসলিম বাহিনীর ক্ষয়ক্ষতি বাড়তে থাকে। তবু সুলতান মুহাম্মাদ আল-ফাতিহ মনোবল হারাননি। তিনি সামরিক কৌশলের পাশাপাশি আল্লাহর সাহায্যের ওপর ভরসা রেখে নতুন পরিকল্পনা গ্রহণ করেন।
উসমানী ঐতিহাসিক বর্ণনায় আছে, এ সময় হযরত আবু আইয়ুব আনসারী রাযিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর স্মৃতি মুসলিম বাহিনীর জন্য গভীর আধ্যাত্মিক প্রেরণার উৎস হয়ে ওঠে। কনস্টান্টিনোপলের অদূরে তাঁর কবরের অবস্থান সুলতান মুহাম্মাদ আল-ফাতিহ ও তাঁর সৈন্যদের মনে নববী সুসংবাদের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কের অনুভূতি জাগিয়ে তোলে।
গোল্ডেন হর্নের শিকল ভাঙা কঠিন ছিল। তাই সুলতান মুহাম্মাদ এক বিস্ময়কর রণকৌশল গ্রহণ করেন। তিনি স্থলপথ দিয়ে জাহাজ পার করার সিদ্ধান্ত নেন। রাতের অন্ধকারে তেল ও চর্বি মাখানো কাঠের ওপর দিয়ে প্রায় ৮০টি রণতরী বসফরাস থেকে স্থলপথ অতিক্রম করে গোল্ডেন হর্নে নামানো হয়।
সকালে বাইজেন্টাইনরা গোল্ডেন হর্নে উসমানী জাহাজ দেখে হতভম্ব হয়ে যায়। এতদিন যে দিককে তারা নিরাপদ ভেবেছিল, সেদিক থেকেও আক্রমণের সুযোগ তৈরি হয়। এতে তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে। উসমানী বাহিনীর সামনে বিজয়ের দরজা খুলে যেতে থাকে।
চূড়ান্ত আক্রমণ ও বিজয়
১৪৫৩ সালের ২৮ মে রাতে সুলতান মুহাম্মাদ আল-ফাতিহ কনস্টান্টিনোপলে চূড়ান্ত আক্রমণের প্রস্তুতি নেন। মুসলিম বাহিনীর মধ্যে নতুন উদ্দীপনা ছড়িয়ে পড়ে। ২৯ মে সকালে উসমানী বাহিনী একের পর এক আক্রমণ চালায়। তীব্র লড়াইয়ে বাইজেন্টাইন বাহিনী পর্যুদস্ত হতে থাকে।
দুর্গের প্রাচীর ভেদ করার পর সুলতান মুহাম্মাদ তাঁর বিশেষ জেনিসারি বাহিনীকে সামনে এগিয়ে দেন। বীর সেনা হাসান আগা উসমানী পতাকা নিয়ে প্রাচীরের ওপর উঠে যান। সেখানে চাঁদখচিত পতাকা উড্ডীন হলে মুসলিম বাহিনীর মনোবল বহুগুণ বেড়ে যায়। অন্যদিকে বাইজেন্টাইন বাহিনীর প্রতিরোধ ভেঙে পড়ে।
শেষ বাইজেন্টাইন সম্রাট কনস্টান্টাইন একাদশ আসন্ন পরাজয় বুঝতে পেরে রাজকীয় পোশাক খুলে সাধারণ সৈনিকের বেশে যুদ্ধে নামেন এবং নিহত হন। তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে প্রায় ১ হাজার ১০০ বছরের বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের অবসান ঘটে।
২৯ মে সুলতান মুহাম্মাদ আল-ফাতিহ বিজয়ীর বেশে কনস্টান্টিনোপলে প্রবেশ করেন। তিনি শহরের অমুসলিম নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন। নারী, শিশু ও সাধারণ মানুষের প্রতি তাঁর আচরণ বিজয়ী শাসকের দায়িত্ববোধ ও ইসলামী ন্যায়নীতির দৃষ্টান্ত হয়ে থাকে।
বিজয়ের পর কনস্টান্টিনোপল উসমানী সাম্রাজ্যের নতুন রাজধানীতে পরিণত হয়। মুসলিম ঐতিহ্যে শহরটি “ইসলাম বুল”, অর্থাৎ ইসলামের শহর হিসেবেও পরিচিতি পায়। পরবর্তীতে তা ইস্তাম্বুল নামে প্রসিদ্ধ হয়। সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মাদ ইতিহাসে মুহাম্মাদ আল-ফাতিহ নামে পরিচিত হন।
ইস্তাম্বুল বিজয় শুধু একটি নগরী জয়ের ঘটনা নয়। এটি নববী সুসংবাদের বাস্তবায়ন, শতাব্দীব্যাপী মুসলিম আকাঙ্ক্ষার পূর্ণতা, তরুণ নেতৃত্বের দৃঢ়তা, ঈমানি সাহস, জ্ঞান, প্রস্তুতি ও সামরিক কৌশলের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই বিজয়ের মাধ্যমে পূর্ব ও পশ্চিমের সংযোগস্থলে মুসলিম সভ্যতার নতুন অধ্যায় শুরু হয়।
আজও ইস্তাম্বুল বিজয় মুসলিম বিশ্বের জন্য আত্মবিশ্বাস, ঈমান, প্রস্তুতি, ঐক্য ও নেতৃত্বের শিক্ষা বহন করে। যে জাতি স্বপ্নকে পরিকল্পনায় রূপ দিতে পারে, জ্ঞানকে শক্তিতে পরিণত করতে পারে এবং আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে দীর্ঘ সংগ্রাম চালিয়ে যেতে পারে, ইতিহাসে বিজয়ের দরজা তার জন্যই খুলে যায়।











