যে রঙ কভু যায় না মুছে

যে রঙ কভু যায় না মুছে

শিহাব আহমেদ তুহিন


সবার জীবনেই কোন না কোন রঙ থাকে। সে রঙ আনন্দের হতে পারে। হতে পারে বিষাদের। আমরা যা বিশ্বাস করি, আমাদের জীবন যা ঘিরে আবর্তিত হয়, সেটাই আমাদের জীবনের রঙ ঠিক করে দেয়। বলে দেয়, জীবনের বাকিটা পথ আমরা কে কোন পথে হাঁটব। কার কাছে, কিসের পেছনে জীবনটাকে সঁপে দিবো!

কেউ কেউ এ দুনিয়ার রঙ গ্রহণ করে। এ দুনিয়ার জন্য, দুনিয়ার মানুষের জন্য, সস্তা কিছু সুনামের জন্য তারা সব করতে পারে। রাতের পর রাত জাগতে পারে। হাসতে পারে। কাঁদতে পারে। সারাটা জীবন অভিনয় করে কাঁটিয়ে দিতে পারে। কেউ আবার তার ভালোবাসার মানুষের রঙ ধারণ করে। কীভাবে তাকে আরো ভালোবাসা যায়, আরো কাছে আসা যায়, সেটা ঘিরেই তার পৃথিবীটা আবর্তিত হয়। ভালোবাসার পাঁচটি নীলপদ্মের পিছনেই সে সারাটা জীবন ছুটে।

কেউ কেউ আবার নিজেই নিজের রঙ ধারণ করে। নিজের মন যা চায় তার সবই তারা করে। কারো সামনে তারা মাথা নোয়াতে চায় না। কোন ধর্মের সামনে না, কোন মানুষের সামনে না। কিন্তু নিজেরা বুঝতেও পারে না, তারা নিজের মনের কাছে বন্দী হয়ে আছে। নিজের অজান্তেই তারা নিজের ইচ্ছার দাস হয়ে গেছে।

এ পৃথিবীর প্রত্যেক মানুষের রঙ রয়েছে। প্রত্যেক সমাজের রঙ রয়েছে। প্রতিটা জাতিও দাপটের সাথে নিজের রঙের কথা বলে। নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে চায়। প্রত্যেক ধর্মেরও রঙ রয়েছে। যেমনঃ কোন শিশু জন্ম নিলে খ্রিষ্টানরা তাকে সাতদিন পর হলুদ রঙের পানিতে চুবিয়ে পবিত্র করার চেষ্টা করতো। এখনো করে। এ প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘ব্যাপ্টিজম’। তারা বিশ্বাস করতো, এমনটা করার ফলে শিশুর সমস্ত অপবিত্রতা দূর হয়ে যায়। (১)

আহলে কিতাবরা এটা নিয়ে মুসলিমদেরকে খোঁচা দিতো। তারা বলতো, ‘আমাদের জীবনে, আমাদের ধর্মে রঙ রয়েছে। আর তোমাদের ধর্মে? কিচ্ছু নেই। কোন রঙ নেই। একদম ধূসর।’ অবশ্য তাদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। আমরা অনেক মুসলিমই বিশ্বাস করি, ভালোভাবে ইসলাম পালন করা মানেই বন্দী হয়ে যাওয়া। সাদা-কালো জীবন নিয়ে বাঁচা। এই করা যাবে না, ঐ করা যাবে না। গান গাওয়া যাবে না, নাচা যাবে না, সারাক্ষণ পর্দা করে থাকতে হবে, মেয়েদের সাথে প্রাণ খুলে কথা বলা যাবে না, প্রাণের উৎসবে সবাই এক হয়ে রঙ মাখা যাবে না। এ তো দেখি পুরোই রঙহীন জীবন!

আল্লাহ্‌ তা’আলা সেই ইহুদি-খ্রিষ্টানদের জবাব দিয়েছেন। মুসলিমদের দেখলেই যাদের মুখ ঘৃণায় কুঁচকে যায়, তাদের উত্তর দিয়েছেন। আমাদের বলতে বলেছেন, ‘তোমাদের রঙ ক্ষণস্থায়ী। ধুলেই শেষ হয়ে যায়। ভালোমত পরিষ্কার করলে বুঝাও যায় না যে, কোনকালে এর অস্তিত্ব ছিল। আসল রঙ তো আল্লাহ্‌র রঙ। তাঁর দ্বীনের রঙ। যে একবার এ দ্বীনে প্রবেশ করে, সে সকল প্রকার অপবিত্রতা থেকে মুক্ত হয়ে যায়।(২)

আল্লাহ্‌র দ্বীনকে কেন রঙের সাথে তুলনা করা হয়েছে? কারণ, রঙ যেমন চোখ দিয়ে অনুভব করা যায়, তেমনি একজন মুমিনের মধ্যে ঈমানের আলামতও অনুভব করা যায়। তার কথা-বার্তায়, আচরণে সে ঈমান ফুটে উঠে।(৩)

যারা আল্লাহ্‌র রঙ গ্রহণ না করে ক্ষণস্থায়ী রঙ নিয়ে মেতে থাকে, তাদের পরিণতি কী হয়? ইবনুল কায়্যিম (রহ) বলেন,
وقد قضى الله تعالى قضاء لا يرد ولا يدفع أن من أحب شيئاً سواه عذب به ولا بد، وأن من خاف غيره سلط عليه، وأن من اشتغل بشيء غيره كان شؤماً عليه، ومن آثر غيره عليه لم يبارك فيه، ومن أرضى غيره بسخطه أسخطه عليه ولا بد
“আল্লাহ্‌ তা’আলা একটি বিষয় নির্ধারণ করে দিয়েছেন, যা কখনোই বদলানো যাবে না, থামানোও যাবে না। আর সেটা হচ্ছে-
যে কেউ আল্লাহ্‌ ছাড়া অন্য কাউকে ভালোবাসে, ঐ মানুষের কাছেই সে কষ্ট পাবে।
যে আল্লাহ্‌ ছাড়া অন্য কিছুকে ভয় করবে, সে ভয়ই তাকে সারাটাজীবন তাড়িয়ে বেড়াবে।
আল্লাহ্‌ ছাড়া অন্য কিছুতে যে নিজেকে ব্যস্ত রাখবে, তা তাকে লাঞ্ছিত করবে।
আল্লাহ্‌র চাইতেও যে অন্য কিছুকে বেশি গুরুত্ব দিবে, তাতে সে বরকত পাবে না।
আর আল্লাহ্‌র দেয়া নিয়ামত ভোগ করে যে অন্য কাউকে খুশি করতে ব্যস্ত থাকে, আল্লাহ্‌ তায়ালা তাকে ঐ ব্যক্তির বিপক্ষে দাঁড় করিয়ে দিবেন।” (৪)

আমরা অনেক সময় ভুল রঙ দিয়ে আমাদের পৃথিবীটা রাঙিয়ে ফেলি। তৃপ্তির মিথ্যা ঢেঁকুর তুলি। তবে হৃদয়টাকে তো আর মিথ্যা বলা যায় না। তাই সম্পদের পাহাড় গড়েও ‘কী যেন নেই’- হাহাকারে অনেক মানুষ এ পৃথিবী ছেড়ে চলে যায়। কী ছিল না তাদের? কেন অশান্ত থাকে তাদের মন?
ইবনুল কায়্যিম (রহ) সেটার উত্তরও দিয়েছেন-
إن في القلب شَعَتٌ لا يلمه إلا الإقبال على الله وفي القلب وحشة لا يزيلها إلا الأنس بالله، وفي القلب خوف وقلق لا يذهب إلا بالفرار إلى الله، وفي القلب حسرة لا يطفئها إلا الرضا بالله
“প্রত্যেক মানুষের অন্তরেই রয়েছে অস্থিরতা, যা কেবল আল্লাহ্‌র কাছে ফিরে গেলেই ঠিক করা সম্ভব।
প্রত্যেক মানুষের অন্তরে এক শূন্যতা রয়েছে, সেটা কেবল আল্লাহ্‌র কাছে ফিরে গেলেই দূর করা সম্ভব।
প্রত্যেক মানুষের অন্তরে রয়েছে ভয় আর উৎকণ্ঠা, যা কেবল আল্লাহ্‌র কাছে আশ্রয় নিলেই দূর করা সম্ভব।
আর প্রত্যেক মানুষের অন্তরেই রয়েছে হতাশা, যেটা কেবল আল্লাহ্‌র উপরে সন্তুষ্ট হলেই দূর করা সম্ভব।”(৫)

আমরা আল্লাহ্‌র কাছে চাই, তিনি যেন তাঁর রঙ দিয়ে আমাদের জীবনটাকে রাঙিয়ে দেন। সংকীর্ণ দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী রঙের জন্য দশ জমীন প্রশস্ত রঙ থেকে আমাদের বঞ্চিত না করেন। আমাদের দূরে রাখেন, ঐ সমস্ত বিষয় থেকে যা আমাদেরকে তাঁর কাছ থেকে দূরে নিয়ে যায়। হ্যাঁ! মানুষ আমাদের নিয়ে মজা করবে। উপহাস করবে। আকণ্ঠ দূষিত রঙে নিমজ্জিতরা আমাদের বুঝতে পারবে না, এটাই তো স্বাভাবিক। আমরা তাদের বলব-
صِبْغَةَ اللّهِ وَمَنْ أَحْسَنُ مِنَ اللّهِ صِبْغَةً وَنَحْنُ لَهُ عَابِدونَ
“আমরা আল্লাহর রঙ গ্রহণ করেছি। আল্লাহর রঙ এর চাইতে উত্তম রঙ আর কার হতে পারে? আমরা তো তাঁরই ইবাদত করি।”(৬)


১| তাফসীরে মাযহারী, ১/২৬৭
২| তাফসীরে জালালাইন, ১/৩৩১
৩| তাফসীরে জালালাইন, ১/৩৩২
৪| আল ওয়াবলিুস সাইয়্যবি, ১/৮
৫| মাদারজিুস সালকেীন, ৩/১৫৬
৬| সূরা বাকারা, ২:১৩৮