দেওবন্দের অলিগলি (২) | দেওবন্দকে কেনো দেওবন্দ বলা হয়?

দেওবন্দের অলিগলি (২) | দেওবন্দকে কেনো দেওবন্দ বলা হয়?

ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম | মোস্তফা ওয়াদুদ  দেওবন্দ থেকে


দেওবন্দ। একটি গ্রাম। একটি ইউনিউয়ন। একটি কসবা। একটি উপশহর। একটি নগরী। ছোট্ট একটি এলাকা। আজ থেকে হাজার বছর পূর্বে দেওবন্দের জন্ম। মানুষের আবাদ। আদমের বসবাস। পথচারীর চলাচল।

দেওবন্দ নগরী একটি নাম। একটি ইতিহাস। একটি সংগ্রাম। একটি আন্দোলন। একটি স্বাধীনতা। একটি মুক্তিকামী জাতির রাহবার। একটি উদ্যমী ও সাহসী জাতির সিপাহসালার। একটি কাপুরুষ শাসকের রক্তচক্ষু। জালিমের বিরুদ্ধে আপসহীন যুদ্ধ। মজলুমের পক্ষে অবিরাম মোকাবেলা। আদর্শের জন্য প্রাণ উৎসর্গকারী। ভাবালেশ জাতির মুক্তির চেতনা। নির্যাতিত মানুষের আস্থা। স্বাধীনতাকামী বনি আদমের চিরবন্ধু। ধ্বংশযজ্ঞ রাষ্ট্রের নবপ্রাণ।

দেওবন্দকে মানুষ কতভাবে চিনে। তার কোনো ইয়ত্তা নেই। দেওবন্দ কারো কাছে ইলমের বস্তী। কারো কাছে শিক্ষা-সংস্কৃতির নগরী। কারো কাছে দেওবন্দ হিন্দুস্থানের লণ্ডন। কারো কাছে আবার খোঁজে পাওয়া হারানো ধন। দেওবন্দকে কেউ চিনে আমলের বুনিয়াদ হিসেবে। কেউ চিনে উচ্চাঙ্গের আখলাখের নমুনা হিসেবে। কেউবা ভাবে দেওবন্দ একটি আদর্শ নাগরিকের ফ্যাক্টরি। কেউ বলে দেওবন্দ হলো নববি আলোর নগরী।

দেওবন্দ সেতো ফুলের রাজ্য। মধুভরার যার তন্দ্রে তন্দ্রে। সুবাস যান বন্ধ্রে রন্ধ্রে। মৌমাছিরা যেখানে আসে ঝাঁকে ঝাকে। বাসা বাঁধে মনের সুখে। হৃদয়ের আবেগ ভালবাসা, শ্রম, সময় সবকিছু দিয়ে গঠন করে নিজেকে। দেওবন্দ একটি আমলের লালনভূমি। যেখানে ইলম, আমল, আখলাক, হাফেজ, ক্বারী, মাওলানা, মুফতি, মুহাদ্দিস, মুফাসসির, লেখক, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, কলামিস্ট, জগদিখ্যাত বুযুর্গদের জন্ম দেয়া হয়। গঠন করা জাতীর অতন্দ্রপ্রহরী হিসেবে। শত শত আধ্যাত্মিক রাহবারের জন্মকেন্দ্র দেওবন্দ। যারা দেওবন্দকে সারাবিশ্বে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। পরিচিত করেছেন প্রান্তে প্রান্তে। ছড়িয়ে দিয়েছেন পৃথিবীর আনাচে-কানাচে। পৌঁছে দিয়েছেন সব জায়গায়। সব স্থানে। সব দেশে।

যে দেওবন্দের এতো নাম। এতো সুনাম। এতো এতো বিষয়ের জন্মদাতা যে দেওবন্দ। সে দেওবন্দ নগরী সম্পর্কে জানতে কার না ইচ্ছে জাগে। নিশ্চয় সবাই জানতে চাই। দেওবন্দের ইতিহাস। ঐতিহ্য। অবদান। আর এ পর্যন্ত উঠে আসার পেছনের কাহিনী। অথবা শুধু দেওবন্দ নামে যার পরিচিতি সেটা আসলে কি কোনো মাদরাসার নাম? আমরাতো মাদরাসা হিসেবেই জানি। সব মিলিয়ে দেওবন্দকে কেনো দেওবন্দ বলা হয়? অন্য কিছুওতো হতে পারতো। দেওবন্দ নামকরণের কারণ-ই বা কি? এই সব প্রশ্নের উত্তর পাবেন লেখায় ইনশাআল্লাহ। তবে তার জন্য আপনাদেরকে সবগুলো পর্ব মনোযোগ দিয়ে পড়তে হবে।

তাহলে শুরু করা যাক দেওবন্দের ইতিহাস। দেওবন্দের নাম করণের কারণ।

দেওবন্দের নামকরণ নিয়ে অনেক মতামত পাওয়া যায়। আসলে ইতিহাসে দেখা যায় যত মশহুর জায়গা রয়েছে তার সবগুলোর নামের ব্যাপারে মতানৈক্যও বেশি রয়েছে। নিম্মে কয়েকটি মতামত তুলে ধরা হলো।

১. কেউ কেউ বলেন, দেওবন্দেে নাম প্রথমে “দেবীবিলাস” ছিলো। কারণ এখানে সুন্দরী দেবীর একটি মন্দির ছিলো। আর ছিলো একটি জঙ্গল। যাকে বিলাস বলা হতো। পরবর্তীতে দেবী আর বিলাস মিলে সকলে “দেবীবিলাস” নামে জানতো দেওবন্দকে। (তারিখে দেওবন্দ, ৩৭)

২. কিছু লোকের বর্ণনামতে এখানে একটি মন্দির ছিলো। যার নাম “দেবীমুণ্ড” ছিলো। আর ছিলো একটি জঙ্গল। যাকে বলা হতো “বন”। উভয়টি মিলে হলো “দেবীবন”। পরবর্তীতে অধিক ব্যবহারের ফলে মানুষের মুখে “দেওবন্দ” নাম হয়ে যায়। (তারিখে সাহারানপুর, পৃষ্ঠা -২৭)

৩. কেউ বলেন বাদশাহ সুলায়মান আ. এ জঙ্গলে দেও-দানবদের বন্দি করেছিলেন। তাই এর নাম দেওবন্দ। (তারিখে সাহারানপুর, পৃষ্ঠা -১৬০)

৪. কিছু লোক ইরানের ইতিহাসের দিকে ইঙ্গিত করেও একটি নামকরণের কারণ বর্ণনা করেন। যার সারাংশ হচ্ছে, ইরানের আরিনা সম্প্রদায়ের ভাষায় “দেও-দানব” শব্দের ব্যবহার অলৌকিক বিষয়ের উপর হয়ে থাকে। আর জঙ্গল শব্দের ব্যবহার মানুষের উপর করে থাকেন। সুতরাং এ শব্দটিই পরবর্তীতে হিন্দুস্থানে এসে “হাইওয়ান-দানব” হয়ে গেলো। তারিখে হিন্দুস্থান দ্বারা জানা যায়, ইরানের আরিনা সম্প্রদায় দেওবন্দে এসে এখানের মূল বাসিন্ধাদেরকে খোলা ময়দানে সোমবার দিন আচ্ছামত পিটিয়ে মারধর করে ভাগিয়ে দেয়।
সুতরাং দেওবন্দে যেহেতু অধিক জঙ্গল ছিলো। আর মূল বাসিন্ধাদের ভাগিয়ে আরিনা সম্প্রদায় দখল করে নেয়। আর দানবদেরকে জঙ্গলের ভিতরে বন্দি করে রাখে। সেখান থেকে “দেওবন্দ” নাম হয়ে যায়। (তারিখে হিন্দুস্থান, উর্দূ)

এরকম আরো অনেক মতামত পাওয়া যায়। তবে নামকরণের পেছনে সবচেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্য মতামত যেটা পাওয়া যায় সেটা হচ্ছে দ্বিতীয়টি। কারণ দেওবন্দ এলাকায় ছিলো হিন্দুদের বসবাস। যা তারিখে সাহারানপুরে স্পষ্ট উল্লেখ আছে। এবং বর্তমানে দেওবন্দের ভৌগলিক ইতিহাস দেখলে এমনটাই দেখা যায়।
মূলত দেওবন্দ প্রতিষ্ঠার সময় এখানে কোনো মানুষের বসবাস ছিলো না। পরবর্তীতে হিন্দুদের একজন পূজক পূজা করার জন্য একটি মন্দির তৈরি করে। তার মন্দির তৈরির পর লোকদের আবাস বাড়তে থাকে। বন কেটে বানাতে থাকে ঘরবাড়ি। একসময় কিছু মুসলমানেরও আবাস শুরু হয়। পরবর্তীতে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গাও হয়। এরপর তৎকালীন সাহারানপুর জেলার আঞ্চলিক বাদশাহ মুসলাম ও হিন্দুদের জন্য আলাদা জায়গা নির্ধারণ করে দেন। তার নির্ধারিত জায়গাটি এমন ছিলো। “মূল দেওবন্দ শহরের মাঝখান দিয়ে থাকবে বাজার। আর বাজারের একপাশে হিন্দুদের বসবাস। অপরপাশে মুসলমানদের বসবাস থাকবে। (তারিখে দেওবন্দ)

হাজার বছর পূর্বে নির্ধারণ করা বাদশাহর সিদ্ধান্তের সাথে বর্তমানেও অনেক মিল পাওয়া যায়। দেওবন্দ এলাকার ঠিক মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে বাজারটি। আর দু’পাশে দুই ধর্মের মানুষের বসবাস।

দেওবন্দ এলাকাটি উত্তর প্রদেশের মৌজা নাম্বার ২৯, দাগ নাম্বার ৫৮ এ অবস্থিত। পুরো এলাকাটির অবস্থান প্রায় ৩৫ কিলোমিটার জায়গাজুড়ে। দেওবন্দের পশ্চিম পার্শ্বে রেললাইন। দেওবন্দের রেল স্টেশন দিল্লি থেকে পূর্ব দিকে ১৪৪ কিলোমিটার। ভারত ভাগের পূর্বে ১৯৪৭ সালে এ রেলস্টেশন দিয়ে ট্রেন পাকিস্তানের পেশওয়ার পর্যন্ত চালু ছিলো। দেওবন্দ সাহারানপুর জেলায় অবস্থিত। দক্ষিণে মুজাফফরনগর, পূর্বে বিজনুর, পশ্চিমে হরিয়ানা জেলা।
(তারিখে দেওবন্দ, ৪৩ পৃষ্ঠা)

দেওবন্দ একটি অতীত নগরী। মানুষের বসবাসও শুরু হয় অনেক আগে। দেওবন্দে মানুষের আবাদ নিয়ে গতপর্বে বিস্তারিত বলা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, দেওবন্দ প্রায় ১ হাজার বছর পূর্বে আবাদ হয়েছে। সে হিসেবে মানুষের প্রয়োজনমতে এখানে শিক্ষা-সংস্কৃতি, হাঁট-বাজার, রাস্তা-ঘাট, কলকারখানা, মেল ফ্যাক্টরিসহ নিত্য প্রয়োজনীয় সকল বিষয়ের সমাহার ঘটেছে। দেখা যায় দেওবন্দের আশপাশের এলাকার মানুষগুলোও নিজেদের নিত্য প্রয়োজনীয় সামান ও শিক্ষা-দীক্ষার জন্য দেওবন্দে ছুটে আসেন।

দেওবন্দে যেমন আছে ইলমী লাইনের সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান দারুল উলুম দেওবন্দ। তেমনি জেনারেল লাইনেরও অনেক অনেক বড় ভার্সিটি রয়েছে। তবে এখানে ইলমের দিক থেকেই সারা দুনিয়ায় প্রসিদ্ধি হয়ে আছে। দেওবন্দে ছোটো-বড় মিলিয়ে প্রায় ৩৫০ টি মাদরাসা রয়েছে। মসজিদ রয়েছে এর সমমান। বা আরো বেশি। প্রাচীণ মসজিদও রয়েছে অনেক। যেগুলো নির্মাণ করেছেন অতীত কালের বাদশাহগণ। চলবে,,,

আগামী পর্বে পড়ুন : দেওবন্দে প্রাচীণ যত মসজিদ