spot_img

সংবিধান মানলে প্রধানমন্ত্রীর এখন বিদেশে থাকার কথা : শফিকুল ইসলাম মাসুদ

সংবিধান মানতে গেলে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেশের বাইরে থাকার কথা ছিল বলে মন্তব্য করেছেন জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ। তিনি বলেছেন, গণভোটকে অস্বীকার করা হলে গোটা বাংলাদেশ আবার জেগে উঠে তা কার্যকর করবে।

সোমবার (৩০ মার্চ) রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে পটুয়াখালী-২ আসনের সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদ এসব কথা বলেন।

শফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেন, ‘৭২ সংবিধানের আলোকে আজকে আমাদের এখানে থাকার কথা নয়। আজকে প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশে থাকার কথা না, দেশের বাইরে থাকার কথা। বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এখন দেশের বাইরে থাকার কথা। গণভোটকে অস্বীকার করা হলে গোটা বাংলাদেশ আবার জেগে উঠে গণভোট তারা কার্যকর করবে।’

তিনি বলেন, এখন নতুন করে ভাবতে হচ্ছে, কথা বলতে গিয়ে বিগত ১৭ বছরের মতো আবার কোনো বৈষম্যের মধ্যে পড়ে যাচ্ছি কি না। এই সরকার প্রতিষ্ঠার পর শরিফ ওসমান হাদির হত্যার বিচারে কতটুকু কার্যকরিতা এসেছে, সেটিও জানা যায়নি।

গণভোট ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ নিয়ে সরকারি দলের বক্তব্যের প্রতি ইঙ্গিত করে মাসুদ বলেন, ‘আমরা সংবিধান নিয়ে ঘাটাঘাটি করতে করতে অনেক দূর চলে গেছি। সংবিধান যদি আমাদের রক্ষা করতে পারত, তাহলে সেদিন বালুর ট্রাক সরানোর জন্য সংবিধানের পৃষ্ঠা খুঁজতে হতো না। সংবিধান যদি আমাদের রক্ষা করতে পারত, তাহলে ৭২ সংবিধানের আলোকে আজকে আমাদের এখানে থাকার কথা না। আমাদের এই সংসদে নয়, জেলাখানায় থাকার কথা। প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে থাকার কথা না, দেশের বাইরে থাকার কথা। বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এখন দেশের বাইরে থাকার কথা।’

তিনি আরও বলেন, ‘সংবিধান মানতে হলে যে বাচ্চাদেরকে আজ এখানে শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে, দীক্ষা দেওয়া হচ্ছে, কিংবা কোনো কোনো ক্ষেত্রে জাসদের সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে, সেই বাচ্চাদের নিয়ে আমরা সরকারদলীয় নেতাদের চোখের পানিও ফেলতে দেখেছি। আবার কাউকে কাউকে এ কথাও বলতে শুনেছি যে, এই সমস্ত বাচ্চাদের বা শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক ছিল না।’

বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে জামায়াতের এই সংসদ সদস্য বলেন, ‘আমরা খুব লজ্জিত হই। নতুন করে গণভোটের ন্যায্যতা-অন্যায্যতা আমাদের শেখানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। যখন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের মহাসচিবকে কয়েক হাজার পুলিশের বেষ্টনির মাঝখানে একা একটা মোবাইল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি, তখন সংবিধান আমাদের রক্ষা করতে পারেনি।’

নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমার ৩৫০ মামলার জামিন পেতে সাত মাস সময় লেগেছে, আর বের হতে সময় লেগেছে সাড়ে চার বছর। আমি সেই সাড়ে চার বছরে তিনবার রি-অ্যারেস্ট হয়ে দুবার গুম হয়েছি। আমি তখন ডিজিএফআই, এনএসআই, ডিবি, এসবির কাছে জানতে চেয়েছিলাম, আমার সামনে দিয়ে বড় বড় নেতারা বের হয়ে যাচ্ছে, আমার অপরাধটা কী। তখন তারা বলেছিল, হুমকি না, হুমকি আপনারা। আমাদেরকে যখন শেখ হাসিনার সরকার নিষিদ্ধ করেছিল, তখন বলেছিল, এই জামাত-শিবিরই হচ্ছে সবচেয়ে বড় সমস্যা। তাদেরকে নিষিদ্ধ করলে এই আন্দোলন থেমে যাবে।’

গণভোট প্রশ্নে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করে মাসুদ বলেন, ‘আজ একটা কথা পরিষ্কার বলতে চাই, এই গণভোট নিয়ে আমাদের মাথাব্যথার মূল কারণ এখানেই। শেখ হাসিনা আমাদেরকে যথার্থ টার্গেট করেছিল। সেই টার্গেটের মূল লক্ষ্য ছিলাম আমরা। আমাদেরকে বলা হয়েছিল, একটা গুলি করলে একটা সরে, বাকিগুলো লড়ে না। সেই লড়ে না লোকগুলো ছিলাম আমরা। যার কারণে আমাদেরকে তারা ভয় পায়।’

তিনি বলেন, ‘এখন আমরা ভিডিওতে দেখতে পাই, শেখ হাসিনা বাইরে থেকে বলেছিল, আমরা এই দলকে ভোট দিতে বললাম, আর সেই দল আমাদের সঙ্গে আবার বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। শেখ হাসিনার ওই বক্তব্য শোনার পর আমরা কাউকে এখানে বলতে শুনিনি যে, তার ওই বক্তব্য সঠিক নয়।’

জুলাই সনদ ও গণভোট ইস্যুতে জাতির সঙ্গে প্রতারণা করা হলে তার মূল্য দিতে হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেন এই সংসদ সদস্য। তিনি বলেন, ‘এই মানুষ প্রতারিত হয়েছে, বেইমানি করা হয়েছে। আবার যদি গণভোট, জুলাই সনদ নিয়ে এই জাতির সঙ্গে প্রতারণা করা হয়, তাহলে মূল্য দিতে হবে শুধু নয়, আবার আমাদেরকে ১৭ বছরের সেই জেল-জুলুম, নিপীড়ন, গুম-খুনের জায়গায় ফিরে যেতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমি মনে করি, পরিষ্কার বক্তব্য হচ্ছে, গণভোটের প্রতি সমর্থন না জানিয়ে জুলাই সনদকে যদি ইগনোর করা হয়, তাহলে আমাদেরকে আবার সেই গুম-খুন, আয়নাঘরের দিকে ধাবিত করা হবে। গণভোটের বিরোধিতা করার অর্থ হচ্ছে, আমরা আয়নাঘর সমর্থন করতে চাই। গণভোটের বিরোধিতা করা মানে হচ্ছে, ৭০ শতাংশ মানুষকে আমরা অন্যায্যভাবে ধিক্কার জানাতে চাই।’

সরকারি দলের জনপ্রতিনিধিদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আপনারা যেমন ৫১ শতাংশ সমর্থন নিয়েছেন, ৭০ শতাংশ প্রায় জনগণ কিন্তু গণভোটের পক্ষে রায় দিয়েছে। আপনাদের চেয়ে সেই ৫১ শতাংশের তুলনায় সেই ৭০ শতাংশ প্রায় গণভোটকে যদি আপনারা অস্বীকার করেন, তাহলে বলব গোটা বাংলাদেশ আবার জেগে উঠে গণভোট কার্যকর করবে।’

সংবিধান প্রসঙ্গে বক্তব্যের শেষ অংশে শফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেন, ‘সংবিধানের লাইন ধরে ধরে যেতে হলে আমাদের নেতৃবৃন্দকে ফাঁসির মঞ্চে যেতে হতো না। আমার মতো ছোট মানুষের কাছেও সে সময় ডিজিএফআইয়ের পক্ষ থেকে প্রস্তাব এসেছিল, আপনারা কী চান, মন্ত্রিত্ব চান, দেশ পরিচালনা চান, সবকিছু দেওয়া হবে, শুধু শেখ হাসিনার নীতিতে আসেন। সেই নীতি তো ছিল ৭২-এর সংবিধান। সেই নীতি নিয়ে আজকে কেন এখানে এত কথা বলা হচ্ছে?’

তিনি বলেন, ‘আমরা যদি ৭২-এর সংবিধানকে ভালোবাসি, তাহলে এখানকার নেতৃবৃন্দ, মরহুম বেগম খালেদা জিয়া নিজে বলেছিল, আমরা সুযোগ পেলে এই সংবিধানকে ছুড়ে ফেলে দেব। সেই সংবিধানের প্রতি আজকে বর্তমান সরকারি দলের কেন এত প্রেম জাগ্রত হয়েছে, এটা বাংলাদেশের মানুষের জানার অধিকার আছে।’

spot_img
spot_img
spot_img

সর্বশেষ