হিজরত ও হিজরী নব-বর্ষ: আদর্শিক ত্যাগে প্রেরণা যোগায়

হিজরত ও হিজরী নব-বর্ষ: আদর্শিক ত্যাগে প্রেরণা যোগায়

ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম |

মুনির আহমদ সাবেক নির্বাহী সম্পাদক : মাসিক মঈনুল ইসলাম


হিজরী সনের প্রথম মাস ‘মুহাররম’ আবার ফিরে এসেছে। মুসলিম উম্মাহর কৃষ্টি কালচারে হিজরী সন ও তারিখের গুরুত্ব অপরিসীম। হিজরী সন গণনার সূচনা হয়েছিল ঐতিহাসিক এক অবিস্মরণীয় ঘটনাকে কেন্দ্র করে। রাসলুল্লাহ্ (সা.) এবং তদীয় সাথীবর্গের মক্কা থেকে মদীনায় হিজরতের ঐতিহাসিক ঘটনাকেস্মরণীয় রাখার জন্যই আরবী মুহাররম মাসকে হিজরী সনের প্রথম মাস ধরে সাল গণনা শুরু হয়। দ্বীনের স্বার্থে মক্কা থেকে মদীনায় রাসলুল্লাহ্ (সা.) এবং সাহাবায়ে কিরামের হিজরত থেকেই হিজরী সনের সূচনা। মুসলমানগণ হিজরী সনকে ভিত্তি করে বিভিন্ন ধর্মীয় বিধি-বিধান, যথা- রমযানের রোযা, ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আয্হা, শবে-বরাত, শবে-ক্বদর, শবে-মি’রাজ এবং বিভিন্ন মাসের নফল রোযা ইত্যাদি পালন করে থাকেন।

উল্লেখ্য, ঐতিহাসিক দিন বা ঘটনা ভিত্তিক বহু সনই বিশ্বে প্রচলিত হয়ে আসছে। উদাহরণতঃ খ্রীস্টীয় স্মারক সন খ্রীস্টান ঐতিহ্যের সাথে সম্পৃক্ত। জাতিগতভাবে কোন জাতির পক্ষেই আপন ঐতিহ্য ত্যাগ করা সম্ভব নয়। তেমনিভাবে মুসলিম পরিবারগুলোও রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রচলিত অন্যান্য সন তারিখ অনুসরণ করা সত্ত্বেও সূচনালগ্ন থেকেই হিজরী সনকে পাশাপাশি গুরুত্বের সাথে পালন করে থাকেন। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও আনন্দ-উৎসবসহ সব ক্ষেত্রেই মুসলিম উম্মাহ্ হিজরী সনের অনুসারী। খ্রীস্টীয় সন, বাংলা সনসহ অন্যান্য সনের প্রচলন সত্ত্বেও আরবী সনের দিন মাসের হিসাব চর্চা এতটুকুনও ম্লান হয়নি।

হিজরী সন মুসলিম উম্মাহ্কে মনে করিয়ে দেয় প্রিয়নবী রাসলুল্লাহ্ (সা.)এর মক্কা থেকে সুদর মদীনায় হিজরতের ঘটনাকে। বস্তুতঃ রাসলুল্লাহ (সা.)এর মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করার সেই ঐতিহাসিক এবং গুরুত্বপর্ণঘটনার স্মৃতিবাহী হচ্ছে হিজরী সন।
এ হিজরতের মধ্য দিয়েই ইসলাম এক নবশক্তি লাভকরেছিল। এতদিন পর্যন্ত মুসলমানরা কেবল আÍরক্ষাই করে এসেছে, মুখবুজে জুলুম অত্যাচারসহ্য করে এসেছে। অবশেষে হিজরতের মধ্য দিয়ে এতসব জুলুম-অত্যাচারেরপ্রতিরোধ ও প্রতিকারের ক্ষমতা তাঁদের অর্জিত হয় এবং রাষ্ট্রশক্তি হিসাবে ইসলাম আÍপ্রকাশ করে। হিজরত পরবর্তী সময়েমুসলমানরা ক্রমেই সুসংহত ও সম্প্রসারিত হয়েছে। ইসলাম বিশ্বজনীন রূপে ভাস্বর হয়ে উঠেছে। ইসলামের অবদানে বিশ্ব সভ্যতা সমৃদ্ধশালী হয়েছে।

এক সময়ে মুসলমানরা বিশ্বের এক অজেয় শক্তিতেপরিণত হয়েছিল। জ্ঞান বিজ্ঞানের সকল শাখাকে অবিস্মরণীয় অবদানেসমৃদ্ধ করে তুলেছিল। তার শুভ সচনা এই হিজরত থেকেই। হিজরত পর্ব প্রাথমিক যুগের মুসলমানদের ন্যায় বর্তমানেও বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলেমুসলমানগণ ইহুদী-খ্রীস্টানদের হাতে নিপীড়িত, নিগৃহিত ও লাঞ্ছিত হচ্ছে। এ থেকে মুক্তি পেতেহলে সে সময়কার মুসলমানদের শিক্ষায় শিক্ষিত হতে হবে এবং ক্রমান্বয়ে সুসংহত হয়ে নিজ পায়েত্যাগের মানসিকতা নিয়ে দাঁড়াতে হবে।

আমাদের এদেশে ইসলাম প্রচার শুরু হয় হযরত উমর (রাযি.)এর খিলাফত কাল থেকেই। তখনকার ইসলাম প্রচারকগণই এদেশে হিজরী সনের প্রচলন করেন। হিজরী সনের বিভিন্ন মাসে ইসলামী বিধি-বিধান থাকার কারণে এদেশের জন-সমাজে হিজরীসনের ব্যাপক প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। যার প্রতিফলন ঘটেছেমুসলমানদের সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে। বাংলাদেশে ও ভারতেপ্রচলিত বাংলা সন সম্পর্কে বলা যায়,হিজরী সনেরই চলমান পথে এক পর্যায়ে সৌরকরণের মাধ্যমে বাংলা সনেরজন্ম। আর হিজরী সনই বাংলাদেশে প্রচলিত একমাত্র সন, যা প্রায় জন্মকাল থেকেই এখানে প্রচলিত রয়েছে।

মুসলমানদের উত্থানের জন্য হিজরত অনিবার্য। তবে হিজরত শুধু নিজেদের বাস্তুভিটা ত্যাগ করা নয়, হিজরত হতে হবে লক্ষ্যাভিমুখী। হিজরত হবে আদর্শিক জিহাদ প্রক্রিয়ার অন্তর্ভুক্ত। যে হিজরত জিহাদে রূপান্তরিত হয় না, বা যে হিজরত নিছক দেশত্যাগ, নিছক আÍরক্ষার কারণেই হয়েথাকে, সে হিজরত মুসলমানদের উল্লেখযোগ্য কোন কল্যাণবয়ে আনে না। যে হিজরত মুসলিম উম্মাহ্র প্রয়োজন পরণ করবে,কেবল সে হিজরতই অর্থবহ ও ফলপপ্রসূ হতে পারে। যে হিজরত মুসলমানদের মধ্যে আদর্শিক শক্তি সঞ্চার করে ঈমানী চেতনা বাড়িয়ে দেয়,ক্রমবর্ধমান ত্যাগে উদ্বুদ্ধ করে, জিহাদের দৃঢ় সংকল্প সৃষ্টি করে জাতীয় জীবনে আলোড়ন তোলে, যাবতীয় স্থবিরতা ও নিষ্পৃহতা কাটিয়ে দেয়, নতুন সমাজ ও সভ্যতা নির্মাণে অনুপ্রেরণা সৃষ্টিকরে, সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে ঐক্যের ভিত্তিকে সুদৃঢ় করে, সর্বোপরি শাহাদাতের প্রেরণাকে শাণিত করে, আজ সে ধরণের হিজরতই মুসলমানদের প্রয়োজন। তাহলে মুসমলমানদের পুনর্জাগরণ ও ইসলামী তাহযীব-তামাদ্দুনের বিকাশ হবে গতিশীল।