এক কুরবানিতে একাধিক কুরবানি

মাওলানা তানভীর সিরাজ


ইখতিলাফ বা মতবিরোধ আমাদের উদ্দেশ্য নয়, বরং সামাজিকভারসাম্যতা ঠিকে রাখা আর মতবিরোধ ও মতভেদ রোধই এই লেখার লক্ষ্য। সময়ের দাবি হল সঠিক সময়ে তাকে নিয়ে ভাবা।
চিরাচরিত নিয়মের বিপরীত চলার মানুষ কোন কালে কম ছিল! কোনো কালে নয়। সর্বদা ভদ্রসমাজে এমন কিছু ব্যক্তিবাদ প্রকাশ পায়, যা অতীত বর্তমান দুইকালে সমান তালেই অগ্রহণযোগ্য। তেমনি একটি সমস্যা আজ মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে আর বলছে কি তারা দেখেন!

তাদের দাবি। কোরবানির পশুতে আকীকা, ওলিমা, হাদী, হাজ্বীর কুরবানি আর তামাত্তু’য়ুর কুরবানি ইত্যাদির ভাগ নাকি একই পশুতে দেয়া যাবে না, আলাদা আলাদা পশু নিয়েই কুরবানি করতে হবে। তাদের মতামত।
চলুন, এবার আমরা তাদের আসলরূপসহ মাসয়ালার সমাধান দেখি। সমাধান পূর্বে আমরা কুরবান’ শব্দটির সাথে শাব্দিকভাবে পরিচিত হব।

উর্দূ, ফারসি আর বাংলাভাষায় ব্যবহারিত কুরবানি’ শব্দটি মূলত আরবি শব্দ ‘কুরবানুন’ থেকে এসেছে। ইরানী, তুরকী, ভারত- পাকিস্তানের মানুষ ব্যবহার করে যাচ্ছে। আর বাংলার কী বলব আর তা তো সমান তালেই বাঙলিরা তুলে ধরছে তাদের ভাষায়, কথায় আর কাজে।
তাই চেয়ার, টেবিল,তহসিলদার ইত্যাদি শব্দের ন্যায় একটি ভিন্নভাষার শব্দ।
কুরবান অর্থ,
قُرْبَان :
جمع: قَرَابِينُ.
كُلُّ مَا يُتَقَرَّبُ بِهِ إِلَى الَّلهِ مِنْ ذَبِيحَةٍ أَوْ غَيْرِهَا.(معجم الغني)
কুরবানুন তার বহুবচন কারাবীনু।
কুরবান বলা হয় ঐসব বস্তুকে যার দ্বারা আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টি অর্জিত হয়, হতে পারে তা ঈদুল আযাহার পশু বা অন্যকিছু দিয়ে।
কুরবান শব্দের ধাতুগত ব্যবহার কোরআনে সূরা মায়িদায় পাওয়া যায়।
وَاتْلُ عَلَيْهِمْ نَبَأَ ابْنَيْ آدَمَ بِالْحَقِّ إِذْ قَرَّبَا قُرْبَاناً (.المائدة آية 27 )
আল্লাহ তা’আলা বলেন, ” হে নবী, আপনি আদম আ. এর সন্তানদয়ের বিষয়টি তাদের কাছে বর্ণনা করেন,
(সেই সময়কার কথা) যখন তারা উভয়ে ভালোমতো কুরবান করেছিলো। ”
ব্যপক অর্থে আল্লামা ইমাম রাগেব রা. বলেন,”যে বস্তু দ্বারা আল্লাহ্‌র নৈকট্য লাভ করা যায়, হোক সেটা জবাইকৃত পশু বা অন্য কোনো দান-খায়রাতকে কুরবানী বলা হয়।”
উযহিয়া, নাহর আর নুসুক’ কুরবানের সামর্থক শব্দ। কোরআন হাদীসে এসবের ব্যবহার বেশ লক্ষণীয়। সূরা কাউসার, সূরা আন’আম সমূহ সূরাতে।
প্রশ্ন-১, একটি গরু মহিষ বা উটে কত ভাগ কুরবানি করা যায়?

উত্তর : একটি গরু বা উটে ৭ ভাগ, তার কম-বেশ নয়। এ মর্মে একাধিক হাদিস থেকে একটি হাদিস পেশ করা হল।

عَنْ جَابِرٍ، قَالَ خَرَجْنَا مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم مُهِلِّينَ بِالْحَجِّ فَأَمَرَنَا رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم أَنْ نَشْتَرِكَ فِي الإِبِلِ وَالْبَقَرِ كُلُّ سَبْعَةٍ مِنَّا فِي بَدَنَةٍ.‏
[Muslim H1318, Ibne Majah H3131]

সহীহ মুসলিমে সাহাবী জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে, ‘আমরা হজ্বের ইহরাম বেঁধে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে বের হলাম। তিনি আমাদেরকে আদেশ করলেন যেন প্রত্যেক উট ও গরুতে সাতজন করে শরীক হয়ে কুরবানী করি।’-সহীহ মুসলিম: ১৩১৮, ইবনে মাজা: ১৩১৩।
অন্য বর্ণনায় আছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘(একটি) গরু সাতজনের পক্ষ হতে এবং (একটি) উট সাতজনের পক্ষ হতে (কুরবানী করা যাবে)।’ -আস-সুনান, আবু দাউদ, হাদীস : ২৮০১, কিতাবুল আযাহী, মাসিক আলকাউসার।

উক্ত হাদিস আমরা জানতে পারলাম যে, প্রতিটা উট,গরু আর মহিষে ৭ জন করে আর ছাগলে, দুম্বা আর ভেড়া ইত্যাদিতে একজন করে কুরবানি করতে পারবে।(সহীহ মুসলিম : ১৩১৮,বাদায়েউস সানায়ে : ৪/২০৭,মুয়াত্তা মালেক : ১/৩১৯,কাযীখান: ৩/৩৪৯, কুরবানির উপহার : ৩০)

তবে ইবনে আব্বাস র. হাদিসে এক উটে দশজনের কুরবানি করতে পারার কথা আছে সত্যি, তবে কিছুকথাও আছে তা নিয়ে। সেই হাদীসের ব্যাপারে যে কথায় বলব তা এই, ইবনে আব্বসের হাদীসটি হযরত যাবের র.- এর হাদীসের আগের হাদীস। তাই পরের হাদীসটি (যাবের) আগের হাদীসের ( ইনবে আব্বাস র.) আমলকে রহিত করে দেয়।
যাবের র.- সহ অনেক হাদীসে স্পষ্ট এসেছে যে, উট, গরু আর মহিষে ৭ ভাগ।
আরেকটি উত্তর দেন হাদীসবেত্তাগণ তা হল, ইনবে আব্বাসের এই হাদীসটি হল গনিমত বিষয়ক হাদীস, তাই এখানে একটি উট দশজনে ভাগ করে নিতে কোনো সমস্যা হয় না। তা হলে উভয় হাদীসের মধ্যে সুন্দর একটি সমাধানও বের হয়ে আসে। (সংক্ষেপ)
(দরসে তীরমীযি)

প্রশ্ন-২, এক কুরবানিতে বিভিন্নজনের কুরবানি দিতে পারবে কি?
আমরা ইতিপূর্বে যেহেতু কুরবানের শাব্দিক অর্থের সাথে পরিচিত হয়েছি আশাকরি আমাদের আর ভাগাভাগির বিষয়টি ভালোই বুঝব।
কুরবান অর্থ যেহেতু আল্লাহর নৈকট্য লাভ, তাই আমরা একাধিক ব্যক্তি একসাথে কুরবানি করতে পারব। কারণ আমাদের সবার নিয়ত আল্লাহর সন্তুষ্টি বা তার নৈকট্য লাভ বা কুরবত। সুতরাং যে আকীকা দিবে,ওলিমা দিবে, কুরবানি দিবে, হজ্জে তামাত্তুতে কুরবানি দিবে, অথবা হজে কোনো সমস্যা করার কারণে দম দিতে বা হজ্জের ইহরাম পরিধান করার পর হজ্জ আদায়ে অপারগ ব্যক্তি আর সামর্থবান মুকিম হাজ্বীসহ ইত্যাদি ব্যক্তির একই পশুতে সমানভাগ নিয়ে কুরবান করা বৈধ, পারবে। তবে সবার নিয়ত থাকতে হবে আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টি বা তার নৈকট্য লাভ কিংবা কুরবত।

(রাদ্দুল মুহতার (শামী, ৯/ ৪৫০, বাদায়ে : ৪/২০৯, ফাতওয়ায়ে আলমগীরি:৫/৩৫১, এ যুগের মাসাইল, ১৩২)
বিখ্যাত তাবেয়ী ইমাম ‘আতা ইবনে আবী রাবাহ রাহ. এর ফতোয়াটিই সম্ভবত পাঠকদের জন্য যথেষ্ট হবে।

তিনি বলেছেন, ‘উট ও গরু সাতজনের পক্ষ হতে কুরবানী হতে পারে। আর এতে শরীক হতে পারে কুরবানীকারী, তামাত্তু হজ্বকারী এবং হজ্বের ইহরাম গ্রহণের পর হজ্ব আদায়ে অপারগ ব্যক্তি।
( আসসুনান, সায়ীদ ইবনে মানসূর-আল কিরা লি-কাসিদি উম্মিল কুরা, পৃ. ৫৭৩, মাসিক আলকাউসার » সফর ১৪৩৪ . জানুয়ারি ২০১৩)

বিভেদহীন সমাজ গড়তে সচেতন মানুষের অভাব আছে বলে আমার মনে হয় না। তবে কেমন যেন বারবার মনে উঁকিঝুঁকি দেয়, তারা নাকি আপন বিবেককে কাজে লাগায় কম। সামগ্রিক অর্থে বলছি না।
আসুন,আমরা সামাজিক সর্বপ্রকার অবক্ষয় জলাঞ্জলি দিতে এগিতে আসি আর রাসূলের সব প্রথা পদ্ধতিকে সাদ্ধমত পালনের এবং আল্লাহর সমস্ত হুকুমকে তাঁর কথা মত পালনে সাবধানতা অবলম্বন করি। আমীন। ইয়া রাব্বাল আলামীন।


Notice: Undefined index: email in /home/insaf24cp/public_html/wp-content/plugins/simple-social-share/simple-social-share.php on line 74