আফগানিস্তান ‘ভালো প্রতিবেশী নয়’ বলে মন্তব্য করেছেন পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ। ইসলামাবাদের তালেবানের প্রতি পরিবর্তিত অবস্থান এবং দুই দেশের সম্পর্কের অবনতি নিয়ে এক আফগান নারী সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ মন্তব্য করেন।
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কে আফগান সাংবাদিক নাজিরা কারিমির সঙ্গে কথোপকথনের সময় তিনি এসব কথা বলেন। নাজিরা কারিমি পাকিস্তানের সঙ্গে তালেবানের অতীতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং আফগানিস্তানের বিষয়ে ইসলামাবাদের বর্তমান নীতি নিয়ে খাজা আসিফকে প্রশ্ন করেন।
খাজা আসিফ গত চার দশক ধরে আফগানদের পাকিস্তানে আশ্রয় দেওয়ার সিদ্ধান্তকে ‘ভুল’ বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ওই সময়ে পাকিস্তান আফগানিস্তানের লাখ লাখ নাগরিককে আশ্রয় দিয়েছে। পাকিস্তানি কর্মকর্তারা এর আগে জানিয়েছিলেন, দেশটিতে বসবাসকারী আফগানদের সংখ্যা একপর্যায়ে প্রায় ৪৫ লাখে পৌঁছেছিল।
কাবুল ও ইসলামাবাদের মধ্যে সম্পর্কের তীব্র অবনতির মধ্যেই খাজা আসিফ এসব মন্তব্য করেন। সীমান্তপারের সশস্ত্র তৎপরতা নিয়ে বিরোধ এবং আফগান তালেবান কর্তৃপক্ষ আফগানিস্তানের ভূখণ্ড থেকে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান বা টিটিপিকে কার্যক্রম চালানোর সুযোগ দিচ্ছে বলে পাকিস্তানের অভিযোগের কারণে মূলত এই উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। তবে কাবুল বারবার এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।
সর্বশেষ উত্তেজনার সূত্রপাত হয় ২৪ সেপ্টেম্বর আফগানিস্তানের কান্দাহার, পাকতিয়া ও খোস্ত প্রদেশের ১০টি স্থানে পাকিস্তানি বিমান হামলার পর। পাকিস্তান জানিয়েছে, হামলার লক্ষ্য ছিল পাকিস্তানের বিরুদ্ধে হামলায় ব্যবহৃত ড্রোনের উৎক্ষেপণ ও সংরক্ষণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্থাপনা। তবে আফগান কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এসব হামলায় চার বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন।
আফগান তালেবানের মুখপাত্র মাওলানা জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ হামলার নিন্দা জানিয়ে বলেন, কাবুল উপযুক্ত সময়ে এর জবাব দেবে। পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার বলেন, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে হামলার সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে এসব হামলা চালানো হয়েছে। তিনি অভিযানটিকে পরিকল্পিত ও সীমিত বলে বর্ণনা করেন।
সর্বশেষ হামলার আগে সেপ্টেম্বরের শুরুতেও পাকিস্তান আফগানিস্তানে আরেক দফা বিমান হামলা চালায়। পাকিস্তান দাবি করে, ওই হামলায় ২৮ জন সশস্ত্র ব্যক্তি নিহত হয়েছে। তবে আফগান কর্তৃপক্ষ বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার কথা জানায়। আফগানিস্তানে জাতিসংঘের সহায়তা মিশন নিশ্চিত করে, ওই হামলায় অন্তত তিন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে একজন নারী ও একটি শিশুও ছিল।
নিরাপত্তা নিয়ে এই বিরোধের পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে সীমান্তপারের সংঘর্ষ এবং পাল্টাপাল্টি অভিযোগও চলছে। পাকিস্তান আফগান তালেবান কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের ভেতরে হামলা চালানো সশস্ত্র ব্যক্তিদের নিরাপদ আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ করছে। অন্যদিকে কাবুল এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে এবং সামরিক অভিযান চালিয়ে পাকিস্তান আফগানিস্তানের ভূখণ্ড লঙ্ঘন করছে বলেও অভিযোগ করেছে।
নতুন করে শুরু হওয়া এই সংঘাত দুই দেশের বাণিজ্য ও যাতায়াত ব্যবস্থাকেও প্রভাবিত করছে। বারবার সীমান্ত বন্ধ থাকায় বাণিজ্যিক কার্যক্রম ও মানুষের চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। এ উত্তেজনা সীমান্তের উভয় পাশে বেসামরিক নাগরিকদের নিরাপত্তা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। সাম্প্রতিক সংঘর্ষ চীন, তুরস্ক, কাতার ও সৌদি আরবের সম্পৃক্ততায় চলমান মধ্যস্থতার প্রচেষ্টাকেও হুমকির মুখে ফেলেছে।
খাজা আসিফের এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন একসময় ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখা দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্ক ২০২১ সালে তালেবান আফগানিস্তানের ক্ষমতায় ফেরার পর সবচেয়ে কঠিন সময়গুলোর একটিতে প্রবেশ করেছে। দুই দেশের সরকারই ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা পরিস্থিতির জন্য একে অপরকে দায়ী করে চলেছে। তবে এই বিরোধের কোনো স্থায়ী সমাধান এখনো দেখা যাচ্ছে না।
সূত্র : দ্যা খামা প্রেস











