কুরবানীর মাংস বণ্টনে ঐতিহাসিক রহস্য

কুরবানীর মাংস বণ্টনে ঐতিহাসিক রহস্য

মাওলানা তানভীর সিরাজ


সুশম বণ্টন, সুপরিকল্পিত ও দীর্ঘ মিয়াদি আর সীমান্তরেখা অনুসৃত এবং মানবীয় জীবনের উপযোগী এমন সব নিয়ম-কানুন নিয়ে গঠিত ইসলাম ধর্ম। আল্লাহ্‌ তা’আলা বলেন,
لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا ۚ لَهَا مَا كَسَبَتْ وَعَلَيْهَا مَا اكْتَسَبَتْ ۗ
আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যাতীত কোন কাজের ভার দেন না, সে তাই পায় যা সে উপার্জন করে এবং তাই তার উপর বর্তায় যা সে করে। -সূরা বাকারা, আয়াত: ২৮৬।
তাই তা খুব সহজে মানবজীবনের উপযোগী হয়ে উঠে। আমলে পালনে বেশ স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে সুস্থবোধসম্পন্ন ব্যক্তরা। যাদের মানসপটে আছে রুচিবোধ আর আছে মানার সৎইচ্ছা।
শরীয়তে মুহাম্মদীর যে রীতিনীতি আমরা পালন করে এসেছি দাওয়াতিজীবনের সূচনাকাল থেকে তার বাস্তবতা আজ আমরা ঈদুল আযহা বা কুরবানির ঈদেও খুঁজে পাই। এবং একা না খেয়ে সবাই মিলেমিশে খাওয়ার যে রীতিনীতি তার হিসেব আমরা কুরবানির মাংসে মিলাতে পারি। চলুন, এবার আমরা কুরবানির গোস্ত বন্টনের ইতিকথা নিয়ে আলোচনা করি।

কুরবানির মাংসে আল্লাহর বণ্টন ;

আল্লাহপাক বলেন:
“فكلوا منها و اطعموا القانع و المعتر”
ব্যাখ্যাসংবলিত অনুবাদ ;
“কুরবানির মাংস থেকে নিজেরা খাও আর ঐ ভিক্ষুককে দাও যে কষ্টসহিষ্ণু অল্পেতুষ্ট এবং ঐ ব্যক্তিকে দাও যে তোমার কাছে তার দুঃখী জীবনের কথা বলে, অথচ সে তোমার কাছে কিছুই চাই না।”
সূরা আল্ হজ্ব ৩৬।
আল্লাহ্‌ অন্য আয়াতে বলেন,
“فكلوا منها و اطعموا البائس الفقير. ”
” কুরবানির মাংস নিজেরা খাবে এবং দুস্হ অসহায়দের খাওয়াবে।”
সূরা আল্ হজ্ব ২৮।

নবী আ.-এর কুরবানির মাংস বণ্টন ;

নবী সা. কুরবানির মাংস ভাগ করার নীতিকথা নিয়ে ইবনে আব্বাস রা. বর্ণনা করেন আর বলেন,
আরবি;
‘وروي عن ابن عباس في صفة أضحية النبي -صلي الله عليه وسلم -” قال: ويطعم أهل بيته الثلث ويطعم فقراء جيرانه الثلث ويتصدق علي السوال بالثلث.”
(مرعاة المفاتيح شرح مشكاة المصابيح ،ج/5،ص/120)
সরল অনুবাদ :
ইবনে আব্বাস রা. রাসূল সা.- এর কুরবানির ধরণ বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, তাঁর পরিবারকে একতৃতীয়াংশ আর পাড়াপড়শিকে একতৃতীয়াংশ এবং গরীব গোরাবাদের একতৃতীয়াংশ কুরবানির মাংস ভাগ করে দিতেন।

* কুরবানির মাংস জমা করে রাখা আর না রাখার প্রশ্নে আমরা নিচের হাদীসটি উল্লেখ করতে পারি।

নবুওয়তী যিন্দেগীর প্রথম প্রহরে কুরবানির মাংস তিনদিনের ওপর রাখতে নিষেধ করা হয়। যেহেতু সবার কাছে কুরবানির মাংস পৌঁছে যায় আর তখন সাহাবা কেরাম খুব বেশি অস্বচ্ছলতার মধ্য দিয়ে দিনাতিপাত করতেন। অস্বচ্ছতাই নিষেধের মূল কারণ ছিলো। হাদীস নিচে পেশ করা হল।
আরবি:
حَدَّثَنَا مُسَدَّدٌ، حَدَّثَنَا يَزِيدُ بْنُ زُرَيْعٍ، حَدَّثَنَا خَالِدٌ الْحَذَّاءُ، عَنْ أَبِي الْمَلِيحِ، عَنْ نُبَيْشَةَ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏ “‏ إِنَّا كُنَّا نَهَيْنَاكُمْ عَنْ لُحُومِهَا أَنْ تَأْكُلُوهَا فَوْقَ ثَلاَثٍ ”
সরল অনুবাদ ;
নুবাইশাহ (রাঃ) তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ ” আমরা তোমাদেরকে তিন দিনের অধিক কুরবানীর গোশ্‌ত খেতে নিষেধ করেছিলাম, যাতে গোশ্‌ত তোমাদের সকলের নিকট পৌঁছে যায়।”

আর যখন সাহাবাগণ রা. স্বচ্ছলতায় ফিরে আসলেন তখন নবী আ. আদেশ দিলেন, ‘এখন তোমরা তা খাবে, চাইলে জমা করে রাখবে এবং সদাক্বাহ করে নেকীও অর্জন করবে।’

আরবি;
لِكَىْ تَسَعَكُمْ فَقَدْ جَاءَ اللَّهُ بِالسَّعَةِ فَكُلُوا وَادَّخِرُوا وَاتَّجِرُوا.
অনুবাদ ;
(একই হাদীসের পরের অংশ)
আল্লাহ এখন তোমাদের দারিদ্র মোচন করেছেন। কাজেই এখন তোমরা তা খাও, জমা করে রাখো এবং সদাক্বাহ করে নেকী অর্জন করো।’

আমরা কেন খাবো, চাইলে জমা করে রাখতে পারবো আর অন্যকে দান-খইরাত করতে পারবো? তার সুন্দর ও মনোরঞ্জম কারণটি নবী আ. নিজেই নিজ থেকে বলে দিয়েছেন এভাবে।
‘এই দিনগুলোতে নিজেরাও খাবে এবং অসহায় মানুষদের দান করে আল্লাহকে স্বরণ করবে। যে আল্লাহ তোমার হাতকে উপরে আর তার হাতকে নীচে করেছেন।’
আরবি;
أَلاَ وَإِنَّ هَذِهِ الأَيَّامَ أَيَّامُ أَكْلٍ وَشُرْبٍ وَذِكْرِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ ‏”‏ ‏.‏
অনুবাদ ;
জেনে রেখো, এ দিনগুলো পানাহারের দিন এবং মহান আল্লাহকে স্মরণ করার দিন।” সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ২৮১৩।

* মাংস জমা করে রাখা আর না রাখা নিয়ে প্রাসঙ্গিক আলোচনা ;
মুসলিম শরীফের ব্যাখ্যাগ্রন্থ ফাতহুল মুন’য়িমে কুরবানির মাংস কতদিন জমা করে রাখতে পারবো তা নিয়ে খণ্ড তথ্যহাদিস পেশ করা হল।
আরবি;
” (ادخروا ثلاث ،ثم تصدقوا بما بقي) أي اجمعوا واحفظوا لحم الأضحية ثلاثاً ،ثم تصدقوا بما عندكم من لحمها بعد الثلاث”
( فتح المنعم شرح صحيح مسلم ،ج/8,ص/92 )
ভাবানুবাদ;
এ হলো ৯ম হিজরীর ঘটনা।
রাসূল সা. আদেশ করেছেন যে, তোমরা কুরবানির মাংস তিনদিন পর্যন্ত সংরক্ষণ করে রাখো, তিনদিন পর যা অবশিষ্ট থাকবে তা ছদকা করে দাও।
রাসূলের এ আদেশটি হল ওয়াজিবের জন্য নয়, মুস্তাহাবের জন্য।
কুরবানির মাংস জমা করে রাখতে পারবেন কিনা সাহাবা কেরামের এমন প্রশ্নের জবাবে যেমনটা রাসূল সা. বলেছেন,
আরবি;
فلما كان العام المقبل ، قالوا : يا رسول الله ، نفعل كما فعلنا عام الماضي ؟ قال : ” كلوا وأطعموا وادخروا ،فإن ذالك العام كان بالناس جهد، فأردت أن تعينوا فيها. ” (مسلم :1947)
অনুবাদ ;
(এ বছর না হয় আমরা তিনদিনের ওপরে রাখলাম না) তাহলে আগামীবছরও কি আমরা গতবছরের মত কুরবানির মাংস তিনদিনের অধিক জমা করে রাখবো না? তখন রাসূল সা. (যুক্তিসহ) উত্তর দিয়ে বললেন, এখন তোমরা খেতে পার,খাওয়াতে পার এবং সামনের জন্য জমাও করে রাখতে পার, আমি ঐ আদেশ করলাম এ কারণে যে, গতবছর মানুষের অবস্থা ছিলো করুণ খুব কষ্টে দিনাতিপাত করছিলো তারা সেই কারণে এই আদেশ করেছি আর এখন মানুষের অবস্থা তারচে’ ভালো, তারপরেও আমি ভালো মনে করি তোমরা সাহায্য সহযোগীতার হাত সংকুচিত করবে না। ”
সুতরাং এখান থেকে আমলটি সময় অনুপাতে মুস্তাহাব বোঝা যায়।
আর আজকের কথা কী বলবেন! আজকাল তো মানুষ মা শাআ আল্লাহ!
একই বিষয়ে ইমাম নববী র. বলেন,
আরবি;
قال النووي : “في الحديث تصريح بجواز إدخار لحم الأضحية فوق ثلاث.”
( فتح المنعم شرح صحيح مسلم ،ج/8,ص
96)
অনুবাদ ;
“কুরবানির মাংস তিনদিনের বেশি রাখার ব্যাপারে হাদীসে পাকে সাধারণভাবে অনুমতি আছে। ”
যে হাদীসের মধ্যে রাসূল স. তিনদিনের অধিকসময় কুরবানির মাংস জমা করে রাখতে নিষেধ করেছেন সেই হাদীসের আমল এখন আর বাকি নেই, বরং তা রহিত হয়ে গেছে। এমন দুইটি হাদিস নিচে পেশ করা হল।
যার আমল এখন আর অবশিষ্ট নেই (মানছূখ);
المنسوخ: عن عبد الله بن عمر رضي الله عنهما عن رسول الله صلى الله عليه وسلم أنه كان يقول: (لا يأكلْ أحدكم من لحم أُضحيته فوق ثلاثة أيام) رواه مسلم، وفي رواية للحازمي عن علي بن أبي طالب رضي الله عنه عن النبي صلى الله عليه وسلم قال: (لا يأكلْ أحدكم من نُسُكه بعد ثلاث).

আর যে হাদীস দ্বারা আমলটি অবশিষ্ট থাকল না ( নাছেখ) ;
الناسخ: عن بُريدة رضي الله عنه عن النبي صلى الله عليه وسلم قال: (كنت نهيتكم عن ادّخار لحوم الأضاحي فوق ثلاث، فامسكوا ما بدا لكم) رواه مسلم، قال الإمام النووي: “هذا الحديث مما صرح فيه بالناسخ والمنسوخ جميعا”.
আমরা ফাতহুল বারীসহ বুখারী মুসলিমের একাধিক রেফারেন্স উল্লেখ করা হল নিচে।

لقوله صلى الله عليه وسلم: «كلوا وادخروا وتصدقوا».
[رواه البخاري (9655) ومسلم (1791)]
وما ورد في النهي عن الإدخار فمنسوخ.
[انظر فتح الباري (01/52، 62)]

সারকথা:
প্রয়োজনের ক্ষেত্রে কুরবানির মাংস ইচ্ছেমত রাখা যাবে, তবে মুস্তাহাব হল তিনভাগ করে পরিবার-পরিজন, পাড়াপড়শি আর গরীব-গোরাবাদের মাঝে বণ্টন করা।

খলিফা যুগে কুরবানির মাংস বণ্টন;

যে তিনযুগ নিয়ে নবী আ.-এর পরিষ্কার পবিত্রতার ঘোষণা সেই যুগ কি আর রাসূলের পদাঙ্ক অনুসরণ করবে না!
এমন কি হয় কখনো। নবী আ.এর কোনো একটি কথাও যেমন মিথ্যার অবকাশ রাখে না তেমনি এই বাণীও তার ভিন্ন নয়,অভিন্ন।
নবী সঃ বলেছেন:
আরবি;
“عليكم بسنتي وسنة الخلفاء الراشدين من بعدي عضوا عليها بالنواجذ. ”
(صحيح: صفة الفتوى والمفتي والمستفتي ،ج/1،ص/৫৪)
অনুবাদ ;
‘তোমাদের জন্য সাদ্ধনুযায়ী শক্তভাবে মানা আবশ্যক যে, আমার পদাঙ্ক অনুসরণ এবং আমার পরে খুলাফায়ে রাশেদার সুন্নত বা ত্বরিকা অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা।’
কুরবানির মাংস বণ্টন এবং তার যাবতীয় কার্যাবলী খুলাফায়ে রাশেদীন আর সাহাবা আজমায়িন রাসূলের সুন্নত বা আদর্শে বাস্তবায়ন করেন বলেই তাঁদের বেলায় স্বচ্ছতার নিশ্চয়তা দিয়েছেন আল্লাহর রাসূল স.।
আসুন,আমরা এবার খলিফা যুগে কুরবানির মাংস বণ্টন নিয়ে তথ্যচিত্র দেখি।
আরবি;
قال ابن حزم : إنما خطب على ( رضي الله عنه ) في الوقت الذي كان عثمان (رضي الله عنه ) محاصرا فيه ، وكان أهل البوادي قد ألجأتهم الفتنة إلي المدينة ، فأصابهم الجهد ، كما وقع في عهد النبي (صلى الله عليه وسلم )، فلذالك قال علي ما قال.
( فتح المنعم شرح صحيح مسلم ،ج/8,ص/92 )
অনুবাদ ;
ইবনে হাযাম বলেন,যখন ওসমান র. অবরুদ্ধ ছিলেন তখন আলী র. খুতবা দিয়েছেন,যেসময় আহলে বাওয়াদীদেরকে বিভিন্ন সমস্যা মদিনার দিকে ডেকে নিয়ে যাচ্ছে, তখন তাদের বেশ কষ্টও হচ্ছিলো যেমনি ঘটেছিল রাসূলের স. যুগেও।
তখন আলী র. তেমন হুকুম দিয়েছেন, যেমন নবী আ. দিয়েছিলেন।
অর্থাৎ কুরবানির মাংস সবাই মিলেমিশে খাওয়ার আদেশ দিলেন।
আর যখন আমাদের থেকে কষ্টদায়ক অবস্থা চলে যাবে তখন আবার আমরা তা থেকে তিনভাগে ভাগ করে সুন্নত ত্বরিকায় খাবো।

একটি প্রশ্নোত্তর ;
আরবি;
18-كيف يقسم المضحي لحم الأضحية؟
قال ابن باز:
السنة للمضحي
أ-أن يأكل منها
ب- ويهدي لأقاربه وجيرانه منها
ج- ويتصدق منها. مجموع الفتاوى (18-38)
অনুবাদ ;
প্রশ্ন : কুরবানির মালিক কুরবানির মাংস কিভাবে ভাগ করবেন ?
উত্তর : উত্তর দিয়েছেন শেখ বিন বায রহ.। তিনি বলেছেন, তিনভাগে ভাগ করবেন।
১, নিজে খাবে
২, পাড়াপ্রতিবেশি, আত্মীয়স্বজন আর
৩, দান করবে অনাথ জননীসহ বাকিদের।

সমাপ্তি যেন অসমাপ্ত থেকেই যায়! তবুও নাতিদীর্ঘ করার প্রয়াসে এখানে ইতি টানছি এই বলে,
আসুন, খাবো, খাওয়াবো আর দান করবো তার মালিকের সন্তুষ্টিতে।

রাত: ১:০৪
তারিখ : ২৬/০৮/১৮