নিরহঙ্কার জীবন : মানবিক উৎকর্ষের চাবিকাঠি

ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম |

হাফেজ মুহাম্মদ আবুল মঞ্জুর


সৌহার্দ্য-সম্প্রীতি, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও মমত্ববোধ সামাজিক বন্ধন সুদৃঢ়করণের মূখ্য উপাদান। সেই মূখ্য উপাদানকে সমূলে বিনষ্ট করে যে ভয়াবহ গুণটি পরস্পরের মধ্যে হিংসা-বিদ্বেষ ও অশান্তির জন্ম দেয় সেটি হল অহঙ্কার। অহঙ্কার মানব চরিত্রের একটি নেতিবাচক গুণ। যা মানবজীবনকে ধ্বংসের দিকে ধাবিত করে। আর বিনয়-নম্রতা হল শিষ্টাচারিতার প্রকৃষ্ট অবলম্বন। যা মানুষকে সম্মান ও উন্নতির উচ্চ শিখরে আরোহনে সাহায্য করে। তাই অহঙ্কারমুক্ত বিনয়ী জীবনযাপনে ইসলাম অত্যধিক গুরুত্বারোপ করেছে।
অহঙ্কারী-দাম্ভিক ব্যক্তি মানুষের নিকট যেমন অপ্রিয়, তেমনি আল্লাহর নিকটও অত্যন্ত অপছন্দনীয়। এবিষয়ে কুরআন মজীদে আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন, ‘অহঙ্কারবশে তুমি মানুষকে অবজ্ঞা করিওনা। আর জমিনের ওপর গর্ব ভরে চলোনা। নিশ্চয়ই আল্লাহ কোন আত্ম- অহঙ্কারী দাম্ভিক মানুষকে ভালোবাসেন না।’ (সূরা- লুকমান, আয়াত-১৮)।
অহঙ্কারের সাথে চলাফেরা করলেই সম্মানের উচ্চাসনে আরোহিত হওয়া যায় বলে অহঙ্কারী ব্যক্তির মাঝে যে ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে তার অবসান ঘটাতে আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন, ‘পৃথিবীতে দম্ভ, গর্ব ভরে পদচারণা করোনা। নিশ্চয়ই তুমি এ জমিনকে কখনই বিদীর্ণ করতে পারবেনা এবং উচ্চতায় তুমি কখনো পাহাড় সমান হতে পারবেনা।’ (সূরা- বনী ইসরাঈল, আয়াত- ৩৭)।
বিশ্ব নবী হযরত মুহাম্মদ (স.) বহু হাদীসে অহঙ্কার বর্জন করে বিনয়-নম্রতার মত সৎ গুণাবলী অর্জনের জন্য সুস্পষ্ট তাগিদ দিয়েছেন। সেই সাথে তিনি নিরহঙ্কারী ব্যক্তির পুরস্কার এবং অহঙ্কারী ব্যক্তির পরিণামের কথাও বর্ণনা করেছেন।
হযরত ইমাম ইবন্ হাম্মাদ (র.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (স.) ইরশাদ করেছেন, ‘আল্লাহ আমার নিকট এই মর্মে ওহী প্রেরণ করেছেন যে, তোমরা পরস্পরে বিনয়ী হবে, এমনকি তোমরা একের উপর অন্যে অহঙ্কার করবেনা। এবং একে অন্যের প্রতি বড়াই করবে না।’ (সহীহ মুসলিম, সুনানে আবু দাউদ ও সুনানে ইবনে মাজাহ)
আল্লাহ তা’আলা বিনয়ী ব্যক্তির মর্যাদাকে করেন সমুন্নত, আর অহঙ্কারী ব্যক্তিকে করেন অপদস্থ। এসম্পর্কে হাদীস শরীফে এসেছে, হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (স.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি তার মুসলমান ভাইয়ের সাথে বিনয়ী আচরণ করে, আল্লাহ তার মর্যাদা সমুন্নত করেন। যে ব্যক্তি নিজেকে অন্যের ওপর প্রাধান্য দেয়, আল্লাহ তাকে অপদস্থ করেন।’ (তাবারানী কর্তৃক আল-মু’জামুল আওসাত গ্রন্থে বর্ণিত)।
নিরহঙ্কারী ব্যক্তির প্রতিদান বিষয়ে রাসূল (স.) ইরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি নিরহঙ্কারী, সম্পদ আত্মসাৎকারী নয় এবং ঋণমুক্ত সে জান্নাতী।’ (সুনানে তিরমিযী)।
অন্যদিকে অহংকারী ব্যক্তির অশুভ পরিণাম সম্পর্কে রাসূল (স.) ইরশাদ করেছেন, ‘যার অন্তরে বিন্দু পরিমাণ অহংকার থাকবে সে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।’ (সহীহ মুসলিম)।
কিভাবে অহঙ্কার নামক এই মারাত্মক ব্যাধি থেকে মুক্তি লাভ করে আল্লাহর ভালোবাসা ও জান্নাতের অধিকারী হওয়া যায় সে পন্থা বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (স.) আমাদেরকে শিখিয়ে গিয়েছেন। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (র.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (স.) ইরশাদ করেছেন, ‘আগে সালাম প্রদানকারী গর্ব- অহঙ্কার থেকে মুক্ত।’ (বায়হাকী)।
এই হাদীস শরীফ থেকে প্রতীয়মান হয়, ছোট-বড়, ধনী-গরীব, রাজা-প্রজা নির্বিশেষে পারস্পরিক সালাম বিনিময়ের মাধ্যমেই অহঙ্কার থেকে মানব সমাজের মুক্তি সম্ভব। ধনী-গরীব, রাজা-প্রজা, গোলাম-মুনিব ভেদাভেদ ভূলে গিয়ে একই কাতারে দাড়িয়ে নামাজ আদায়ের যে বিধান ইসলামে রয়েছে তাও অহঙ্কার মুক্তির এবং সাম্য-সম্প্রীতির সমোজ্জল দৃষ্টান্ত।
এ প্রসঙ্গে বিশ্ব বরেণ্য কবি আল্লামা ইকবাল যথার্থই বলেছেন, ‘এক ছফেতে ভূক্ত হত গয্নবী মাহমুদ ও আয়ায/ফরক নাহি থাকত তখন বান্দা কিংবা বান্দা নাওয়াজ/গোলাম, মনিব, ধনী, গরীব প্রভেদ নাই থাক্ত পাছে/ সবাই তাদের এক হইত আসত যখন তোমার কাছে।’
নামাজের কাতারে হিংসা-বিদ্বেষ পরিত্যাগ করে যাবতীয় ভেদাভেদ ভূলে গিয়ে ধনী-গরীব, গোলাম-মনিব ও রাজা-প্রজার যে অহঙ্কারমুক্ত সহাবস্থান দেখা যায়, তেমনই সহাবস্থানের পরিবেশ ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনের সর্বক্ষেত্রে সৃষ্টি হলেই হানা-হানি, অনাচার-অবিচার, নেতৃত্ব-কতৃত্বের দ্বন্দ, বিভেদ-বিচ্ছেদ ও বৈষম্যের অবসান ঘটবে। সাম্য, শান্তি ও সম্প্রীতির আলোয় উদ্ভাসিত হবে মানব সমাজ। অতএব আসুন! অহঙ্কারী নয়; বিনয়ী জীবনযাপনে অভ্যস্ত হই। ছড়িয়ে দিই সাম্য ও শান্তির বার্তা।


লেখক:
খতিব, শহীদ তিতুমীর ইনষ্টিটিউট জামে মসজিদ, পৌরসভা, কক্সবাজার।
যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, কক্সবাজার ইসলামী সাহিত্য ও গবেষণা পরিষদ।