গাজ্জায় ইসরাইলি আগ্রাসন এবং ফিলিস্তিনিদের ওপর চলমান দমন পীড়নের মধ্যে ব্রিটিশ রাজনীতিতে ইসরাইলি প্রভাব নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। যুক্তরাজ্যের রাজনীতি ও গণতন্ত্রে ইসরাইলপন্থী লবির ভূমিকা কত দূর ছড়িয়েছে, তা নিয়ে এবার ব্রিটিশ পার্লামেন্টে বিতর্ক হতে যাচ্ছে।
ব্রিটিশ সরকারের ওয়েবসাইটে জমা দেওয়া একটি পিটিশনে ১ লাখ ১৬ হাজারের বেশি মানুষ স্বাক্ষর করার পর আগামী ২২ জুন পার্লামেন্টে এ বিতর্কের দিন নির্ধারণ করা হয়েছে। যুক্তরাজ্যের নিয়ম অনুযায়ী, সরকারি পিটিশনে ১ লাখের বেশি স্বাক্ষর পড়লে তা পার্লামেন্টে বিতর্কের জন্য তুলতে হয়।
পিটিশনে যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে ইসরাইলি রাষ্ট্র সংশ্লিষ্ট ও ইসরাইলপন্থী লবিং কার্যক্রম নিয়ে গভীর উদ্বেগ জানানো হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, গাজ্জায় ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ, পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর চলমান দমন পীড়ন এবং এসব বিষয়ে যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক অবস্থান ইসরাইলপন্থী সংগঠন, নেটওয়ার্ক ও লবিং প্রচেষ্টার প্রভাব খতিয়ে দেখার জরুরি প্রয়োজন সামনে এনেছে।
ইসরাইলি লবিং নিয়ে তদন্তের দাবি এর আগে প্রত্যাখ্যান করেছিল ব্রিটিশ সরকার। তাদের দাবি, এ বিষয়ে তারা ইতোমধ্যেই ব্যবস্থা নিচ্ছে। তবে সরকারের জবাবে যে রাইকফট রিভিউর কথা বলা হয়েছে, সেখানে মূলত রাশিয়া, চীন ও ইরানের প্রভাব নিয়ে আলোচনা আছে। ইসরাইলের নাম সেখানে নেই।
আন্দোলনকর্মী ও রাজনীতিবিদদের মতে, লবি গ্রুপ, দলীয় গোষ্ঠী, করপোরেট প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে যুক্তরাজ্যে ইসরাইলি প্রভাবের একটি বড় কাঠামো গড়ে উঠেছে। গণতন্ত্রের সুস্থতার জন্য এই কাঠামো খতিয়ে দেখা জরুরি।
পিটিশনের প্রণেতা অ্যান্ডি কালিল বলেছেন, গাজ্জা, পশ্চিম তীর, ইরান ও দক্ষিণ লেবানন নিয়ে ব্রিটিশ সরকারের অবস্থানের সঙ্গে ইসরাইলপন্থী লবিং অনুদানের চরম স্বার্থসংঘাত রয়েছে। তার মতে, বিষয়টিকে বড় রাজনৈতিক কেলেঙ্কারি হিসেবেই দেখা উচিত।
ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির মন্ত্রিসভার অর্ধেকের বেশি সদস্য ইসরাইলপন্থী লবিস্টদের কাছ থেকে অনুদান পেয়েছেন। ইসরাইলপন্থী লবিস্ট ট্রেভর চিন ২০১৭ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে লেবার টুগেদারকে ১ লাখ ৭৫ হাজার পাউন্ড অনুদান দেন। লেবার টুগেদার ছিল কিয়ার স্টারমারের লেবার নেতা হওয়ার প্রচারণার পেছনের থিংক ট্যাংক।
স্টারমারের নেতৃত্ব প্রচারণার সময় এই থিংক ট্যাংক ৭ লাখ পাউন্ডের বেশি অনুদান ইলেক্টোরাল কমিশনে ঘোষণা করতে ব্যর্থ হয়েছিল। এ ঘটনায় ১৪ হাজার পাউন্ডের বেশি জরিমানা করা হয়।
এই অর্থায়ন জেরেমি করবিনকে দুর্বল ও নেতৃত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার প্রচারণাকে সহায়তা করেছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে। করবিন ফিলিস্তিনিদের প্রতি ইসরাইলের আচরণের কড়া সমালোচক ছিলেন। পরে তার জায়গায় স্টারমার নেতৃত্বে আসেন। ২০২৩ সালের অক্টোবরে স্টারমার বলেছিলেন, গাজ্জার পানি ও বিদ্যুৎ বন্ধ করে দেওয়ার “অধিকার” ইসরাইলের আছে।
অন্যদিকে, কনজারভেটিভ এমপিদের প্রায় ৮০ শতাংশ কনজারভেটিভ ফ্রেন্ডস অব ইসরাইলের সদস্য। সংগঠনটি ১১৮ জন এমপির ১৬০ বার ইসরাইল সফরের জন্য ৩ লাখ ৩০ হাজার পাউন্ড অর্থায়ন করেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাজ্যে ইসরাইলপন্থী লবির বড় কৌশল হলো ইসরাইলের সমালোচনাকে ইহুদিবিদ্বেষের সঙ্গে এক করে দেখানো। এর মাধ্যমে ফিলিস্তিনপন্থী অবস্থান এবং জায়নবাদবিরোধী ইহুদিদের কণ্ঠও চাপের মুখে ফেলা হয়।
বিশ্লেষক হিল আকেদ বলেছেন, জায়নবাদী প্রকল্পের বিকাশ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। তার মতে, ১৯১৭ সালের বেলফোর ঘোষণা দেখায়, ব্রিটেনে জায়নবাদ কোনো বিদেশি ঘটনা নয়; বরং ব্রিটিশ রাষ্ট্রীয় নীতির ভেতরেই এর বিকাশ ঘটেছে।
সূত্র : মিডল ইস্ট আই











