সেক্যুলার মনের ইসলামোফোবিয়া

ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম |

মুফতী হারুন ইজহার চৌধুরী


বামপন্থী সেক্যুলার সাহিত্য সম্প্রদায় মুসলিম কালচার শব্দে গন্ধ পায় বাঙালি মুসলমানের মানস সংকটের। মূলত এটা পালায়নপর চোর কর্তৃক ধরা পড়ার ভয়ে চোর চোর বলে আত্মরক্ষার্থে চিৎকার করার ঘটনার মতই। সংস্কৃতির যে বয়ান দ্বারা তারা মুসলিম-সংস্কৃতির প্রবক্তা একজন মুসলিম জাতীয়তাবাদীর কল্পিত মানস সংকট আবিষ্কারের ভাঁওতাবাজিতে মেতে উঠেন। তা সে থুথুর মতোই যা উপরে নিক্ষেপে পুন: নিজের মুখের পানে প্রত্যাবর্তন করে। মুসলিম সংস্কৃতির উপর তাদের সাহিত্যিক সমালোচনাগুলো পাঠে আমরা এ প্রত্যয়ে দৃঢ় হতে পারি যে, এ সমালোচনাগুলো উল্টো সমালোচকদেরই মননসংকটের পরিষ্কার প্রতিচ্ছবি বহন করে। বাম চিন্তকদের ভাষায় মুসলিম-মানস সংকটে আমরাও বিশ্বাসী তবে তা কি জাতীয়তাবাদী মুসলিম মানস সংকট নাকি ধর্মনিরপেক্ষবাদী মুসলিম মানস সংকট? এর বিচার করার অধিকার সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের; গুটিকয়েক বুদ্ধিজীবীর নয়। নানা ঘটনা প্রবাহের মাধ্যমে বাংলাদেশের তাওহিদি গণমানুষ এ বিচার একবার নয়; বারবার করেছেন।

দর্শনের নানা বিষয়বস্তুর ন্যায় শিল্প ও সংস্কৃতির মধ্যেও সমস্যা ও সংকট বিরাজমান থাকা স্বাভাবিক। আর তাই ঝুহঃযবংরং বা সমন্বয়ের মাধ্যমে সংকটের মধ্যেই অনুসন্ধান করা হয় সৃষ্টির। বুদ্ধিজীবীরা সর্বত্র বড় জোর গলায় এ সিনথেসিস শব্দটি উচ্চারণ করে থাকেন। এমনকি সংস্কৃতির নানা দ্বান্দ্বিকতাকে তারা এভাবে সমাধানমূলক পরিণতির মধ্যে পুরে দিতে পারঙ্গমতা প্রদর্শন করেন। কতোটা বাস্তবতার মধ্য দিয়ে, কতোটা নিছক শব্দমালার ফুলঝুরি দিয়ে। কিন্তু উদ্বেগের সাথে আমরা লক্ষ্য করি, মুসলিম সংস্কৃতির ব্যাপারটা আসলেই আলোকিত চিন্তার! মস্তিষ্কগুলো ঝিমিয়ে পড়ে। তাদের ‘সিনথেসিসের’ সরব দরিয়া তখন শুষ্ক হয়ে পড়ে।

সে সূত্র ব্যবহারে তারা এতো অভ্যস্থ যে, তা বিস্মৃত হয়ে মুসলিম সংস্কৃতির মধ্যে ‘সংকট সংকট’ বলে পরিত্রাহী চেঁচামেচি করে চলেন তারা। তাদের এ ডাবল স্টান্ডার্ড যতই নৈতিকতা বির্বজিত হোক কিন্তু এটাই তাদের ফ্যাশন।

মুসলিম সংস্কৃতির কল্পিত সংকট বদরুদ্দিন উমরের ভাষায় এভাবে বিধৃত হচ্ছে- “মুসলমানরা আরবি ফারসি সংস্কৃতিকে নিজেদের ঐতিহ্য মনে করে ভারতবর্ষ এবং বাংলাদেশকে বাতিল করে মগ্ন হলেন এক শংকর সংস্কৃতি গঠন করতে….. উনিশ ও বিশ শতকের মধ্যবিত্ত মুসলিম সংস্কৃতি এইভাবে বেশ কিছুটা আচ্ছন্ন হলো মোগলযুগের উচ্চ শ্রেণির মুসলমানের দ্বারা। মুসলিম সংস্কৃতি আমলে ইরানী-তুর্কী নয়, ভারতীয় বাংলাদেশীয় বা পাকিস্তানিও নয়। এবং সর্বোপরি তত্ত্বগত ক্ষেত্রে ইসলামের সাথেও তার কোন সম্পর্ক নেই। এ সংস্কৃতি যেন সর্বদাই ভেসে বেড়াচ্ছে কিন্তু না পারছে কোনও দেশের ক’লে ভিড়তে। না পারছে নিজের দেশের মাটিতে বিস্তার করতে তার মূল”। (সংস্কৃতির সংকট: বদরুদ্দিন উমর)
তার জবাবে আ: মওদুদ বলেছেন, মুসলিম সংস্কৃতির একটা বিশ্বময় রূপ আছে তাই এ সংস্কৃতি কোথাও ভেসে বেড়ায় না। যেখানে যায় গভীরে শিকড় চালনা করে সে দেশের ইসলামানুসারীদের জীবনাচারের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে পড়ে। যে মুসলিম সংস্কৃতি পাঁচশো বছরো অধিক কাল এদেশে একচ্ছত্রভাবে কোটি কোটি মন মানসকে আবর্তিত ও প্রভাবিত করেছে, তাকে শংকর বা ভাসমান সংস্কৃতি বলা ইতিহাস জ্ঞানের দৈন্যই প্রকাশ পায়। বলাবাহুল্য এমন মানস ছিল শুধু মুসলমানের নয় হিন্দুরও। এ সত্যটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে হিন্দু ঐতিহাসিক ও চিন্তাবিদদের দ্বারাও………
নীরদ সিং চৌধুরীর ভাষায়- মুসলমানকে নব্য ভারতীয় কালচার থেকে এক্সটার্নাল প্রলেতারিয়েতের মতো দূরে রাখা হয়েছিল; তবু যদি মুসলমান হিন্দুর এ জগতে প্রবেশের স্পর্ধা করতো তা হলে তাকে ইসলামি মূল্যবোধ ও ট্রাডিশন বিসর্জন দিয়ে আসতে হতো। সে কালীন মুসলমান তা পারেনি আত্মমর্যাদা ও আত্মসত্তা বিকিয়ে দিয়ে অথচ তার ভাগ্যের নির্মম পরিহাস এই যে, আজকাল তাকে তারই বংশধরদের হাতে ধিকৃত হতে হচ্ছে। (মধ্যবিত্ত সমাজের বিকাশ, আ: মওদুদ পৃ. ৩৫১-৫২)

এদেশের সেক্যুলার মন আসলে কী চাই? মুসলিম সংস্কৃতির ভিত্তিকে অস্বীকারকারী ঐ ধর্মনিরপেক্ষবাদীর নিজের সংস্কৃতিটা কী? সে তো পূর্ণাঙ্গ মার্কসবাদী কমিউনিস্ট নয়, না সে পরিপূর্ণ গণতান্ত্রিক পুঁজিবাদী, না সে মুসলমান, না সে হিন্দু না মরমিবাদী, না প্রকাশ্য নাস্তিক। উত্তর হতে পারে আমি বাঙালি। হিন্দু-বাঙালি না মুসলিম-বাঙালি? উত্তর হতে পারে সেক্যুলার-বাঙালি। কিন্তু তবে প্রশ্ন দাঁড়াবে, বাঙালির উপর যদি সেক্যুলার বিশেষণ আরোপ হয় তাহলে ধর্মীয় বিশেষণ আরোপ হলে সমস্যা কোথায়? আপনি যদি হতে চান সেক্যুলার বাঙালি তাহলে আমি ঘোষণা দিতে চাই যে, আমি মুসলিম বাঙালি! আমার মুসলিম বিশেষণে আপনার আপত্তি কেন? অনুরূপভাবে হতে পারে আরেকজন হিন্দু বাঙালি। যদিও সেক্যুলার বাঙালিত্বে কোন মৌলিকত্ব নেই তত্ত্বকথা ছাড়া আর কাল্পনিক আশাবাদ ব্যতিত, তবুও তোমাকে বলি এটা নিয়ে বরং তোমারই দৈন্যদশা প্রকাশ পাবে আরো প্রকটভাবে। সংস্কৃতিতে তুমি হিন্দু-মুসলিম ধর্মীয় বেড়া মানতে রাজি নও। কিন্তু বেড়া একটা না একটা তো থাকেই। যদি প্রশ্ন করা হয়- বাংলাদেশী বাঙলা না ভারতীয় বাঙালা? তার উত্তরে ঢাকা আর কলকাতার জবাব কখনো কি এক হবে? যেমন বলা হয় বৃটিশ ইংরেজ আর আমেরিকান ইংরেজ। ভূগোল আর মানচিত্রের বেড়া স্বীকৃত হলে ধর্মের বেড়াও স্বীকৃত হতে হবে। হ্যাঁ, নিঃসন্দেহে তা হতে হবে বৃহত্তর মানবিক চেতনার আওতায়।