যাকাতের উপকারিতা

যাকাতের উপকারিতা


মাওলানা বাহাউদ্দীন যাকারিয়া
পরিচালক : জামিয়া হোসাইনিয়া ইসলামিয়া আরজাবাদ মিরপুর
| সহসভাপতি : বেফাক
| সভাপতি : ইত্তিফাকুল মাদারিসিল কওমিয়া বৃহত্তর মিরপুর



আল্লাহ তায়ালা মানবজাতির জন্য যে বিধান দিয়েছেন তাতে বহু হেকমত-রহস্য, তাৎপর্য রয়েছে, যা মানব মস্তিষ্ক উপলব্ধি করতে অক্ষম। আল্লাহ যাকাত ফরয করে তাতে বহু হেকমত, উপকারিতা রেখেছেন। নিম্নে কয়েকটি উপকারিতা দেয়া হল।

(১) এক সময়ে গোটা বিশ্বে সোসালিজমের চর্চা হত। এ মতবাদের স্লোগান হল দরিদ্র শ্রেণীর সুখ-শান্তি ও আর্থিক উন্নতি। এর আড়ালে ধনী, সম্পদশালীদের বিরুদ্ধে গরীবশ্রেণীর লোকদের উত্তেজিত করে তোলা।এ আন্দোলনে গরীবদের কল্যাণ কতটুকু হবে তা একটি স্বতন্ত্র বিষয়।এখানে কেবল এতোটুকু বলতে চাই যে, ধনী-দরিদ্রের এ লড়াইর মূল কারণই হল আল্লাহ তায়ালা ধনবানদের উপর দরিদ্র শ্রেণীর লোকদের যে সব দায়িত্ব অর্পন করেছেন, তা যথাযথভাবে পালন না করা। যদি সম্পদের চল্লিশ ভাগের এক ভাগ দরিদ্রশ্রেণীর মাঝে বন্টন করা হয়, বন্টনের এ কার্যক্রম সাময়িক না চালিয়ে সর্বদা অব্যাহত রাখা হয়, বিত্তশালীরা কোন প্রকার লোভ-মোহের বশবর্তী না হয়ে অর্পিত এ দায়িত্ব স্থায়ীভাবে সতস্ফুর্তভাবে পালন করতে থাকে এবং প্রাপ্ত অর্থের ন্যায়ভিত্তিক সুষম বন্টনধারা অব্যাহত রাখে তবেই কিছু দিনের ব্যবধানেই পরিলক্ষিত হবে যে, ধনীর বিরুদ্ধে দরিদ্রের কোন অভিযোগ থাকবে না। ধনী-দরিদ্রের শ্রেণীলডাইেয়ের ফলে এ বসুন্ধরায় নরকীয় যে চিত্র বিরাজ করছে তাতে পরিবর্তন আসবে। এ নীতির বাস্তবায়নের ফলে শান্তি, সম্প্রীতির স্বর্গীয় পরিবেশ তৈরী হবে।

আমি কেবল আমার দেশের মুসলিম জাতির নিকটই বলব না; বরং বিশ্বের সকল মানুষের নিকট উদাত্ত আহবান জানাব , আসুন! ইসলাম প্রবর্তিত যাকাত ব্যবস্থা প্রয়োগ করে এর বরকত উপভোগ করি।
(২) মানবসমাজে ধণ-সম্পদ তেমনি গুরুত্বপূর্ণ যেমন মানবদেহে রক্তের। যদি রক্তের আবর্তনের মাঝে কোন প্রকার দোষ-ত্রুটি দেখা দেয় তাহলে মানবজীবন হুমকির সম্মুখীন হয়ে পডবে। কখনো হার্ড এ্যাটাকের কারনে হঠাৎ মানুষ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। ঠিক তেমনিভাবে যদি সম্পদের বিবর্তন ইনসাফভিত্তিক না হয়, তবে মানবসমাজও হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়বে।যে কোন সময় হার্ড এ্যাটাক করার আশঙ্কা দেখা দিবে। আল্লাহ তায়ালা সম্পদের ন্যায়ভিত্তিক বন্টন এবং আবর্তনের জন্য যে সব নীতিমালা প্রণয়ন করেছেন, তার একটি হল, যাকাতব্যবস্থা। যে পর্যন্ত এ নীতিমালা সমাজে সঠিকভাবে বাস্তবায়ন না করা যাবে, সে পর্যন্ত না সম্পদের ইনসাফভিত্তিক আবর্তনের চিন্তা করা যাবে, না সমাজ ব্যবস্থা ধ্বংস ও পতন থেকে রক্ষা পাবে।

(৩) গোটা সমাজের একটি চিত্র অঙ্কন করুন এবং মানবসদস্যকে এর একটি অঙ্গ ভাবুন। দুর্ঘটনায় দেহের কোন অংশে যদি রক্ত জমে যায়, তাহলে তা ফোঁড়ার আঁকার ধারন করবে। তা থেকে পুজঁ নির্গত হতে থাকবে। তেমনিভাবে সমাজের কোন অঙ্গে প্রয়োজন থেকে বেশী রক্ত জমে যায়, তাও ফুলে-ফেটে দুর্গন্ধ ছড়াতে থাকে। অত:পর তা কখনো বিলাসী কিংবা অপব্যয়ের সুরতে বের হতে থাকে। কখনো আদালত কিংবা উকিলের পিছনে নষ্ট হতে থাকে। কখনো ডাক্তার কিংবা হাসপাতালে খরচ হতে থাকে। কখনো উঁচু উঁচু সূরম্য অট্টলিকা বা প্রাসাদ নির্মাণের মাধ্যমে নষ্ট হতে থাকে। আল্লাহ তায়ালা যাকাত-সদকাকে ঐ ফোঁড়ার চিকিৎসার ঔষধ হিসেবে নির্ধারণ করেছেন যা সম্পদ কুক্ষিগত করে রাখার দ্বারা সমাজদেহে দেখা দেয়।

(৪) যে মানুষ কোন মানুষের অসহায়ত্ব, দরিদ্রতা, নি:স্বতা, অভাব-অনটনে সহানুভূতি দেখায়, সেই হচ্ছে মহানুভব মানুষ। আর যার মাঝে এ বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান না থাকে তার তুলনা হবে পশুর সাথে। এ ক্ষেত্রে শয়তান এবং প্রবৃত্তি মানুষকে মহানুভবতা প্রদর্শন থেকে বিরত রাখতে সক্রীয় থাকে। যার ফলে কম সংখ্যক লোকেই মহানুভবতা প্রদর্শনে উৎসাহী হয়। আল্লাহ তায়ালা দরিদ্রশ্রোণী লোকের সাহায্যের জন্য বিত্তশীলদের উপর দায়িত্ব অর্পন করেছেন, তা পালনে কোন নাদান বন্ধুর পরামর্শ যেন অন্তরায় হয়ে না দাঁড়ায়।

(৫) ধন-সম্পদ একদিকে মানবসমাজের জীবনোপকরনের মূল ভিত্তি, আবার অপর দিকে মানবসভ্যতা বিনির্মাণ এবং ধ্বংসের মূখ্য ভূমিকাও পালন করে থাকে। কখনো অর্থ-সম্পদহীন মানুষ অমানবীয় কর্মকান্ডের জন্য উদ্ভূধ্য হয়ে থাকে, সামাজিক অনাচারের কারণে সে শান্তি বিনষ্টের জন্য দৃঢ সঙ্কল্প হয়ে যায়। কখনো চুরি ডাকাতি, জুয়ার ন্যায় নিন্দনিয় কর্মকান্ড শুরু করে। কখনো দারিদ্রতার যাঁতাকলে নিস্পেষিত হয়ে আত্মহনেনের সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে।কখনো উদরে অগ্নিভরার জন্য নিজের ইজ্জত-সম্মানকেও বলি দেয়। এর ওপর ভিত্তি করেই এক হাদীসে বলা হয়েছে كاد الفقر ان يكون كفرا অর্থাৎ ‘দারিদ্রতা মানুষকে কুফরের নিকটবর্তী করে দেয়। এসব গর্হিত ও নিন্দনীয় কাজ দারিদ্রতা, অভাব-অনটনের কারণে সমাজে জন্ম নিয়ে থাকে। ক্ষেত্রবিশেষ বাড়ীকে বাড়ী ধ্বংস করে দেয়। দারিদ্রতা, অভাব-অনটন দুর করার পথ-পদ্ধতি, উপায় বের করা সমাজপতিদের সম্মিলিত দায়িত্ব। যাকাত ও দানের মাধ্যমে এ কুস্বভাবের দ্বার রুদ্ধ করার পথ আল্লাহ তায়ালা বাতলিয়ে দিয়েছেন।

(৬) ধন-সম্পদের প্রাচুর্যতার কারণেই বহু তারিত্রিক দোষ-ত্রুটি জন্ম নিয়ে থাকে। বিত্তশীলদের যুবক সন্তানের বল্গাহীন জীবন-যাপন থেকেই কতই না অপকর্মের জন্ম নিয়ে থাকে। তার বিবরন এখানে প্রয়োজন নেই। যাকাত ও দানের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা ধন-সম্পদ থেকে সৃষ্ট চারিত্রিক পদস্খলের দ্বার রুদ্ধ করে দিয়েছেন। এর মাধ্যমে ধনীরা যাতে গরীবের প্রয়োজনীয়তা ও অভাব অনুভব এবং তাদের অবস্থা উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে।

(৭) যাকাত এবং দানের বিধানের একটি রহস্য হল, যে সব বালা-মসিবত, বিপদাপদ মানুষের উপর আপতিত হত, তা দুর হয়ে যায় এবং মানুষের জান-মাল দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পায়।

(৮) যাকাত ও দানের একটি উপকারিতা হল, এর দ্বারা ধণ- সম্পদের বরকত লাভ হয়। যাকাত এবং দানে কৃপনতা করার ফলে আসমানী বরকতের দ্বার রুদ্ধ হয়ে যায়। তাইতো হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে, যে সম্প্রদায় যাকাত প্রদান থেকে বিরত থাকবে, আল্লাহ তাদের উপর দুর্ভিক্ষ এবং অনাবৃষ্টি চাপিয়ে দেন। -আপকে মাসাইল আওর উনকা হল খ.৩, পৃ.২৫০-২৫২

(৯) যদি ইসলামী শরীয়তের কেবল যাকাত ব্যবস্থাই পরিপূর্ণরূপে বাস্তবায়ন হত, তাহলে এ পৃথিবীর অনেক বিপদাপদ এবং পেরেশানী এমনিতেই দূর হয়ে যেত। সম্পদশালী দরিদ্রের নিকট যাকাতের অর্থ নিয়ে যেত এবং গোপনে তাকে প্রদান করত তবে ঐ দরিদ্রের বহু যন্ত্রণা দুর হয়ে যেত। আবার সম্পদশালী যখন দরিদ্রের অবস্থা অবলোকন করত, তখন তার সম্মুখে দরিদ্রের অভাব-অনটনের করুন চিত্র ভেসে উঠত। ফলে সম্পদশালীর নিজের স্বাচ্ছন্দময় অবস্খার উপর আল্লাহর শুকরিয়া আদায়ের মনোভাব তৈরী হত।সে সম্পদেরও কদর বুঝতে পারত।-মাসাইলে যাকাত ৪০