দেওবন্দের অলিগলি (১) | মোঘল আমলের ঐতিহাসিক ছাত্তা মসজিদ

দেওবন্দের অলিগলি (১) | মোঘল আমলের ঐতিহাসিক ছাত্তা মসজিদ

ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম | মোস্তফা ওয়াদুদ  দেওবন্দ থেকে


দারুল উলুম দেওবন্দের নামের সাথে ইতিহাসের পাতায় যে মসজিদটির নাম উচ্চারণ করা হয় সেটি হলো “ছাত্তা মসজিদ”। এটি শুধু একটি মসজিদ নয়। একটি আন্দোলন। একটি সংগ্রাম। একটি জাতি গঠন। একটি ইবাদতখানা। একটি খানকাহ। একটি দরসগাহ। একটি স্মরণীয় ইতিহাস।

সময়ের বাঁকে বাঁকে চলছে জীবন। মানুষের দিনকাল। কেটে যাচ্ছে যুগের পর যুগ। জাতির পর জাতি । বংশের পর বংশ। পৃথিবীর সূচনা থেকে এ নিয়ম চলমান। যেভাবে ঘড়ির কাঁটা চলমান। কখনো বিরতি নেই। কখনো অলসতা নেই । বরং নিরলস ও বিরতিহীন পরিবর্তন হচ্ছে যুগের চাকা।

১৬৫০ সাল। ভারতীয় উপমহাদেশের স্বর্ণকাল। বাদশাহ আলমগীর রহ. এর শাসন। দরবারে সব সময় থাকতো আলেম উলামাগণ। দেশ চলতো ইসলামী রীতি নীতি মেনে। ধর্মীয় শাসন তখন সর্বদা। ঘরের মহিলা থেকে মুদি দোকানদার। রাস্তার কুলি থেকে সরকারী অফিসার। ক্ষেতের কৃষক থেকে দিনমুজুর শ্রমিক। সবার কাছেই ছিলো ধর্মীয় বিধান। মেনে চলতেন ইসলামী অনুশাসন। মানতেন সর্বজন শ্রদ্ধেয় বাদশাহ আলমগীর রহ. কে।

বাদশাহর দরবারে অনেক আলেমদের মাঝে শায়খ আব্দুর রহমান ইবনে চান্দ উসমানী রহ. ও ছিলেন একজন। ইতিহাসের পাতায় তাঁর নাম বাদশাহ নামের পাশেই পাওয়া যায়। তাঁর বসবাস ছিলো দেওবন্দ নগরীতে তিনি বাদশাহর অনেক প্রিয় মানুষ। তাঁর পরামর্শ বাদশাহ গুরুত্বসহ মানতেন।

১৬৮০ সাল। ক্ষমতায় আরোহণের ঠিক ত্রিশ বছর পর। বাদশাহ হুকুম জারী করলেন যেখানে যেখানে মসজিদ বানানো প্রয়োজন বানিয়ে নাও। রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে নির্মাণ খরচ সরবরাহ করা হবে। বাদশাহর ঘোষণা বিদ্যুৎবেগে
সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়লো। যেখানে মানুষের বেশি বসবাস ছিলো। সেখানের লোকজন মসজিদ সঙ্কট অনুভব করে বাদশাহর দরবারে চিঠি লিখলেন। বাদশাহ চিঠি পড়ে মসজিদ বানানোর অনুমতি দিলেন। ইতিহাসের ধারণামতে ১৬৮০ সালের ১৫ জুলাই সারাদেশে একসাথে ৮০ হাজার মসজিদ বানানোর চিঠি অনুমোদন করেছেন বাদশাহ। ভারতীয় উপমহাদেশ তখন বর্তমানের ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, ভূটান, নেপাল মোট ৬ টি দেশ নিয়ে একীভূত ছিলো।
(তারীখে সাহারানপুর, উর্দূ)

দেওবন্দ এলাকাটি মূলত ১ হাজার বছর পূর্বে আবাদকৃত। কোনো কোনো বর্ণনামতে ১৫ শত বছর পূর্বে।
(তারীখে দেওবন্দ, উর্দূ)

বর্তমানে দেওবন্দ থানা মসজিদের ভিস্থিপ্রস্তর ফলকে ফার্সীর প্রাচীণ ভাষায় ভাঙ্গা ভাঙ্গা হরফে লেখা সংখ্যাটি ৮১৬ সাল বুঝা যায়। তারীখে দারুল উলুম কিতাবের ইখতিলাফ ও মসজিদের উপস্থিতি দেখে অনুমান করা যায় আব্বাসী খেলাফতের সময় এ মসজিদ নির্মিত। সে হিসেবে প্রায় ১ হাজার সাল পূর্বে দেওবন্দ নগরী আবাদ হয়েছে। দেওবন্দের নামকরণের ইতিহাসেও এমনটা পাওয়া যায়। নামকরণ নিয়ে সম্পূর্ণ আলাদা পর্ব থাকবে ইনশাআল্লাহ।

দেওবন্দ এলাকার জন্য থানার পাশের লাল মসজিদটিই যথেষ্ঠ ছিলো। কিন্তু বাদশাহ কর্তৃক নিযুক্ত “জনাব চৌনক” নামে একজন সরকারী কর্মচারী ছিলেন। যিনি অত্যান্ত পরহেজগার ছিলেন। পাঁচওয়াক্ত নামাজ জামাতের সাথে পড়তেন। এমনকি কখনো তাঁর তাহাজ্জুদের নামাজও ছুটতো না। চিঠি লেখার সময় তিনিও মসজিদের আবেদন করে একটি চিঠি লিখলেন। অনেক চিঠির মাঝে তাঁর চিঠিটিও অনুমোদন করা হলো। তাঁর চিঠিটি অবশ্য বাদশাহর দরবারে থাকা আলেম শায়খ আব্দুর রহমান ইবনে শায়খ চান্দ উসমানী রহ. এর মাধ্যমে অনুমোদন করা হয়।

এরপর বাদশাহী সিস্টেমে বানানো হলো মসজিদটি। নাম দেয়া হলো লোকটির নাম ও বাদশাহর দরবারে থাকা আলেম শায়খ আব্দুর রহমান এর বাবা শায়খ চান্দ উসমানী রহ. নামের সাথে মিলিয়ে। অর্থাৎ উনার নামের ‘চাঁ’ ও লোকটির নামের ‘নক’ নিয়ে পুরো নাম হলো “চাঁনক মসজিদ”। এরপর ধীরে ধীরে মানুষজন সহজ করে বলতে লাগলো চাঁত মসজিদ। যুগের পরিবর্তনে ১৮৫০ সালের পরে বর্তমানের নাম হয়ে গেলো “ছাত্তা মসজিদ”। হাজী আবেদ রহ. এর পরে এসে সারাদেশে এটি এ নামেই প্রসিদ্ধ হয়ে যায়। সে থেকে প্রায় ১৭০ বছর ধরে মানুষ এটিকে ছাত্তা মসজিদ হিসেবেই ডেকে আসছে। তবে নামকরণ নিয়ে আরো একটি মত পাওয়া যায় মাত্র। সেটি হচ্ছে, মসজিদের তিনটি গম্বুজ। যা মসজিদের ছাদের উপরে। সেই তিনটি গম্বুজকে উর্দূতে “সেহ ছাদ” নাম দেয়া হয়। এই “সেহ ছাদ” থেকে “ছাত্তা”। তবে এটি ততটা গ্রহণযোগ্য মনে হয় না। কারণ এ মসজিদ যখন বানানো হয়েছে তখন এদেশে উর্দূ ভাষার প্রচলন ততটা ছিলো না।
(তারীখে দেওবন্দ, উর্দূ)

প্রাচীণ ছাত্তা মসজিদ : মোগল আমলে যেভাবে মসজিদ বানানো হতো। এটিও সেভাবেই বানানো হয়েছে। উপরে বিশালাকার তিনটি গম্বুজ। ভিতরে মাত্র তিনটি কাতার। মেহরাবের দিকটা বেশ বড়। অন্য যে কোনো মসজিদের তুলনায় অনেক লম্বা। দেয়ালগুলো সাড়ে তিনফিট চওড়া। কোনো রডের ব্যবহার ছাড়া শুধু ইট ও পাথরের চুনা দিয়ে মসজিদটি নির্মাণ করা হয়েছিলো। পাতলা ইটগুলো বানানো হয়েছে অত্যন্ত মজবুত সিমেন্টের বালু দিয়ে। হিন্দুস্থানের অধিকাংশ স্থাপনাও এরকম ইট দিয়েই নির্মাণ করা হতো। বর্তমানে যেসব স্থাপনা নজরে আসে তার অধিকাংশই রডহীন শুধু ইট ও সফেদ পাথর দিয়ে বানানো।

মসজিদের বাহিরের দিকটা ছিলো বেশ আকর্ষণীয়। মনোমুগ্ধকর। সহজে যে কাউকে আকৃষ্ট করতো। সুরম্য পাথরে সাজানো হয়েছিলো বাইরের দিকটা। বাইরে ছিলো একটি ডালিম গাছ। যার ছায়ায় বসে সর্বপ্রথম দারুল উলুম দেওবন্দের সূচনা করা হয়েছিলো। গাছটি গত ৫ বছর আগেও ছিলো। বর্তমানে নেই।
মসজিদের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে ছোট্ট একটি বাঁকা রাস্তা। দেওবন্দে জনশ্রতি আছে, ছাত্তা মসজিদের পাশ দিয়ে বর্তমানে যে চিকন বাঁকা রাস্তাটি বয়ে গেছে এটি তখনো ছিলো। তবে এখনকার মতো নয়। তখনকার মতো। পথিকেরা হেঁটে যেতো এ পথে। মসজিদের ডানপাশে ছিলো একটি কূপ। আর বামপাশে বড় একটি হাউজ। পরবর্তীতে কুপটাকে ভরাট করে ইমাম সাহেবের জন্য কামরা বানানো হয়।
আর বামপাশে হাউজটি দীর্ঘদিন রয়ে যায়। এ হাউজ থেকেই দেওবন্দ এলাকা আবাদ হওয়ার পর অনেক মানুষ নিজেদের প্রয়োজন সাড়তো। পথিকেরা নিয়ে নিতো প্রয়োজনীয় পথ্য। পর্যাপ্ত পানি নিয়ে আবার পথ চলতো। এ হাউজটি বহুকাল পর্যন্ত ছিলো। দারুল উলুম প্রতিষ্ঠা হওয়ার পরেও। তবে ১৯৪০ সালে আফ্রিকি মঞ্জিল ক্বাদীম নামে হাউজের উপরে একটি ভবন নির্মাণ করা হয়। বর্তমানে যেটি হুজুরদের কোয়ার্টার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

মসজিদের ডানপাশের যে কূপটি ভরাট করে ইমাম সাহেবের কামরা বানানো হয়েছিলো সেখানেই নির্জন ইবাদাত করতেন হুজ্জাতুল ইসলাম, বানীয়ে দারুল উলুম দেওবন্দ আল্লামা কাসেম নানুতুবী রহ.। কামরার সামনে “খালওয়াত গাঁ” নামে একটি ফলক লাগানো আছে। বর্তমানে এখানে দারুল উলুমের মুহাদ্দিস, আওলাদে রাসূল, জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের সভাপতি কারী উসমান সাহেব থাকেন। তবে রমজান মাসে সাইয়েদ আরশাদ মাদানী সাহেব এ কামরায় ইতেকাফ করেন।

মসজিদের দক্ষিণপাশে রয়েছে একসময়ের মসজিদের ইমাম, বানীয়ে দারুল উলুম দেওবন্দ প্রথম মুহতামিম হাজী আবেদ হুসাইন রহ. ও প্রথম সদরুল মুদাররিসীনদের একজন মাওলানা ইয়াকুব নানুতুবী রহ. এর খালওয়াত গাঁ (নির্জন ইবাদাতখানা)।

বর্তমান ছাত্তা মসজিদ : এখানে বর্তমান বললেও এটা কিন্তু বর্তমান নয়। এখন যে সিস্টেমে মসজিদটি দেখতে পাচ্ছি তা বহু পুরোনো। সংস্কার করে এ রুপ দেয়া হয়েছে। মসজিদটি অবকাঠামোগত কোনো পরিবর্তন করা হয়নি। ভিতরের মূল তিন গম্বুজবিশিষ্ট জায়গাকে আপনস্থানে রেখে সামনে পেছনে বাড়ানো হয়েছে। এবং এটা করা হয়েছে দারুল উলুমের ৫০ বছরের মুহতামিম ক্বারী তৈয়্যব সাহেব রহ. এর যুগে। ১৯৭৯ সালে। মসজিদের ভিতরে যারা যারা মসজিদ সংস্কারে অংশ নিয়েছেন তাঁদের নামও উল্লেখ করা আছে ডানপাশের উপরের দেয়ালে। যেমন- আলীজনাব হাজী মুহাম্মদ আহসান রহ., হাজী আব্দুল ওয়াজেদ মুরাদাবাদী রহ., হাফেজ আনওয়ারুল ইসলাম সাহানপুরী রহ., ক্বারী আব্দুল করীম দেওবন্দী রহ., জনাব তাজাম্মুল হোসাইন রহ., হাজী আব্দুল ওয়াহহাব রহ.,।

সংস্কারের সময় সামনে ৫ কাতার বৃদ্ধি করা হয়। আর পেছনে ৪ কাতার। ডালিম গাছটিকে ঠিক রেখে টানানো হয় দেয়াল। তখন ডালিম গাছটি মসজিদের ভিতরে পড়ে যায়। বর্তমানে ডালিম গাছের জায়গায় ঠাণ্ডা পানির ব্যবস্থা করা হয়েছে।

ইতিহাস থেকে মূল্যায়ণ : ইতিহাসের আলোকে দেখলে দেখা যাবে বিশ্বখ্যাত বিদ্যাপীঠ দারুল উলুমের প্রতিষ্ঠার কথা যখনি আসবে তখনি ছাত্তা মসজিদের নাম চলে আসে। এর কারণ কি? এর কারণ হলো, দারুল উলুম প্রতিষ্ঠা হয়েছে ছাত্তা মসজিদকে কেন্দ্র করেই। ছাত্তা মসজিদকে ঢাল বানিয়ে তৈরি হয়েছে দারুল উলুম। দারুল উলুম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠার জন্য প্রথম পরামর্শ হয়েছিলো ছাত্তা মসজিদে। প্রথম কালেকশনও হয়েছিলো ছাত্তা মসজিদ থেকেই। দারুল উলুমের প্রথম উস্তাদ মাহমুদ সাহেবের প্রথম রাত্রটি যাপন হয়েছিলো ছাত্তা মসজিদেই। প্রথম খাবারটিও ছাত্তা মসজিদ থেকেই ব্যবস্থা হয়েছিলো। প্রথম দরসটিও শুরু হয়েছিলো এ ছাত্তা মসজিদ থেকেই। যে দরস নিয়েছিলেন প্রথম ছাত্র শায়খুল হিন্দ মাহমুদ হাসান দেওবন্দী রহ.। মোটকথা ছাত্তা মসজিদ ও দারুল উলুমের প্রতিষ্ঠা দুটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। একটি অপরটির ছাড়া ইতিহাস অসম্পূর্ণ। তাই ঐতিহাসিকগণ যেভাবে দারুল উলুমকে মূল্যায়ণ করেন। ঠিক একইভাবে ছাত্তা মসজিদকেও মূল্যায়ণ করেন।

পরবর্তী পর্বে থাকছে : দেওবন্দ নামকরণ যেভাবে হয়েছে।