স্বপ্নের নিঝুম দ্বীপের ভ্রমনতথ্য

ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম | আরিফ সবুজ (নোয়াখালী প্রতিনিধি )


প্রকৃতির নিজ হাতে গড়া স্বপ্নের নিঝুম দ্বীপ। আয়তনে দ্বীপটি খুব বড় নয়, এক ঘন্টা হাটলে দ্বীপের একমাথা থেকে অন্য মাথায় পৌঁছে যাওয়া যায়। প্রায় ১৪,০৫০ একর এলাকা নিয়ে দ্বীপটি গঠিত, ধারণা করা হয় ১৯৫০ এর শুরুর দিকে দ্বীপটি গড়ে ওঠে।

শুরুর দিকে এখানে মানুষ গরু-ছাগল চরাতে আসত। জনশ্রুতি আছে, ওসমান নমে এক লোক প্রথম এ দ্বীপে বসতি গড়ে, সে কারণে অনেকে এ দ্বীপটির নাম চর ওসমান নামেও উল্লেখ্য করে। বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে, নোয়াখালী জেলার দক্ষিণ অংশ বেয়ে জেগে উঠেছে দ্বীপটি। চাইলে যে কোন পর্যটক যে কোন ছুঁটিতে ঘুরে আসতে পারেন নিঝুম দ্বীপ থেকে।

১৯৭০ সালের আগে এখানে কোন স্থায়ী বসতি স্থাপিত হয়নি। ১৯৭০ এর পর থেকে এখানে লোক সংখ্যা বাড়তে শুরু করে। একসময় নিঝুম দ্বীপ হাতিয়ার নির্বাচনী এলাকার অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

নিঝুম দ্বীপ এখন আর নিঝুম নেই, ২০০১ সালে জনসংখ্যা ছিল ১০,৬৭০, বর্তমানে জনসংখ্যা প্রায় ২০,০০০ ছাড়িয়ে গেছে। এখানকার মানুষের প্রধান কাজ মাছ ধরা, এর পাশাপাশি তারা কৃষি কাজ ও গবাদি পশু পালনের সাথেও জরিত। এখানে জেলেরা মাছ ধরে রোদে শুকিয়ে বিক্রি করে। প্রতিদিন প্রায় ৭০-৮০ টি লঞ্চ, ট্রলার এবং ছোট-বড় নৌকা শুটকি মাছ নিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে চলে যায়। বেশির ভাগ সময় যায় চট্টগ্রাম।

নিঝুম দ্বীপটিকে সরকার ২০০১ সালে জাতীয় উদ্ধান হিসাবে ঘোষণা করে। হরিণের অভয়ারণ্য হিসাবে এ দ্বীপটি বিশেষ ভাবে পরিচিত। এ দ্বীপে প্রায় ৫০০০ চিত্রা হরিণ আছে। বাংলাদেশে এরকম অভয়ারণ্য রয়েছে আরো তিনটি। এখানে হরিণ শিকার, চামড়া এবং শিং সংগ্রহ নিষেধ।

নিঝুম দ্বীপের মানুষে জীবন খুবই দুর্বিষহ, দ্বীপে যানবাহন হিসাবে সাইকেল, রিক্সা দু-একটা কদাচিত চেখে পড়ে। রাস্তাও খুব একটা সুবিধার না, উপজেলার সাথে যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম হল নৌকা। নিঝুম দ্বীপ থেকে হাতিয়ায় যেতে ছোট একটি নদী পার হতে হয়। এখানকার বাড়ি গুলো কাঠ,বাঁশ,খড়, টিন দিয়ে তৈরি।

বেঁচে থাকার জন্য তারা নিয়মিত সংগ্রাম করে যাচ্ছে।
হাতিয়া থেকে নোয়াখালীতে আসা-যাওয়ার জন্য দিনে একটি নিদিষ্ট সময়ে রয়েছে একটি মাত্র স্টিমার যা এখানে সি-ট্রাক নামে পরিচিত।

নির্দিষ্ট সময়ে সিট্রাক ধরতে না পারলে আবার পরের দিনের জন্য অপেক্ষা করতে হয় অথবা ট্রলারে যেতে হয়। কিন্তু বিপদের কথা শুনে ট্রলারের মালিকগণ হাকিয়ে বসে পাঁচ-সাত গুণ বেশি ভাড়া। ফলে দরিদ্র অসহায় লোকগুলো আরও অসহায় হয়ে পড়ে। এখানে পর্যটকদের জন্য রয়েছে একটি রেস্ট হাউস। তার পাশেই রয়েছে ছোট একটি বাজার।

নিঝুম দ্বীপের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বর্ণনাতীত, এখানে রয়েছে ঘন সবুজ বন, দেখা যায় শাশ মূল ও ঠেশ মূলের গাছ, রয়েছে চিত্রাল হরিণ, বঙ্গোপো সাগরের কোল ঘেষা সুবিশাল বালি রাশি। শীতকালে অসংখ্য অথিতি পাখি এদ্বীপে এসে ভিড় জমায়। নিঝুম দ্বীপের পাশেই রয়েছে আরও ছোট-ছোট কিছু দ্বীপ, সেখানেও রয়েছে জন বসতি। এখানে উপভোগ করা যায় নৌকা ভ্রমণ,সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত।

সরকার ইচ্ছে করলেই এ দ্বীপটিকে একটি আধুনিক পর্যটন কেন্দ্র হিসাবে গড়ে তুলতে পারে। তাহলে এক দিকে যেমন কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে এবং অপর দিকে সমৃদ্ধ হবে সরকারের রাজস্ব ভান্ডার।

এখনও প্রতিদিন বহু পর্যটক এখানে আসে, কিন্তু যোগাযোগ ব্যবস্থা ভাল হলে আরও পর্যটকের আনাগোনা বাড়বে।
ভ্রমণবিলাসীদের জন্য নিঝুম দ্বীপ
ঘুরতে কার না ভালো লাগে। আর তা যদি হয় নিঝুম দ্বীপ, তবে তো কথাই নেই।

নিঝুম দ্বীপ নামটা শুনলেই মনটা কেমন যেন ছটফট করতে থাকে। কারণ নিঝুম দ্বীপ ভ্রমণবিলাসী মানুষের জন্য অত্যন্ত মনোরম একটি স্থান।
কিভাবে যাবেন ?

সড়কপথে : ঢাকার মহাখালী, কমলাপুর ও সায়েদাবাদ থেকে এশিয়া লাইন, এশিয়া ক্লাসিক, একুশে এক্সপ্রেস ও হিমাচল এক্সপ্রেসের বাস যায় নোয়াখালীর সোনাপুর। ভাড়া ৩৫০-৪৫০ টাকা। সেখান থেকে সিএনজিতে চেয়ারম্যান ঘাট। ভাড়া ১০০ টাকা। এরপর ট্রলারে চড়ে যেতে হবে নলচিরা ঘাট। ভাড়া ১৫০ টাকা। সেখান থেকে আবার বাসে জাহাজমারা বাজার। ভাড়া ৭০ টাকা। জাহাজমারা বাজার থেকে মোটরসাইকেলে মুকতারা ঘাট। ভাড়া ৭০ টাকা।

মুকতারা ঘাট থেকে ইঞ্জিন নৌকায় নিঝুম দ্বীপ ঘাট। ভাড়া ১০ টাকা। সেখান থেকে আবার মোটরসাইকেলে যেতে হবে নামার বাজার (নিঝুম দ্বীপ)। ভাড়া ৬০ টাকা। তবে সময়ের বিবর্তনে ভাড়ার ক্ষেত্রে তারতম্য হতে পারে। তাই যাতায়াতের শুরুতেই পরিবহন সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে ভাড়া জেনে নিয়ে বাহনে চড়বেন।

নৌপথে যাতায়াত : ঢাকার সদরঘাট থেকে প্রতিদিন পানামা ও টিপু-৫ নামের লঞ্চ হাতিয়ার উদ্দেশে ছাড়ে সন্ধ্যা ৬টায়। ভাড়া ডেক ২০০ টাকা, সিঙ্গেল কেবিন ৭০০ টাকা, ডাবল কেবিন ১২০০ টাকা এবং ভিআইপি ১৬০০ টাকা। সময়মতো লঞ্চ ছাড়লে এবং আবহাওয়া ঠিক থাকলে ঢাকা থেকে ছেড়ে যাওয়া লঞ্চটি পরদিন সকাল ১০টার মধ্যে হাতিয়া লঞ্চঘাটে পৌঁছবে।
পানামা লঞ্চের যোগাযোগ : ০১৭৪০৯৫১৭২০।

এছাড়া বন্দরনগরী চট্টগ্রামের সদরঘাট থেকেও সপ্তাহের একটি নির্দিষ্ট দিনে চট্টগ্রাম থেকে একটি জাহাজ হাতিয়ার উদ্দেশে ছেড়ে যায়।
কোথায় থাকবেন : নিঝুম দ্বীপে পর্যটকদের থাকার জন্য অবকাশ পর্যটন নির্মাণ করেছে নিঝুম রিসোর্ট এবং নামার বাজার মসজিদ কর্তৃপক্ষ নির্মাণ করেছে মসজিদ বোর্ডিং।

নিঝুম রিসোর্ট : এই রিসোর্টে ৯টি ডাবল ও ট্রিপল বেডের রুম এবং ৩টি ডরমিটরি রয়েছে যেখানে মোট ২২টি বেড রয়েছে। পুরো নিঝুম রিসোর্টে ৬০ জনেরও বেশি সংখ্যক মানুষ একসঙ্গে থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। নিঝুম রিসোর্ট কর্তৃপক্ষের নিজস্ব জেনারেটরের ব্যবস্থা রয়েছে সার্বক্ষণিক বিদ্যুতের জন্য।

রিসোর্টের রুম ভাড়া : ২ বেডের (১টি বাথরুম) ডিলাক্স রুমের ভাড়া ১ হাজার টাকা। ৬ বেডের ফ্যামিলি রুমের (১টি চার বেডের রুম ও অন্যটি ২ বেডের রুম এবং ২টি বাথরুম) ভাড়া ২ হাজার টাকা। ১২ বেডের ডরমিটরির (৩টি বাথরুম) ভাড়া ২৪০০ টাকা এবং ৫ বেডের ডরমিটরির (২টি বাথরুম) ভাড়া ১২০০ টাকা। রুমে অতিরিক্ত কেউ থাকলে জনপ্রতি গুনতে হবে ১শ’ টাকা।