দরিদ্রদের কুরবানীর চামড়া, ধনীদের বিলাসিতা

ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম |

মাওলানা মাহমুদ হাসান সিরাজী
প্রিন্সিপাল, জামিয়া ওসমান ইবনে আফফান রা.


মাওলানা মাহমুদ হাসান সিরাজী

একটা চামড়ার মানিব্যাগ কিনতে করতে হবে। গত কয়েক দিন আগে বসুন্ধরা গেইটের সামনে এক বড় ভাইয়ের জন্য অপেক্ষা করছিলাম। বাবু পকেটমার নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখার পরও খুব দক্ষতার সাথে কয়েকশত টাকা সমেত ব্যাগটা নিয়ে যেতে সক্ষম হল।
পকেটমাররা এত দক্ষ হয় তা ভাবতেও পারিনি। ফুটপাতে দাড়িয়ে একটা বই পড়ছিলাম। এর মধ্যেই চোর তার কর্ম সমাধা করে ফেলেছে।

বাধ্য হয়ে একবন্ধুর দোকানে গেলাম একটা ব্যাগ ক্রয় করতে। তিনি আমার পছন্দের একটি চামড়ার ব্যাগ ধরিয়ে দিলেন। টাকা নিতে চাচ্ছিলেন না অনেক কষ্ট করে ক্রয় মূল্যটা দিতে বাধ্য করলাম। যার ক্রয় মূল্য ছিল ২২০ টাকা। যারা চামড়ার ব্যাগ ব্যবহার করেন তাদের ভাল জানার কথা একটা চামড়ার মানিব্যাগের মূল্য কত। ৩০০ টাকার কমে মানিব্যাগ পাওয়াই কষ্টকর।

এক জোড়া বাটা জুতা ব্যবহার করি।সঙ্গত কারণে দীর্ঘদিন বাটা ব্যবহার করতাম না। ইউনিলাভারসহ বেশ কিছু আন্তর্জাতিক কোম্পানীর পন্য এখনো ব্যবহার করিনি। যাক, সেটা আলাদা বিষয়। পায়ের জুতা জোড়ার দাম হল ৪৯০ টাকা। ফলে বন্ধু বান্ধব অনেকে একে রেক্সিন বলে থাকে। একলোক থেকে নিয়মিত জুতা কালি করে থাকি। পায়ের জুতা দুইটার ব্যাপারে তাকে জিজ্ঞাসা করলে সেও বললো স্যার জুতাগুলো আসলে রেক্সিনেরই। বাটার সোলটা ভাল। আর এখানে চামড়ার ব্যবহার আছে তবে খুব কম।

একদিন বন্ধু কথার প্রসঙ্গে তো বলেই ফেলল, আরে ভাই ৫০০ টাকা দিয়ে চামড়ার জুতা পাওয়া যায়? নূন্যতম এক হাজার টাকার কমে চামড়ার জুতা হয় না। হুমম, বুঝতে পারলাম।

বন্ধুদের অনেকেই বেল্ট ব্যবহার করে। এক বন্ধুকে জিজ্ঞাসা করলাম একটা চামড়ার বেল্টের দাম কত? তিনি বললেন, মোটামুটি মানের হলে ৪০০ টাকার কম না।

উৎপাদিত চামড়ার মূল্য সম্পর্কে একটা আইডিয়া পেলাম। চামড়া এটা ধনীদের ব্যবহার্য পন্য। ধনীরাই চামড়া ব্যবহার করে থাকে। উল্লেখিত তিনটা আইটেম ছাড়া চামড়া দিয়ে আরো অনেক পন্য হয়। আন্তর্জাতিকভাবে চামড়ার মূল্য আরো বেশী। আর এ চামড়ার ব্যবহার যে শুধু এ শতাব্দিতে তা কিন্তু নয়। মিসরীয় বা চীন সভ্যতার প্রাচীনকাল থেকেই চামড়ার ব্যবহার হয়ে আসছে। তৎকালে চামড়ার ব্যবহার হতো মানুষের প্রয়োজনে। আর এখন প্রয়োজনের তুলনায় বিলাসিতার জন্যই মানুষ চামড়া ব্যবহার করে থাকে।

প্রয়োজনীয় পন্যের তুলনায় বিলাসীয় পন্যের মূল্যটাই সবসময় বেশী হয়ে থাকে।
আমাদের বাড়ীর দক্ষিণ পাশে একটি খাল রয়েছে। এটিকে গোমতির শাখা বললেও ভুল হবে না। ছোট সময় এ খাল দিয়ে গরুর অনেক ভূড়ি ভেসে যেতে দেখেছি। এখন এ গরুর ভূড়ি অনেকের নিকটই প্রিয়। ঢাকা শহরে তো আলাদা করে বিকালে চটপটির মতও বিক্রয় হয়। আর কসাই থেকে যখন ক্রয় করতে হয় তখন ২২০ টাকা কেজি ধরে ক্রয় করতে হয়। একটা গরুতে ৫-৬ কেজি ভুড়ির চামড়া হয়। সে হিসাবে একটা গরুর মধ্যে এক সময়ের ফেলে দেওয়া ভুড়ির দামও এখন ১৩-১৪ শত টাকা।

আমি ৬০ টাকা কেজি গরুর গোস্ত দেখেছি। নিজেরা ক্রয় করে খেয়েছি। আর এখন গরুর গোস্ত ক্রয় করতে হয় ৫০০ টাকা করে। এক সময় গরুর যে হাড়গুলোকে ফেলে দেওয়া হত তাও কিন্তু এখন ক্রয় বিক্রয় হয়। এর দামও কিন্তু কম না।

গরুর ভুড়ি দামী হয়েছে। হাড়গুলো মূল্যবান হয়েছে। গোস্তের দাম বহুগুন বেড়েছে। গরুর চামড়ার উৎপাদিত পন্যের মূল্য আকাশচুম্বী হয়েছে।
তবে গরীবের অধিকার গরুর চামড়ার দাম কিন্তু বহুগুণ কমেছে। একটা বড় গরুর চামড়া একটা ছোট গরুর বটের মূল্যেও বিক্রয় করা যায় না। গরীবের হক বলে কথা। গরীবের পক্ষে কথা বলার মতও কেউ নাই।
অথচ একটা চামড়া দিয়ে কত ডজন মানিব্যাগ হয়? একটা চামড়া দিয়ে কত জোড়া জুতা বানানো যায়? বা কত ডজন বেল্ট বানানো যায়?
তাহলে চামড়ার দাম দিন দিন কমবে কেন? ট্যানারী স্থানান্তরের দোহায় দিয়ে গরীব ঠকিয়ে কোন লাভ আছে? এটা কি গরীবদের অধিকার চুষে খাওয়া নয়? এটা কি গরীবের অধিকার কেড়ে নিয়ে ধনীদের বিলাসিতা নয়?
চামড়া একটা স্বতন্ত্র শিল্প। এ শিল্পকে কেন্দ্র করে অনেক কিছুই করা যায়। তবে মনে রাখতে হবে যে, দেশের ৬০/: চামড়াই কালেক্ট হয় কোরবানীর সময়। আর কোরবানীর সময়ের চামড়াটা গরীবরাই পেয়ে থাকে। এখানে চামড়ার মূল্য হ্রাস করে কোনো ভাবেই গরীবের পেটে লাথি দেওয়া চলবে না। গরীবের অধিকার হনন করা চলবে না। দেশের বানিজ্য বিভাগ এ ক্ষেত্রে সচেতনতার পরিচয় দিতে হবে। গরীবের স্বার্থে আঘাত করে বড় হওয়া সম্ভব নয়। তাদের স্বার্থ অক্ষুন্ন রেখে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে হবে। ভোটের রাজনীতিতে যেন এর একটা প্রভাব ফেলে গরীবের স্বার্থ সংরক্ষন করা যায় তার একটা প্রচেষ্টা ইসলামপন্থীদেরই করতে হবে।