spot_img
spot_img

যদি নিজেদের ভালো চান, অবিলম্বে কারাবন্দি আলেমকে মুক্তি দিন : আমীরে হেফাজত

দেশের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। বহুমুখী সংকটের কারণে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব আজ হুমকির সম্মুখীন। সেই সাথে বন্দি আলেমেদের মুক্তির দাবি আজ গণদাবিতে পরিণত হয়েছে। তাই দেশের সংকট দূর করতে আলেমদের ঐক্যবদ্ধ কর্মসূচী নিয়ে মাঠে নামতে বললেন আমীরে হেফাজত।

আজ শনিবার (২২ জুলাই) সকালে রাজধানীর গুলিস্তানের কাজি বশির উদ্দিন মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত জাতীয় ওলামা মাশায়েখ সম্মেলনে আমীরে হেফাজত আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ আহবান জানান। সভার আয়োজন করে শায়খুল হাদীস পরিষদ।

স্বাগত বক্তব্য রাখেন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মাওলানা হাসান জুনাইদ। যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাওলানা আব্দুল মুমিন ও মাওলানা এহসানুল হকের যৌথ পরিচালনায় এতে সভাপতিত্ব করেন শায়খুল হাদিস পরিষদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক, বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়ার মহাসচিব মাওলানা মাহফুজুল হক। সকাল সাড়ে আটটায় তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে সম্মেলনটি শুরু হয়। সম্মেলনে ঢাকাসহ সারা দেশ থেকে আসা হাজার-হাজার আলেম-উলামা মিলনায়তনের ভেতরে ও বাইরে অবস্থান নিয়ে অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন।

সম্মেলনে শায়খুল হাদীস পরিষদের পক্ষ থেকে মাওলানা মামুনুল হকসহ কারাবন্দী উলামায়ে কেরামের মুক্তি ও সারা দেশে আলেম-উলামাসহ তাওহিদী জনতার বিরুদ্ধে দায়েরকৃত সকল মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে আগামী ২০ আগস্ট দেশব্যাপী জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি প্রদাণের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।

হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী লিখিত বক্তব্যে বলেন, আমি অত্যন্ত ভারাক্রান্ত হৃদয়ে বলছি, দীর্ঘ প্রায় দুই বছর ধরে মিথ্যা ও সাজানো মামলায় মাওলানা মামুনুল হক, মুফতি মুনীর হোসাইন কাসেমী, মুফতি নূর হোসেন নূরানী, মুফতি মাহমুদুল হাসান গুনবী ও মাওলানা রফিকুল ইসলাম মাদানীসহ আরো অনেক আলেম কারাগারে বন্দি আছেন । অতি সাধারণ মামলায় তাদেরকে এত দীর্ঘ সময় সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে সরকার বন্দি করে রেখেছে। আদালত থেকে জামিন পাওয়ার পরও তারা মুক্তি পাচ্ছে না। নতুন মামলা দিয়ে আটকিয়ে রাখা হচ্ছে। কঠোর গোয়েন্দা নজরদারি ও প্রশাসনিক চাপ প্রয়োগ করে দেশের কওমি মাদরাসাগুলোকে শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় রাখা হয়েছে। জুমার খুতবা ও ওয়াজ-মাহফিল নিয়ন্ত্রণ করার বার বার চেষ্টা হয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের ধর্মীয় ও নাগরিক স্বাধীনতাও খর্ব করা হয়েছে। সরকারের এই নির্দয় আচরণ যে রাজনৈতিক প্রতিহিংসাপ্রসূত তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এটি সুস্পষ্ট আইনী অধিকার হরণ এবং মানবাধিকারের লঙ্ঘন। যা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। এসব কারণে সরকার ওলামায়ে কেরাম ও বৃহত্তর ইসলামী জনতার সমর্থন হারিয়েছে। আজ বন্দি আলেমেদের মুক্তির দাবি গণদাবিতে পরিণত হয়েছে। আমি সরকারকে বলব, যদি নিজেদের ভালো চান, অবিলম্বে কারাবন্দি সকল আলেমকে মুক্তি দিন। হয়রানি বন্ধ করুন।

দেশের উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, এই দেশ স্বাধীন হয়েছে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও ইনসাফ কায়েমের জন্য। অথচ দেশে ন্যায় ও ইনসাফ কল্পনাও করা যায় না। সরকারের কাছে আমাদের অনুরোধ, বল প্রয়োগের মাধ্যমে দেশকে সংঘাতের দিকে ঠেলে দিবেন না। সমঝোতার মাধ্যমে রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান করুন।

আলেমদের ঐক্যের বিষয়ে গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, আলেমদের ঝগড়া-বিবাদের কারণে অতীতে মুসলিম জাতির ভাগ্যাকাশে দুর্যোগ নেমে আসার ইতিহাস আমাদের অজানা নয়। বর্তমান প্রেক্ষাপটে দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্র মোকাবেলায় হক্কানি ওলামা-মাশায়েখের ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসতে হবে। চালিয়ে যেতে হবে ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা। তাই ওলামায়ে কেরামকে বলব, সমাজ, রাষ্ট্র কিংবা বিশ্বের অস্থিরতা থেকে জাতিকে মুক্তি দিতে পারস্পরিক হিংসা, বিদ্বেষ, দলাদলি বাদ দিন। ছোটখাটো ইখতিলাফের ঊর্ধ্বে ওঠে সবাই ঐক্যবদ্ধ হোন। বন্দি আলেমদের মুক্তি ও মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের দাবীতে এবং মজলুমের অধিকার আদায়ে সকল ইসলামী সংগঠন ঐক্যবদ্ধ কর্মসূচী দিয়ে মাঠে নামুন।

সভাপতির বক্তব্যে শায়খুল হাদিস পরিষদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক মাওলানা মাহফুজুল হক বলেন, আমরা বাহ্যত চারজন উলামার মুক্তি দাবি করছি কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আমরা সবাই বন্দী। আমরা ওলামা মাশায়েখ ও সাধারণ মানুষের কাছে গিয়ে দেখেছি তাদের হৃদয়ে আগুন জ্বলছে। যদি অতি দ্রুত আলেমদের মুক্তি না দেন, তাহলে তাদের হৃদয়ের আগুনে আপনারা পুড়ে যাবেন। আলেম-উলামাসহ সর্বস্তরের তওহীদি জনতার বিরুদ্ধে দায়েরকৃত সকল মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করে দেশ ও জাতিকে মুক্তি দিন।

খতমে নবুওয়ত সংরক্ষণ কমিটির আমীর মাওলানা আব্দুল হামীদ পীর সাহেব মধুপুর আলেমদের মুক্তি দাবি করে বলেন, দাবি পূরণ করলে হাসিনার‌ই লাভ। এই দেশ মুসলমানদের দেশ। আপনি ক্ষমতায় এসে খুন করেছেন, এর জবাব দিতে হবে। আপনাদের নিজেদের-ই পায়ের তলে মাটি নেই। আলেমদের মুক্তি দিয়ে নিজেদের চিন্তা করুন, নয়তো পরিণতি দেখার জন্য অপেক্ষা করুন।

হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব মাওলানা সাজিদুর রহমান বলেন, আমাদের বৃহত্তর ঐক্য আজ হয়ে গেছে। তিন দফা দাবির উপর আজ দেশের সকল মুসলামান ঐক্যবদ্ধ। সরকারের প্রতি আহ্বান, আপনারা যদি জাতিকে বাঁচাতে চান, আলেমদের বদ দু’আ থেকে বাঁচতে চান, তাহলে অবিলম্বে আলেমদের মুক্তি দিন। এটা কথার কথা নয়। সরকারের দায়িত্বশীলদের ভালোভাবে ভাবার অনুরোধ করছি।

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা ইসমাইল নূরপুরী বলেন, এই সরকার খুনী সরকার। এই সরকারকে আর বেশিদিন রাখা যাবে না। এই জালেম সরকার মানসিক রোগী হয়ে গেছে। এক মাঘেই শীত যায় না। আমাদের নেতা মামুনুল হককে মুক্তি দিন, নইলে গদি ছাড়তে হবে।

জামিয়তে উলামায়ে ইসলামের সহ-সভাপতি মাওলানা আব্দুর রব ইউসুফী বলেন, আমাদের সামনে জাতীয় নির্বাচন। আপনারা সুষ্ঠু নির্বাচন করে দেখুন, আমি মামুনুল হকের নির্বাচনী আসনে দিনরাত ক্যাম্পেইন করে নির্বাচন করবো। তাকে কারাগারে রাখতে চাইলে রাখুক, মাওলানা মামুনুল হককে আমরা এমপি করে রাজকীয় সংবর্ধনায় জেল থেকে বের করে আনবো ইনশাআল্লাহ!

শায়খুল হাদিস পরিষদের সভাপতি মাওলানা তাফাজ্জুল হক আজিজ বলেন, এই জাতির জন্য যে সুবহে সাদিকের প্রয়োজন, আমরা তা উদিত করতে চাচ্ছি। যে কোনো মূল্যে জাতীয় ঐক্য আমরা দেখতে চাই‌। এখন এক দফা আন্দোলনে নামতে হবে। সেটা হবে আলেমদের মুক্তি। মামুনুল হকের মুক্তি। ওলামা মাশায়েখ রাজপথে না নামলে আন্দোলন সফল হবে না।

হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের নায়েবে আমির মাওলানা আব্দুল আওয়াল বলেন, আলেমদের মুক্তির দাবিতে এমন আন্দোলন করতে হবে, যেন মামুনুল হককে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। নয়তো দেশ অচল করে দিতে হবে। সারা দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষকে নিয়ে বঙ্গভবন অভিমুখে লংমার্চ করতে হবে।

সদ্য কারামুক্ত মজলুম আলেমে দ্বীন মাওলানা সাখাওয়াত হুসাইন রাজী বলেন, দুইমাস হলো জামিনে মুক্তি পেয়েছি। তবে কারা নির্যানত থেকে এখনো মুক্তি পাইনি। আগে সরকারী খরচে হাজিরা দিতে নেয়া হতো। এখন নিজ খরচে যেতে হয়। বাংলাদেশের সরকার এমন ছিল না, যারা আলেমদের বন্দি রাখতে পারে। আমাদের অনৈক্যের কারণেই এখন তারা সুযোগ পেয়েছে। সকলকে ঐক্যবদ্ধ করতে হলে আমাদের বৃত্ত ভাঙতে হবে। খাঁচায় বন্দি থাকলে আমাদের ঐক্য হবে না।আলেমদের বন্দি রেখে এদেশে কোনো নির্বাচন করতে দেয়া হবে না।

হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী বলেন, মামুনুল হক বন্দী মানে বাংলাদেশ বন্দী। আলেম উলামার মুক্তি না হলে দেশের অস্তিত্ব থাকবে না। তাদের মুক্তির জন্য ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাফনের কাপড় পরে রাস্তায় নামতে হবে। বহুবার রক্ত দিয়েছি, এবার রক্তের প্রতিশোধ নিতে হবে।

সম্মেলনে আরও বক্তব্য রাখেন জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের সহসভাপতি মাওলানা খালেদ সাইফুল্লাহ সাদী, বেফাক সহসভাপতি মাওলানা আব্দুল হক, জাতীয় দ্বীনি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের মহাসচিব মাওলানা মুহাম্মাদ আলী, হাটহাজারী মাদরাসার মুহাদ্দিস মাওলানা আশরাফ আলী নিজামপুরী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দিন আহমাদ, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী, খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমীর মাওলানা আহমদ আলী কাসেমী, খেলাফত আন্দোলন বাংলাদেশের নায়েবে আমীর মাওলানা মজিবুর রহমান হামিদী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রেসিডিয়াম সদস্য অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান, মুসলীম লীগের মহাসচিব কাজী আবুল খায়ের, শায়খুল হাদীস পরিষদের সহসভাপতি মাওলানা আতাউল্লাহ আমীন ও মাওলানা মুহাম্মাদুল্লাহ, পটিয়া মাদরাসার নায়েবে মুহতামিম মাওলানা আবু তাহের নদভী, জামিয়াতুন নূর, উত্তরার প্রতিষ্ঠাতা মুহতামিম মাওলানা নাজমুল হাসান কাসেমী, চট্টগ্রাম দারুল মাআরিফের নায়েবে মুহতামিম মাওলানা ফুরকানুল্লাহ খলীল, তাহাফ্ফুজে খতমে নবুওয়াত বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা মুহিউদ্দীন রব্বানী, বরিশালের জামিয়া ইসলামিয়া মাহমুদিয়ার মুহতামিম মাওলানা উবায়দুর রহমান মাহবুব, যুব মজলিসের সভাপতি পরিষদ সদস্য আবুল হাসানাত জালালি, হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ ঢাকা মহানগরীর সাধারণ সম্পাদক মাওলানা কেফায়েতুল্লাহ আযহারী, মানিকগঞ্জের পীর মাওলানা সাঈদ নূর, ফরিদপুর জামিয়া কুরআনিয়া চরকমলপুর মাদরাসার শায়খুল হাদীস মাওলানা হেলালুদ্দীন, বরিশাল জামিয়া ইসলামিয়া হোসাইনিয়ার শায়খুল হাদীস মাওলানা মোজাম্মেল হুসাইন, নারায়নগঞ্জের মাওলানা আবু তাহের জিহাদী, কুমিল্লার মাওলানা মনিরুল ইসলাম, হবিগঞ্জের মাওলানা লোকমান সাদী, বি-বাড়িয়ার সদ্য কারামুক্ত মাওলানা ইয়াকুব উসমানী প্রমুখ।

spot_img
spot_img
spot_img

সর্বশেষ