ইউএসটিএম নামে পরিচিত মুসলিম বিজ্ঞান-প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করা ছাত্রদের সরকারি চাকরি না দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ভারতের আসাম রাজ্যের সরকার।
বৃহস্পতিবার (২২ আগস্ট) রাজ্যের উগ্র হিন্দুত্ববাদী মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত বিশ্ব শর্মা একথা জানান।
তিনি বলেন, ইউএসটিএম ‘গুয়াহাটি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের’ মতো সরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্য হুমকি হয়ে উঠেছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে তাদের প্রভাব বাড়ার পাশাপাশি মেডিকেল সেক্টর নিয়েও তাদের উচ্চাকাঙ্খা দিন দিন বেড়ে চলেছে। তাই তাদের উত্থান ঠেকানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমরা। ইউএসটিএম গ্রেজুয়েটদের সরকারি চাকরি থেকে বঞ্চিত রাখতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আইনি উপায় খুঁজে বের করার নির্দেশ দিয়েছি। আলোচনা চলছে তাদের চাকরির আবেদন গ্রহণ না করার।
তিনি আরো বলেন, তাদের সনদ এই রাজ্যের নয় বরং ভিন্ন রাজ্যের। ওই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা ছাত্রদের কারণে আসামের ছাত্রদের নিজ রাজ্যের সরকারি চাকরি পেতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে। অনেকেই চাকরি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
সরকারি চাকরিতে আসামের গুয়াহাটি ও দিব্রুগড়ের মতো বিশ্ববিদ্যালয় গ্রেজুয়েটদের যেনো ইউএসটিএম গ্রেজুয়েটদের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে না হয় তিনি চাকরির বাড়তি পরীক্ষা নেওয়ারও দিকনির্দেশনা দেন সংশ্লিষ্টদের।
তিনি বলেন, আসামে সরকারি চাকরির উপযুক্ত বিবেচিত হওয়ার আগে ইউএসটিএম গ্রেজুয়েটদের অতিরিক্ত পরীক্ষা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছি আমাদের আইনী টিমকে।
এছাড়া তিনি আসামের ছাত্রদের মুসলিম মালিকানাধীন বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ভর্তি হওয়া থেকে বিরত থাকার আহবান জানান। সকলকে আসামের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ফ্রি পড়াশোনার সুযোগ নিতে বলেন। প্রয়োজনে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আসন সংখ্যা বাড়ানো হবে বলে দৃঢ় আশ্বাস দেন।
আসামের এই উগ্র হিন্দুত্ববাদী মুখ্যমন্ত্রী ইউএসটিএমের নেওয়া পদক্ষেপকে সরাসরি তার বিরুদ্ধে ছুড়ে দেওয়া চ্যালেঞ্জ বলে উল্লেখ করেন। পাল্টা উপযুক্ত পদক্ষেপে তিনি এর শেষ দেখে ছাড়বেন বলে হুমকি দেন।
সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে, ২০২১ সালে ইউএসটিএমের প্রতি আসাম মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত বিশ্ব শর্মার সমর্থন ছিলো। আসামের মন্ত্রী হিসেবে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘শ্রীমান্ত শংকরদেব ব্লকের’ উদ্বোধন করেছিলেন। এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন রাজ্যটির গভর্নর। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন উদয়াচল কলেজের ১১তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে ইউএসটিএমের সেন্ট্রাল অডিটোরিয়ামে তিনি বক্তব্যও রেখেছিলেন।
রাজ্য সরকারের সাম্প্রতিক শত্রুতা ও হুমকি সত্ত্বেও ভারতের শিক্ষাখাতে অসামান্য সাফল্য দেখিয়ে চলেছে মুসলিম বিজ্ঞান-প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ইউএসটিএম। ২০২৪ এর ৯ম সংস্করণের জাতীয় র্যাংকিংয়ে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়টি সেরা ২০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে নিজেদের জায়গা করে নেয়।
গত ১২ আগস্ট সোমবার ভারতের শিক্ষামন্ত্রী দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলের একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে জাতীয় প্রাতিষ্ঠানিক র্যাংকিংয়ে (NIRF) ইউএসটিএমের জায়গা করে নেওয়ার ঘোষণা দেন। এরফলে টানা ৩য় বারের মতো উত্তর-পূর্বাঞ্চলের একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে জাতীয় র্যাংকিং (NIRF) ভূক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের গৌরব অর্জন করে মেঘালয়ের মুসলিম বিজ্ঞান-প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়টি।
আসামের বাঙালি মুসলিম ড. মাহবুবুল হকের হাত ধরে মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠা হলেও এতে রয়েছে ধর্মীয় বৈচিত্র্য। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুসারে এর ৮০ শতাংশ ছাত্রই হিন্দু। ২০০৮সালে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এতে উন্নত শিক্ষা, অবকাঠামো ও গবেষণার পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধা থাকার পাশাপাশি পড়াশোনার খরচ সামর্থের মধ্যে থাকায় আসাম, মেঘালয় ছাড়াও আশপাশের রাজ্য থেকে ছাত্ররা এখানে পড়তে আসেন।
উল্লেখ্য, ইউএসটিএম প্রতিষ্ঠাতা ড. মাহবুবুল হক আসামের কারিমগঞ্জের এক হত-দরিদ্র মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ছোটবেলায় তার বাবা-মা দু’জনই মারা যান। টিউশনি ও ঘরের উঠানে উৎপাদিত শাক-সবজি বিক্রি করে তিনি নিজের পড়াশোনা অব্যাহত রাখেন। ২০০০ সনে আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ফার্স্ট ক্লাস পেয়ে তিনি তার বিএসসি ও এমসিএর পড়াশোনা শেষ করেন।
পড়াশোনা শেষে দেশ ও জাতির জন্য কিছু করার চিন্তা থেকে নিজ রাজ্য আসামে ফিরে আসেন। কিভাবে অনুন্নত আসামের শিক্ষা খাতের উন্নয়ন করা যায় সেই চিন্তা করতে থাকেন। বিভিন্ন জায়গা থেকে মোটা বেতনে চাকরির প্রস্তাব আসা সত্ত্বেও তিনি সেসব প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন। একটি ভাড়া বাসায় ২০০১ সালে ১টি কম্পিউটার ও ৪জন ছাত্র নিয়ে তার প্রথম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরু হয়।
বিভিন্ন যন্ত্রাংশ যুক্ত করে কম্পিউটার বিক্রির মাধ্যমে তিনি ঘর ভাড়া ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বড় করার উদ্দেশ্যে টাকা জমাতে থাকেন। এক পর্যায়ে তিনি তার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিতে একটি পূর্ণ কম্পিউটার ল্যাব স্থাপনে সক্ষম হোন। এতে শিক্ষার পাশাপাশি সকলকে কম্পিউটার প্রশিক্ষণেরও ব্যবস্থা করেন। ওই প্রতিষ্ঠানটি দ্রুতই জনপ্রিয়তা পায় এবং জেলার ২য় সেরা শিক্ষা কেন্দ্র হয়ে উঠে। উন্নত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ আরো বড় পরিসরে ছড়িয়ে দিতে তিনি তার সংগ্রাম অব্যাহত রাখেন। ধীরে ধীরে ইউনিভার্সিটি অফ সায়েন্স এন্ড টেকনোলজি, মেঘালয় (ইউএসটিএম) এর মতো নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হোন।
তার প্রতিষ্ঠিত বড় ও প্রসিদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলো হলো –
১. ইউনিভার্সিটি অফ সায়েন্স এন্ড টেকনোলজি, মেঘালয়। (ইউএসটিএম)
২. রিজিওনাল ইনিস্টিউট অফ সায়েন্স এন্ড টেকনোলজি, নয়া দিল্লি।
৩. সেন্ট্রাল পাবলিক স্কুল, পাথরকান্দি।
৪. সেন্ট্রাল পাবলিক স্কুল, বদরপুর।
৫. খাইরুন নিসা বেগম উইমেন্স কলেজ, বদরপুর।
৬. আল্লামা টিআর কলেজ অফ ফার্মেসি, বদরপুর।
৭. প্রফেসর কামরুল হক স্কুল অফ এডুকেশন।
৮. ইউনিভার্সিটি স্কুল অফ ল এন্ড রিসার্চ।
৯. স্কুল অফ বিজনেস সায়েন্স।
১০. ভিশন ৫০ একাডেমি।
১১. স্কুল অফ ফার্মাসিউটিক্যাল সায়েন্স।
১২. হক-২০ (আইএএস পরীক্ষায় আগ্রহীদের প্রশিক্ষণ ও স্কলারশিপ প্রদান সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান)
সূত্র: মুসলিম মিরর











